লোকসমাজ ডেস্ক ॥ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। তারা বলেছেন, যেহেতু কাউন্সিলর পদে দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ নেই, তাই এ পদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ারও কোনো সুযোগ নেই। এ অবস্থায় কাউন্সিলর পদে সবাইকে ‘ওপেন’ নির্বাচন করতে দেয়ার সুযোগ দাবি করেছেন তারা। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) চসিক নির্বাচনের সমন্বয়ক ও দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে বিদ্রোহীদের প্রথম দফা সংলাপ ভেস্তে যায়। পরে শেষবারের মতো চেষ্টা চালাতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের চট্টগ্রাম আসার কথা থাকলেও অনিবার্য কারণবশত দলটি তার বর্ধিত সভা বাতিল করেছে। এ অবস্থায় অনেকের ধারণা, শেষ পর্যন্ত চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর পদে দলীয় প্রার্থিতা যুক্তি হয়তো খাটছে না।
এদিকে যারা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বারবার বলা হলেও তা আমলেই নিচ্ছেন না বিদ্রোহীরা। এ কারণে নির্বাচনী দৌড় শুরুর আগেই মাঠ হাতছাড়া হওয়ার দুর্ভাবনা তৈরি হয়েছে আওয়ামী লীগে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন আগামীকাল রোববার (৮ মার্চ)। চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে দাখিল করা মনোনয়নপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪৯টি ওয়ার্ডেই গড়ে অন্তত চারজন আওয়ামী লীগ নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সব মিলিয়ে ৭০ জনেরও বেশি বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন ওয়ার্ডগুলোতে। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থন পাননি এমন বর্তমান ১৮ কাউন্সিলরও রয়েছেন। তবে ব্যতিক্রম রয়েছে চারটি সাধারণ ও দুটি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে। পূর্ব ষোলশহর ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর এম আশরাফুল আলম, ৩৫ নম্বর বক্সিরহাট ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর হাজি নুরুল হক, ১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর হারুন অর রশিদ ও ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমনই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী। দলের কোনো নেতা তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে ভোটের মাঠে নেই। ১২ নম্বর (২৭, ৩৭ ও ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড) সংরক্ষিত ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর আফরোজা জহুর ও ১৪ নম্বর (৩৯, ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ড) সংরক্ষিত ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর শাহানুর বেগমই দলীয় সমর্থন পেয়েছেন। দলের কোনো নেতা তাদের প্রতিপক্ষ হননি। নগরের ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব জাগো নিউজকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ নেই। স্থানীয় সরকার আইন ২০১৫ (সংশোধীত) অনুযায়ী সিটি ও পৌরসভার মেয়র নির্বাচন দলীয় প্রতীকে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সদস্য নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী দেয়ার বিধান রাখা হয়নি। এর পেছনে দল ও সরকারে যৌক্তিক অবস্থান আছে।’ তিনি বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে দলের অনেক জনপ্রিয় ব্যক্তি আছেন। সে ক্ষেত্রে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে একজনকে সিলেক্ট করা কঠিন। সবার আগ্রহ থাকে জনপ্রতিনিধি হওয়ার। কিন্তু দল থেকে একজনকে মনোনয়ন দেয়ায় অন্যরা থেকে যান বঞ্চিতদের তালিকায়। ফলে স্থানীয় চাপে জনপ্রতিনিধি হতে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন। তাই ঘোষিত তালিকাই চূড়ান্ত নয়। গতবারও আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছি। এবারও দলের মনোনয়ন চেয়ে পাইনি, তবে এলাকার মানুষ আমাকে চাইছে। তাই নির্বচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ এই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আরও তিনজন। তারা হলেন- মেজবাহ উদ্দিন মিন্টু, হোসাইনুর রশিদ ও রফিকুল হোসেন বাচ্চু।
১৪ লালখান বাজার ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী ও বর্তমান কাউন্সিলর আবুল ফজল করিম আহমেদ মানিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘কে নির্বাচন করবে কে নির্বাচন করবে না, এটা পরের বিষয়। আগে আমি আমার মহল্লাকে ভালোবাসি। এটি দলীয় নির্বাচন নয়, তাই এখানে দলীয় কোনো প্রার্থী নেই। ১৪ লালখান বাজার ওয়ার্ডের তিনবারের কাউন্সিলর আমি। জনগণ চাইছে তাই নির্বাচনে এসেছি। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে কেউ এলে তাকে স্বাগতম জানাতাম। এখন যেহেতু দলীয় প্রতীক নেই, তাই দলীয় সমর্থনের বিষয়টিও নেই। দলের নেতারা আমাতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিলে বলব, চাপিয়ে দিলে লড়ে যাব।’
উল্লেখ্য, এই ওয়ার্ড থেকেও আওয়ামী লীগের আরও চারজন বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। তারা হলেন- লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুম, আবদুল আলিম স্বপন, তৌহিদ আজিজ ও মো. আবদুল কাদের। ২০ নম্বর দেওয়ান বাজার ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রফিকুল আলম বাপ্পী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি বিদ্রোহী না, জনগণের পক্ষের। সম্মিলিত নাগরিক সমাজ আমাকে প্রার্থী করেছে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন রুখতে এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন করতে আমি প্রার্থী হয়েছি।’ এই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান কাউন্সিলর চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী। এছাড়া দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আরও দুজন। তারা হলেন- মিটল দাশগুপ্ত ও লিয়াকত আলী। ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী ও বর্তমান কাউন্সিলর মোর্শেদ আকতার চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০১০ সালে সর্বদলীয় নাগরিক সমাজ ও ২০১৫ সালে এলাকার মানুষের জন্য নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছি। এবারও মানুষ নির্বাচনের জন্য চাপ দিচ্ছে তাই নির্বাচন করছি। জনগণ প্রথমে নৌকা প্রতীকে ভোট দেবে তারপর নিজেদের পছন্দনীয় প্রার্থীকে ভোট দেবে। কাইন্সিলরে যেহেতু প্রধানমন্ত্রী কাউকে নৌকা দেননি, তাই এখানে কেউ দলীয় প্রার্থী নয়।’
প্রসঙ্গত, দলের সমর্থনবঞ্চিত প্রার্থীদের নির্বাচনীমাঠ থেকে সরাতে নানাভাবে কাজ করে আসছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতারা। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে দলের সমর্থন পাওয়া এবং সমর্থনবঞ্চিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে একদফা বৈঠকে বসেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ওই বৈঠকের দিকে তাকিয়েছিলেন দলের সমর্থন পাওয়া আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। ধরে নেয়া হয়েছিল, সেই বৈঠক থেকে ভালো কোনো ফল আসবে। কিন্তু বৈঠক শুরু হওয়ার পর বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনড় অবস্থান দেখে বিস্মিত হন সিনিয়র নেতারা। বৈঠকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন যারা দলের সমর্থন পাননি তাদের সরে দাঁড়ানোর কথা বলতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন সমর্থনবঞ্চিত প্রার্থীরা। উল্টো সভায় কথা বলতে দেয়া হয়নি, এমন অভিযোগ তুলে মঞ্চের কাছে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ক্ষোভ ঝাড়েন বিদ্রোহীরা। তারা কাউন্সিলর পদ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতেও আহ্বান জানান। পরে সভা শেষ হলে বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ‘ওপেন’, ‘ওপেন’ বলে স্লোগান দিয়ে কাউন্সিলর পদ উন্মুক্ত রাখার দাবি জানান। এই পরিস্থিতির মধ্যেই জ্যেষ্ঠ নেতারা একে একে সভাস্থল ছেড়ে যান। পরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পরামর্শে রোববার (৮ মার্চ) আসন্ন চসিক নির্বাচনে কাউন্সিলর, সংরক্ষিত কাউন্সিলর ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে বর্ধিত সভার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু গতকাল রাতে পূর্বনির্ধারিত বর্ধিত সভা স্থগিত করা হয়েছে। নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না, সেটি সরকারের সিদ্ধান্ত। কিন্তু দলের স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড প্রার্থী ঠিক করে দিয়েছেন। সে অনুযায়ী নির্বাচন হবে।’ দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘চসিক নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মনোনয়ন বোর্ড যেভাবে মনোনয়ন দিয়েছে সেটাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত।’ প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত মেনে বিদ্রোহীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা এর বাইরে গিয়ে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’





