আমিরুল আলম খান অর্ক ক্লাস ফাইভে পড়ে। গ্রামের স্কুলে। বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। ব্যস্ত রাস্তায় ভ্যানে করে স্কুলে যায় অর্ক। অরিণ পড়ে ক্লাস এইটে। অরিণ যশোর শহরের এক নামি স্কুলের ছাত্রী। দুজনেরই স্কুল ছুটি। স্বাভাবিক ছুটি নয়। করোনা আতংকে সরকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করেছে। প্রথমে ছুটি দেয়া হয় ৪ এপ্রিল পর্যন্ত। এখন তা ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। ৯ এপ্রিল শবে বরাত। মুসলমানদের পবিত্র রজনী। ২৪ এপ্রিল রমজান শুরু। এদিকে আগামি দু’তিন সপ্তাহে করোনার বিস্তার নিয়ে নানা কথা, গুজব, আতংক সোশ্যাল মিডিয়ায়। পড়শি ভারত, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, পশ্চিম বাংলার অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। সেখানে করোনা দ্রুত ছড়াচ্ছে। এসব খবরে মানুষের মনে উৎকণ্ঠার পারদ চড়ছে। কী হতে যাচ্ছে কেউ জানি না। মানুষ এখন শুধু একঘরেই নয়, কর্মহীন। রোজগারপাতি নেই। সঞ্চয় যাদের আছে, তারাও শংকায়। সঞ্চয় ভাঙিয়ে ক’দিন চলবে? দেশে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ প্রায় ৯০ ভাগ। তারা জানে না, কী তাদের ভাগ্যে আছে? সরকার সাধারণ ছুটি দেবার পর এক কোটির বেশি মানুষ রাজধানী ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছে। হয়ত ভেবেছে গ্রামে কিছু চেয়ে চিন্তে খেতে পারবে। কেউ হয়ত ভেবেছে, ছুটিতে গ্রাম ঘুরে আসি। অফিস আদালত খুললে আবার ফেরা যাবে। কিন্তু গার্মেন্টস সেকটর নতুন কাজের বরাত পেয়ে পাগলের মত ৫ এপ্রিল কারখানা খুলে কাজ শুরুর ঘোষণায় হাজার হাজার শ্রমিক পায়ে হেঁটে বা গাদাগাদি করে বিভিন্ন বাহনে তারা ঢাকা ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে করোনা ছড়ানোর আশংকা বেড়েছে। শ্রমিকদের সাথে এ রকম আচরণে সারা দেশের মানুষ ভীষণ ক্ষুব্ধ। অবেশেষে সরকার সব কারখানা বন্ধের নির্দেশ জারি করেছে। ঢাকার সাথে দেশের সকল যোগাযোগ বন্ধ করা হয়েছে। এদিকে মসজিদ খোলা রাখা নিয়ে সরকারের দোনোমনা মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। দিল্লির নিজাম মারকেজ থেকে করোনা ছড়িয়ে পড়ায় ভারত বাংলাদেশে নতুন করে আতংক ছড়িয়ে পড়ার পর দেশে মসজিদের জামাতে নামাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, সরকার সময়মত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ভীষণ অভাব। মন্ত্রীরা আগের মতই দায়িত্বহীন কথা বলেই চলেছেন। দেশে লকডাউন ঘোষণা না করে এক প্রবল ঝুঁকির মধ্যে ১৭ কোটি মানুষের জীবন। গরিব মানুষের দুর্দশার সীমা নেই। তাদের নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোন কর্মপরিকল্পনা আছে বলে মনে করার কোন কারণ নেই। সরকার চলছে কিছু আমলার পরামর্শমত। সেখানে জনগণের কোন অংশগ্রহণ নেই পরামর্শের সুযোগ নেই। সরকার দেশে লক ডাউন ঘোষণা করে নি। কিন্তু পরিবহণ চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। এ এক আজব পরিস্থিতি। যতদিন করোনার ভাল চিকিৎসার সন্ধান না মিলবে, ততদিন সামাজিক দূরত্ব (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সংশোধনী জারি করে করে বলেছে, ব্যক্তিগত দূরত্ব) বজায় রাখা, সাবান-পানিতে দুহাত ২০ সেকেন্ড করে ধোয়া আর অসুস্থ বোধ করলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া – এই তিন পরামর্শ মেনে চলা ছাড়া গত্যন্তর নেই। দেশের প্রায় চার কোটি পড়ুয়া জানে না তাদের ভবিষ্যৎ কী? সবচেয়ে ঝুঁকিতে শিশু-কিশোর পড়ুয়ারা। এরই মধ্যে ঝরে পড়ার আশংকার কথা বলছে বিশেষজ্ঞরা। কেউ তাদের কথায় কান দিচ্ছে না। দুই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘুমাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছে। এমন আহাম্মুক মন্ত্রণালয় দেশের জন্য কী করতে পারে? আমলাশাসিত রাষ্ট্র কয় ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ তার ক্লাসিক উদাহরণ। সবাই ছেলেমেয়ে নিয়ে চিন্তিত। বিশেষ করে যাদের বাচ্ছারা নিচের ক্লাসে পড়ে। তারা এখন ভীষণ সংকটে। স্কুল বন্ধ। কিন্তু খেলাধুলা করবে প্রাণ খুলে তাও করতে দিচ্ছে না মা-বাবা। সারাদিন ঘরের ভেতর কি থাকা যায়?না রাখা যায়? শিশুদের মন চঞ্চল। তারা এসব মানবে কেন? তাদের মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। পড়শোনায় মন নেই। এপ্রিলের ১৪ তারিখ পর্যন্ত ছুটি। ২৫ তারিখে রমজান শুরু। তার মানে পুরো মে মাস থাকবে ছুটি। জুনে গরমের ছুটি। গরমের ছুটির কী হবে কে জানে? তাহলে ষান্মাসিক পরীক্ষার কী হবে? জিজ্ঞেস করেছিলাম শার্শার এক প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসী রহমানকে। তিনি কিছুই বুঝতে পারছেন না। অর্কের মা সোনিয়ার চিন্তা ছেলের সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে। সমাপনী পরীক্ষা কি হবে? বছরের অর্ধেক যদি স্কুল বন্ধ থাকে তবে ছোট ছোট বাচ্চারা পরীক্ষায় বসবে কোন সাহসে? তাদের ওপর মানসিক চাপ বাড়বে। অর্কের মা এসব চিন্তায় অস্থির। সুজাতা, মৌ মাধ্যমিকে পড়ান। তাদেরও একই চিন্তা। কী হবে জুনিয়র সার্টিফিকেট বা জেএসসি পরীক্ষার? লাভলী মল্লিক কাল বলছিলেন, খুব টেনশনে আছেন। কী হতে যাচ্ছে? নার্গিস জানতে চাচ্ছেন, তার স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের তিনি কী পরামর্শ দেবেন? সংসদ টিভিতে পড়ুয়াদের জন্য পাঠদান শুরু হতে না হতেই বিপত্তি। ১৬ কোটি টাকার শ্রাদ্ধ শুধু রেকর্ডিং-এ? প্রথম দিনের প্রচারে রুটিন মানা যায় নি। প্রচারের মান অতি নিম্ন স্তরের। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বিরক্তিকর। এমনিতেই আমাদের দেশে দূর শিক্ষণ কখনই ভাল ছিল না। একঘেয়ে, ক্লান্তিকর। শিক্ষক যেন রামগড়ুরের ছানা সব্বাই। তাদের মুখের হাসি কোথায় হারিয়ে যায় কেউ জানে না। যান্ত্রিক। কেউ টিভির সামনে বসে ওসব তিঁতে গিলতে চায় না। শিক্ষক বাতায়ন খুব কার্যকর হতে পারে নি। কারণ বহুবিধ। জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব তো আছেই। কার্যকর প্রশিক্ষণ নেই। অভাব আছে নিষ্ঠার। সবাই দায় সারতে চায়। তারাও ভয়ে ভয়ে থাকেন। কখন কোথায় পান থেকে চুন খসে! কোন তকমা কপালে জোটে! একবার শুরু হলে আর রক্ষা নেই। অন্তহীন নাজেহাল হতে হবে। তক্কে তক্কে থাকা লোকের অভাব নেই। কে কাকে কখন কীভাবে ঘায়েল করতে কোথায় বসে আছে কেউ জানে না। ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ চিন্তা, সঠিক কাজে প্রধান বাঁধা। আমরা সে বাঁধার হিমালয় গড়ছি রোজ রোজ। সমস্যা আরো আছে। সেটা পাঠ্যপুস্তকেই। দুর্বোধ্য ভাষায় অনর্থক বিশাল সিলেবাস। পরীক্ষার চাপ। এ প্লাসের চাপ। সামাজিক চাপ এত বেড়েছে যে, শিশু যেন খেলার পুতুল। মা-বাবার ব্যর্থ স্বপ্ন পূরণের হাতিয়ার। শিক্ষকের অর্থ লোভ। সরকারের বাহাদুরি দেখানোর খায়েস। সব চাপ শিশুর ঘাড়ে। যার সাথেই কথা বলি তিনিই একই অভিযোগ তোলেন। মুক্তি চান। কিন্তু মুক্তি কারো হাতে নেই। সবাই নাকি খেলার পুতুল। পুতুল নাচের পুতুল। সে নাচনের সুতো দূরে কোথাও বাঁধা। তাই মুক্তি নেই। কিন্তু শিশুদের কী অপরাধ? তারা কেন এমন নিপীড়নের শিকার হবে? মনোচিকিৎসকরা বলছেন, শিশুরা মানসিক বৈকল্যের শিকার হচ্ছে আশংকাজনক হারে। বুদ্ধিজট বাড়ছে। কেউ আনন্দ ভুলে যাচ্ছে। কেউ হিংস্র হয়ে উঠছে। সামাজিক রীতিনীতি মানতে চাইছে না। এক মহা সংকট ঘনিয়ে আসছে। শিক্ষামনোবিদদের কথা, সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপালে আঁখেরে ক্ষতি সমগ্র জাতির। শিশু চিন্তা ক্ষমতা হারায়। সৃজনশীলতা নষ্ট হয়। শিক্ষাবিদদের আবেদন, সিলেবাস কমাতে হবে, পড়ার চাপ কমাতে হবে। ভালো বই লিখতে হবে। পরীক্ষার চাপ কমাতে হবে। প্রাথমিক সমাপনী, জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষা শিশুদের কলজেয় এক বিষফোঁড়া। ১০ বছর আগে শিশুদের ঘাঁড়ে এই দুই পরীক্ষা জোর করে চাপিয়ে দেবার পর থেকেই দেশব্যাপী প্রতিবাদ। কিন্তু জেদের বশবর্তী সরকার তাতে কানই দেয় নি। এরই মধ্যে বিপুল ক্ষতি করেছে এই দুই পরীক্ষার ব্যঝস। এসব আপদ দূর করতেই হবে। করোনাকালে তা আরও বেশি জরুরি। তাই কাল বিলম্ব নয়। এখনই সময়। এখনই প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা জরুরি। আমিরুল আলম খান, যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান [email protected]