পেঁয়াজ আমদানি নিষিদ্ধ চায় চাষিরা

0

শেখ আব্দুল্লাহ হুসাইন ॥ সংকট উত্তরণে সারা দেশে চাষিরা যখন নতুন উদ্যোমে পেঁয়াজ চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, বাজারে চাষিরা যখন নিজেদের উৎপাদিত ফসলের দামও ভালো পাচ্ছেন, যে সময় চলছে বাংলাদেশে পেঁয়াজের ভরা মৌসুম, সারা দেশে পেঁয়াজের বাজার যখন স্থিতিশীল, ঠিক তখনি এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির পাঁয়তারা শুরু করেছেন। ভারত পেঁয়াজ রফতানি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়ার পরদিনই আমদানিকারকরা ইমপোর্ট পারমিটের আবেদন করেছেন সরকারি অনুমোদনের।
সরকারের কাছে চাষিদের দাবি, দেশিয় পেঁয়াজ বাজারে থাকা পর্যন্ত ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি যেন দেয়া না হয় । তাদের আরও দাবি আমদানি পুরোপুরি বন্ধ থাকলে বরং চাষিরা আরও বেশি বেশি জমিতে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহী হবেন। তারাও লাভবান হবেন এবং ভোক্তারাও উপকৃত হবেন। পাশর্^বর্তী দেশ এবং দ্রুত সময়ে অল্প খরচে আমদানি করা যায় বলে ভারত থেকে ৯০ শতাংশ পেয়াজ আমদানি করা হয়।
বাংলাদেশে এখন পেঁয়াজের ভরা মৌসুম। দেশেও এখন পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে। দাম ভালো পেয়ে চাষিরাও আগ্রহের সাথে নতুন নতুন জমিতে পেঁয়াজের আবাদ বাড়িয়ে চলেছেন। ঠিক এই সময় ভারত তাদের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে বাংলাদেশে যেকোনো মূল্যে পেঁয়াজ রফতানির ঘোষণা দিয়েছে। ওই দেশেও এখন পেঁয়াজের মৌসুম। ভারত সরকার তাদের দেশের চাষিদের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করতে পেঁয়াজ রফতানির জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছে।
গত বছর সংকট দেখা দেয়ায় সারা দেশে চাষিরা নতুন নতুন জমিতে পেঁয়াজের আবাদ বাড়িয়েছেন। দেশি ক্রস পেঁয়াজের মজুদ শেষ হওয়ার পর পরই মুড়িকাটা পেঁয়াজ ওঠে গত নভেম্বরের মাঝামাঝি। ওঠার মুহূর্তে যশোর বড় বাজারে মুড়িকাটা পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকা। পরে অবশ্য ৫০/৬০ টাকা কেজিতে নেমে আসে। দাম ভালো পেয়ে চাষিরা আগ্রহভরে পেঁয়াজ আবাদে নেমে পড়েন। মুড়িকাটা শেষ হওয়ার পর এখন বাজারে পোনা ভাতি (স্থানীয় ভাষায়) পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে। চৈত্র মাসের মাঝামাঝি আসল ভাতি পেঁয়াজ যা সংরক্ষণ করা যায় তা উঠে যাবে। ইতোমধ্যে যশোর বড় বাজারে খুচরা পোনা ভাতি পেঁয়াজ ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এখন খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজি। কিন্তু পেঁয়াজের এই ভরা মৌসুমে চাষিরা পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। এই মুহূর্তে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি করা হলে দেশের চাষিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। আগ্রহ নষ্ট হয়ে যাবে নতুন আবাদে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত বছরের থেকে এবার পেঁয়াজের আবাদ বেশি হয়েছে। যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতেরর উপ-পরিচালক ড. আক্তারুজ্জামান এ প্রতিবেদককে জানান, যশোরে এবার ১৪৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের চাষ হয়েছে। গত বছর হয়েছিল ১২০০ হেক্টর জমিতে। এবার ২৫০ হেক্টর জমিতে বেশি চাষ হয়েছে। তিনি বলেন, লাভবান হওয়ায় আগ্রহ নিয়ে বেশি জমিতে চাষিরা পেঁয়াজের আবাদ বাড়িয়েছেন। এখন বাজারে নতুন পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে। চৈত্রের মাঝামাঝি আসল ভাতি পেয়াজ উঠে যাবে। সেটা সংরক্ষণ করা যাবে।
ভারত গত বছর ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পেঁয়াজের রফতানি মূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণার পরের দিন বাংলাদেশে ৪৫ টাকার পেঁয়াজ এক লাফে ৭০ টাকায় ওঠে। অতি মুনাফালোভী মজুতদাররা রাতারাতি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন ভোক্তাদের পকেট থেকে। বাংলাদেশে ভারতীয় পেঁয়াজের রফতানি মূল্য ছিল প্রতি মেট্রিক টন ২৬৫ থেকে ৩০০ মার্কিন ডলার। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত রফতানি মূল্য বাড়িয়ে নির্ধারণ করে ৮৫০ মার্কিন ডলার।
এর পর ভারত সরকার তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের সংকট ও দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে গত ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়। মৌসুম শেষ না থাকায় সে সময় দেশি পেঁয়াজ চাষিদের হাত থেকে চলে গিয়েছিল মজুতদারদের হাতে। তারা ইচ্ছেমত দাম বাড়ানোর এক পর্যায়ে এ দেশের মানুষকে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে পর্যন্ত পেঁয়াজ কিনতে বাধ্য করে। পরবর্তিতে সরকার অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয়। তাতেও বাজার স্থিতিশীল হয়নি। নভেম্বরের মাঝামাঝি দেশি মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠলে পেঁয়াজের দাম কমে সহনীয় পর্যায়ে আসে।
দীর্ঘ পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারত পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। সে দেশের সরকার রফতানিকারদের যেকোনো দামে পেঁয়াজ রফতানি করার অনুমতিও দিয়েছে। আগামী ১৫ মার্চ আবারও পেঁয়াজ রফতানি করবে ভারত। ভারতের এই ঘোষণার পরপরই হিলি স্থলবন্দরের অন্তত ১০টি স্থানীয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ২৫ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি চেয়ে কৃষি সম্প্রসারণ আধিদফতরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রে ইমপোর্ট পারমিটের আবেদন করেছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে।
এদিকে ভরা মৌসুমে সরকার ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিলে চাষিরা আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে জানিয়েছেন। গত বছর দেশে পেঁয়াজের সংকটে তারা যে উদ্যোমে পেঁয়াজ আবাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাতে ভাটা পড়বে। তাদের দাবি যতক্ষণ না দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি দেখা যায় ততক্ষণ আমদানি বন্ধ রাখতে হবে।
শুক্রবার (৬ মার্চ) কথা হয় মাগুরা সদরের কুল্লিয়া গ্রামের পেঁয়াজ চাষি মো. রমজান মোল্লার সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, এ বছর তিনি চার বিঘা (৩৩ শতক বিঘা) জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। দুই বিঘা জমিতে পোনা ভাতি ও দুই বিঘা জমিতে আসল ভাতি পেঁয়াজ আবাদ করেছেন। প্রতি বিঘা জমিতে ৬০ মণ ফলন আশা করছেন তিনি। এখন বাজারে পোনা ভাতি পেঁয়াজ বিক্রি করে যথেষ্ট লাভবান হচ্ছেন বলে জানান তিনি। গতকাল যশোর বড় বাজারে তিনি পাইকারি ৪০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন। বিঘা প্রতি পেঁয়াজ আবাদে তার খরচ পড়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। বাজারে কেজি প্রতি ২০ টাকা ২৫ টাকাতে নেমে আসলেও তার খরচের দ্বিগুণ টাকা ঘরে আসবে।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার হুদাপাড়া গ্রামের পেঁয়াজ চাষি মো. ইশতিয়াক আহমদ জানান, গত বছর তিনি ১০ কাঠা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন। এ বছর বাজার ভালো হওয়ায় ১ বিঘা (৩৩ শতক বিঘা) জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। তিনি আরও বলেন, এখন পোনা ভাতি পেঁয়াজ বাজারে আসছে, থাকবে চৈত্র মাস পর্যন্ত। এর পরপরই চৈত্রমাসের মাঝামাঝি সময়ে নতুন আসল ভাতি পেঁয়াজ উঠে যাবে, যেটা সারা বছর সংরক্ষণ করা যায়।
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার নাটিমা গ্রামের চাষি মো. রশিদুল ইসলাম জানান, তিনি এ বছর ১ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। বাজারে পোনা ভাতি পেঁয়াজের দাম পেয়ে তিনি খুশি।
চাষি রমজান মোল্লা, ইশতিয়াক আহমদ ও রশিদুল ইসলাম পেঁয়াজ চাষে তাদের আগ্রহের কথা উল্লেখ করে জানান, তারা মনে করেন এ বছর সারা দেশে নতুন নতুন জমিতে চাষিরা পেঁয়াজ চাষ করেছেন ভালো দাম পাওয়ার আশায়। তারা এও জানান, বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকায় নামলেও আবাদের খরচের দ্বিগুণ টাকা তাদের ঘরে আসবে। বর্তমানে দেশে পেঁয়াজের ভরা মৌসুমে তারা আশঙ্কায় আছেন ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির খবরে। তাদের দাবি দেশের চাষিদের রক্ষা করতে হলে এই মুহূর্তে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখতে হবে। তারা আশা করছেন এ বছর যেভাবে চাষিরা পেঁয়াজ আবাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তাতে করে সম্ভবত সারা বছর দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব হতে পারে। আর এ বছর চাষিরা লাভবান হলে আগামী বছর আরও বেশি বেশি জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হবে বলে অনুমান করা যায়। তবে তারা সরকারের কাছে দাবি জানান দেশে পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার তৈরির।