করোনা অজেয় নয়

0
আমিরুল আলম খান
প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার এক করুণ গাথার কথা আমরা ইতিহাসে, উপাখ্যানে পাই। এককালে আক্কাদের বাড়িঘর ছিল সোনায় পরিপূর্ণ, মাঠের বাথানের চালাগুলো উপচে পড়তো কাটা ফসলের শীষে। সেই আক্কাদের জন্য ক্রুদ্ধ অপদেবতার উচ্চারিত অভিশাপ,
‘তোমার সকল শস্যদানা অন্তর্হিত হোক কর্ষিত মাটির অভ্যন্তরে/
তোমার বাগানের বৃক্ষসমূহ অন্তর্হিত হোক দূরের অরণ্যানীতে/
তোমার কসাই ছুরি চালাক বৃষের পরিবর্তে স্ত্রীর কণ্ঠনালীতে/
তোমার কসাই জবাই করুক মেষ শিশুর পরিবর্তে নিজের শিশুসন্তান…/
* * *
অশুভ বায়ু, নিঃশব্দলোকের প্রেতাত্মারা/
নিরন্তর নৃত্য করুক সেখানে।…/
তোমার নদীপথ শ্যাওলাতে আচ্ছন্ন হোক/
তোমার চওড়া নদীপথ সরু হয়ে যাক/
তোমার তৃণভূমি, যেখানে জন্মাতো সুস্বাদু উদ্ভিদ/
সেখানে এখন জন্মাক রোদনবৃক্ষ/
আক্কাদ, তোমার সুপেয় জলের নহর/
পরিবর্তিত হোক লবণাক্ত জলের নহরে../
কেউ যদি বলে এই শহরে আমি ঘুমাতে চাই/
তার ঘুমের জন্য কোনো বাড়ি যেন খুঁজে পাওয়া না যায়…’
সে অভিশাপের ফল ছিল ভয়াবহ। প্রাচীন মেসোপোটেমিয়ার এক গাথায় তার উল্লেখ আছে-
দেশের বিস্তীর্ণ কৃষিভূমিতে কোনো ফসল নেই
বন্যায় ভেসে যাওয়া জলাভূমিতে মাছ নেই
পুষ্পিত বাগানে মৌমাছি নেই, মধু নেই
আকাশে কৃষ্ণবর্ণ ঘন মেঘ, কিন্তু তাতে বৃষ্টির ধারা নেই …’
সেকালে বিজ্ঞান ছিল অনেক পিছিয়ে। প্রকৃতি আর দেবতায় পার্থক্য ছিল না। তাই মানুষ প্রকৃতিকে দেবতাজ্ঞানে পূঁজা করত। একটি বিষয় তারা কিন্তু ঠিকই বুঝেছিল। প্রকৃতি রুষ্ট হলে বিপদ। কিন্তু তারা তখনও উন্নত কৃৎ কৌশল আবিষ্কার করতে পারে নি। তবে প্রকৃতিকে শান্ত করতে মন্ত্র পাঠ, ভোগদানের ব্যবস্থা করত। লক্ষণীয় দেবতার উদ্দেশে দেয়া ভোগ কিন্তু ভোগ করত মানুষেই, দেবতার দান হিসেবে। শেষ বিচারে তা ছিল মানুষেরই সেবা। সেই সেবা শুধু প্রসাদেই থেমে থাকত না। কঠিন পরিশ্রমে জয় করার চেষ্টা করত ফসল
উৎপানের। শুধু সেখানেই থেমে থাকে নি প্রাচীন কালের মানুষ। রোগ জ্বরা থেকে বাঁচতে তারা চেষ্টা করেছে নানা রকম ওষুধ আবিষ্কারের। সে ওষুধের মূল উপাদানের জোগান এসেছে প্রকৃতি থেকেই। সেকালেও মানুষ অমরত্ব লাভের চেষ্টা করেছে। প্রাচীন মিশরে আল-কেমি বা রসায়নের চর্চা হয়েছে। মিশরীয় সাম্রাট ফেরাওদের স্বপ্ন ছিল মৃত্যুকে জয় করার। তারা চেষ্টা করেছে এলিক্সির বা মৃত্যুসঞ্জীবনী আবিষ্কার করে অমর হতে। সাফল্য যে কিছুই হয় তা কিন্তু নয়। তারা মমি করার রসায়ন ও কৌশল আবিষ্কার করেছে। এবং মৃতদেহ সংরক্ষণ করতেও সফল হয়েছে।
শুধু মিশরেই নয়। ভারতেও অমৃতের সন্ধান করেছে মানুষ। নিজেকে ঘোষণা করেছে ‘অমৃতস্য পুত্রঃ’ বলে।
এই একুশ শতকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া কোভিডের হামলা তাই নতুন কিছু নয়। মানুষ যখনই প্রকৃতির সর্বস্ব লুট করে একা ভোগ করতে উদ্যত হিয়েছে, তখনই প্রকৃতি নিজেকে রক্ষা করতেই এই পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু এইখানে এসে যে বিজ্ঞানের কথা আমাদের বোঝা দরকার তা হলো, প্রকৃতির শৃঙখল ভেঙে গেলে সেই ভেঙে যাওয়া পথে এমন সব অণুজীব আঘাত হানে যা শৃঙখলবদ্ধ অবস্থায় পারে না। পৃথিবীর সকল প্রাণে কোটি কোটি অণুজীবের বসবাস। এ এক জটিল জীবসংস্থান নীতি। সে সংস্থানে অহর্নিশ বাঁচার লড়াই। কেবল শক্তিমানই সে লড়াইয়ে জেতে। যে যতক্ষণ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে কেবল ততক্ষণই সে ঠিকে থাকে। হেরে গেলেই বিদায়। ডারউইন প্রথম এই তত্ত্ব হাজির করেছিলেন।
এখন করোনাভাইরাস হানা দিয়েছে। এ লড়াই মানুষ নিশ্চয়ই জিতে নেবে। কিন্তু যুদ্ধ মানেই ক্ষয়-ক্ষতি। কেউ জানি না, করোনার বিরুদ্ধে লড়াই কতদিন জারি থাকবে। কেউ জানি না, সে লড়াইয়ে মানুষকে কী পরিমাণ মূল্য দিতে হবে। তবে এটা নিশ্চয়ই আশা করা যায়, লক্ষ লক্ষ বছর ধরেই মানবজাতি এমন লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই এসেছে। ক্ষয়ক্ষতি যতই হোক, মানুষ শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে। তবে মানবিজাতিকে ভাবতে হবে অনেক কিছুই। বিশ্বব্যবস্থায়, প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক তাকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। করোনা পরবর্তী সে পৃথিবীর রূপ কেমন হবে তা নির্ভর করবে মানবজাতির শুভবুদ্ধির উপর। আসুন, আমরা আশরাফুল মখলুকাতের জয়গান গাই। অমৃতস্য পুত্রের জয়গান গাই। একযোগে, ঐক্যবদ্ধভাবে করোনা সংক্রমণ রোধে তৎপর হই। আমাদের মধ্যে জেগে উঠুক সকল মানবিক গুণাবলী। মানুষকে৷ ভালোবাসী। বিশ্বমা অব হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলি। প্রকৃতিকে ভালোবাসি। প্রকৃতিকে রক্ষা করি। প্রকৃতি সুস্থ থাকলে আমরাও বাঁচব, আমরাও সুস্থভাবে বাঁচব।
আমিরুল আলম খান, যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান
amirulkhan5252@gmail.com