ব্লাস্টকে পরাজয় বিজ্ঞানীদের সুখবর গম চাষিদের জন্য

আকরামুজ্জমান ॥ গম চাষিদের জন্য সুখবর নিয়ে এলো বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট ও আন্তর্জাতিক গম ও ভুট্টা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিমিটের বিজ্ঞানীরা। একই সাথে উঠে যাচ্ছে দণি-পশ্চিমাঞ্চলে পাঁচটিসহ দেশের সাত জেলায় গম চাষের উপর নিষেধাজ্ঞা। তিন বছরের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা কৃষকের জন্য এনেছেন ব্লাস্টরোধী গম। বারি-৩৩ নামের এ গম অচিরেই হাতে পাবেন কৃষক, একই সাথে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হচ্ছে ব্লাস্ট বহণকারী বারি-২৬ জাতের গম। গতকাল রোববার যশোর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের গমের ব্লাস্ট রোগ নিয়ে গবেষণা মাঠে সরেজমিনে পরিদর্শনকালে বিজ্ঞানী ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
কৃষি বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, ব্লাস্ট গমের ছত্রাকজনিত রোগ। ছত্রাকটির বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাগনাপরথি অরাইজি (পাইরিকুলারিয়া অরাইজি) প্যাথোটাইপ ট্রিটিকাম। গমের শীষ বের হওয়া থেকে ফুল ফোটা পর্যন্ত সময়কালে তুলনামূলক উষ্ণ ও আদ্র আবহাওয়া থাকলে এই ছত্রাকের সংক্রমণ ঘটতে পারে। এতে ফলন বিপর্যয় হয়। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ব্লাস্ট রোগের প্রাদূর্ভাব ঘটে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ওই বছর যশোর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল ও ভোলা জেলায় প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির গমের আবাদে এই রোগের কারণে ফলন বিপর্যয় ঘটে। সরকারিভাবে রোগটি প্রথম শনাক্ত করা হয় মেহেরপুরের মুজিবনগরে। এ অবস্থায় মেহেরপুরের বারাদি ও চিতলা এবং চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ বিএডিসি খামারের ২১০ হেক্টর গম বীজ েেতর ফসল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে ২০১৭ সাল থেকে গম চাষ না করতে সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত কৃষকদের কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে গম চাষে নিরুৎসাহিত করা হয় কৃষকদের। তবে নিরুৎসাহিত করার পরও চলতি মৌসুমে যশোর, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া জেলায় কৃষকরা কিছু এলাকায় গম চাষ করলেও সেখানে ফের দেখা দেয় ব্লাস্টের আক্রমন।
বিজ্ঞানীরা জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্লাস্ট প্রতিরোধী গমের জাত উদ্ভাবনে গত তিন বছর ধরে যশোর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মাঠে ব্লাস্ট নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক গম ও ভুট্টা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিমিট, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত এই গবেষণার অংশ হিসেবে গবেষণা কেন্দ্রটির মাঠে প্রায় পাঁচ হাজার লাইনে গমের বিভিন্ন জাতের চাষ করে গবেষণা পরিচালনা করা হয়। গবেষণাকালে বিজ্ঞানীরা ব্লাস্ট প্রতিরোধী বারি গম-৩৩ জাতের আবিস্কারের পাশপাশি মাত্রাতিরিক্ত ব্লাস্ট আক্রমনের সম্ভাব্য জাতও চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। রোববার যশোর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মাঠে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, আফগানিস্থান, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ২৫ জন গবেষক মাঠটি পরিদর্শন করেন। এসময় কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতণ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। ব্লাস্ট নিয়ে গবেষণার সাথে যুক্ত এ গবেষকরা গবেষণা কেন্দ্রে গমের ক্ষেত পরিদর্শন করেন এবং ব্লাস্ট প্রতিরোধী ও ব্লাস্ট আক্রান্ত গমের জাত চিহ্নিত করেন।
এসময় কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বলাই কৃষ্ণ হাজরা বলেন, গমের ব্লাস্ট নিয়ে বাংলাদেশের কৃষকদের আর উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে ব্লাস্ট প্রতিরোধী ও ব্লাস্ট আক্রান্ত জাত চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে বারি গম ২৬ গমের জাতটিতে বেশি ব্লাস্ট আক্রান্ত হয়েছে। অথচ একই ক্ষেতে বারি গম-৩৩ চাষ করা হলেও সেখানে কোনো ব্লাস্ট আক্রমণ হয়নি। তিনি বলেন, আগামীতে বাংলাদেশে আর বারি গম-২৬ চাষ করতে দেয়া হবেনা। গমের এ জাত সরিয়ে নেয়া অর্থাৎ বিলুপ্ত করা হবে। জাতটি আমাদের দেশের বর্তমান আবহাওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এক্ষেত্রে বারি গম-৩৩ জাতটিই আমাদের দেশের জন্য উপযুক্ত। এজন্য আগামী মৌসুমে ৩৩ জাতের এ গমের বীজ সরকারি উদ্যোগে কৃষক পর্যায়ে দেয়া হবে। বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড.এসরাইল হোসেন বলেন, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট ব্লাস্ট প্রতিরোধী বারি গম-৩৩ নামের এ জাত উদ্ভাবন করেছে। বোরলগ-১০০ নামের আরেকটি ব্লাস্টরোধী জাত অবমুক্তির পর্যায়ে রয়েছে। সিমিটের গবেষণায় আরো কিছু ব্লাস্ট প্রতিরোধী জাত পাওয়ার আশা করা হচ্ছে তিনি জানান। তিনি বলেন, এবছর মেহেরপুরে কৃষকের ক্ষেতে ব্লাস্ট আক্রমণ হয়েছে। সেখানে আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি বারি গম-২৬ সহ অন্যান্য কিছু জাতের গমে ব্লাস্ট আক্রমন হয়েছে। অথচ যারা বারি গম-৩৩ চাষ করেছেন তাদের ক্ষেতে ব্লাস্ট আক্রমন হয়নি। তিনি বলেন, গমের এ জাতটি আমাদের দেশের আবহাওয়ার সাথে একেবারেই মিলে গেছে। যেকারণে এখন থেকে বারি গম-৩৩ চাষের জন্য কৃষককে উৎসাহিত করা হবে। আগামীতে বাংলাদেশে গম থেকে ব্লাস্ট বলে আর কিছু থাকবেনা বলে তিনি দাবি করেন। এদিকে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের আয়োজনে ও আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্র (সিমিট) ও এসিআইএআর এর সহযোগিতায় গমের ব্লাস্ট রোগের প্রতিরোধী জাত বাছাই ও সার্ভিলেন্স- এর উপর ১০ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কোর্স যশোর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে শুরু হয়েছে। ১ মার্চ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত চলবে এ প্রশিক্ষণ কোর্স। প্রশিক্ষণ কোর্সে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকসহ মেক্সিকো, ভারত, নেপাল, আফগানিস্থান ও জাম্বিয়ার ২৫ জন বিজ্ঞানী অংশ গ্রহণ করছেন।

ভাগ