করোনায় থমকে গেছে শহরের লালদিঘি পাড়ে জড়ো হওয়া খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রা

আকরামুজ্জামান ॥ যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী লালদিঘির পাড়। এই জায়গাটি অনেকের কাছে মানুষ বিক্রির হাট হিসেবে পরিচিত। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই এখানে জড়ো হতে থাকে দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষ। এরপর ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছে দরকষাকষিতে বিক্রি হয়ে যায় এসব শ্রমজীবী মানুষ। দিনের একটি বড় অংশ জুড়ে অন্যের সংসারে কাজ করে শ্রমের অর্থ দিয়ে চলে তাদের সংসার জীবন। কিন্তু প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস যশোরের এই মানুষ বিক্রির হাটের চিরচেনা দৃশ্য পাল্টে দিয়েছে। হাটে শ্রমজীবী মানুষের ভিড় থাকলেও নেই ক্রেতার উপস্থিতি। যেকারণে থমকে গেছে খেটে খাওয়া এসব দিনমজুরের দৈনন্দিন কার্যক্রম।
অসহায় এসব মানুষের অভিযোগ, বৈশিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে শোচনীয় পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন তারা। সংক্রমণ প্রতিরোধে ছুটি ও বিধি-নিষেধ থাকায় তারা কোনো কর্মের খোঁজ পাচ্ছেন না। জেলাজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অসচ্ছল দরিদ্রদের মাঝে নামমাত্র খাদ্য সহায়তা দেয়া হলেও এসব অসহায় মানুষের ভাগ্যে কোনো কিছুই জুটছেনা বলে তারা অভিযোগ করেন। যেকারণে কর্মহীন হয়ে পড়া এ মানুষগুলোর পরিবারে চরম মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। শনিবার সকালে লালদিঘিপাড়ে গিয়ে দেখা যায়, শতাধিক অসহায় নারী-পুরুষ সারি সারি দাঁড়িয়ে আছেন। এদের অধিকাংশের হাতেই ঝুড়ি আর কোদাল। কিন্তু কোনো ক্রেতা না আসায় তারা হতাশ হয়ে বসে আছেন। আজাহার আলী নামে একজন অসহায় শ্রমিক জানান, এর আগে তারা এখান থেকে কর্মের সন্ধান পেয়ে জীবিকা নির্বাহ করে সংসার চালাতেন। এখন প্রতিদিন কাঁকডাকা ভোরে এ হাটে এসেও কোনো ক্রেতা পাচ্ছেন না। যেকারণে দিনশেষে খালি হাতেই তাদের বাড়িতে ফিরতে হচ্ছে। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে মানুষ কার্যত ঘরবন্দী। কেউ ঘর থেকে বের হতে চাচ্ছেন না। তারপরও আমরা একটু কাজের সন্ধানে আসছি। কিন্তু কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। আরজ আলী নামে আরেক শ্রমিক বলেন, বাসায় মা-বাবা, স্ত্রী সন্তানসহ ৭ সদস্যর পরিবার। প্রতিদিন সংসার চালাতে আমার হিমশিম খেতে হয়। এখান থেকে কাজের চুক্তিতে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থানে কাজ করে সংসার চালাতাম। গত তিনদিন ধরে এখানে আসছি এখানে কাজের সন্ধানে। কিন্তু কাজ না মিলছে না। তিনি বলেন, আজ কাজ না পেলে বাড়ি কী হাতে নিয়ে যাবো তাই ভাবছি। এ অবস্থা চলতে থাকলে মরা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না আমাদের।
আকলিমা নামে এক গৃহবধূ বলেন, পূর্ব বারান্দিপাড়ায় একটি বাড়িতে কাজ-কর্ম করে সংসার চালাতাম। এক সপ্তাহ আগে বাড়িওয়ালা বাড়ি তালা দিয়ে গ্রামে চলে গেছেন। এখন আমার আর কোনো উপায় নেই। মানুষের কাছে শুনেছি এখানে আসলে নাকি কাজের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু গত দুই দিন আসতেছি কিন্তু কোনো কাজের সন্ধান পাচ্ছি না। তিনি বলেন, স্বামী অনেক আগেই আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন। এখন দুই সন্তান নিয়ে কোনোরকম মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে জীবন নির্বাহ করে আসছি। কিন্তু এখন কীভাবে চলবো তাই ভেবে পাচ্ছি না।
তিনি বলেন, শহরের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অসচ্ছল দরিদ্র পরিবারদের মাঝে খাদ্য সহায়তা দেয়া হলেও আমাদেও মত দরিদ্র মানুষের কপালে কিছুই জুটছে না। গত দুদিন আগে এখানে একদল মানুষ এসে মাত্র ৩০ প্যাকেট চাল দিয়ে চলে গেছে। আমাদের পর্যন্ত তা পৌঁছেনি। তবে বৈশ্বিক এ পরিস্থিতিতে দরিদ্রদের কর্মক্ষম মানুষের তালিকা প্রস্তুত করে প্রত্যেকের ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে যশোর পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু বলেন, পৌর এলাকার সকল দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্যদ্রব্য পৌঁঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মোট ১২ হাজার দরিদ্র মানুষের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৭ হাজার জনের মধ্যে চাল, ডাল, তেলসহ আনুষঙ্গিক দ্রবাদি পৌঁছে দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও সহায়তা প্রদান করা হবে বলে তিনি দাবি করেন। এ ব্যাপারে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ শফিউল আরিফ বলেন, আমরা যশোর শহর ও আশপাশ এলাকার যেসকল বস্তি এলাকা আছে সেসব এলাকায় সরাসরি গিয়ে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছি। ইতোমধ্যে জেলাব্যাপী ২৩ হাজার দরিদ্রের মাঝে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে যারা দরিদ্র আছেন তাদেরও সহায়তা দেয়া হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

ভাগ