চেতনায় অমর একুশে

মহিউদ্দীন মোহাম্মদ ॥ ‘হে আমার জ্ঞান একটি মাত্র উচ্চারণের বিষ আমাকে দাও/ যা হৃদয় থেকে হৃদয়ে ছড়ায়,/ ওষধি জন্মের মতো একবার স্পন্দিত হয়ে যে ঘৃণা আর/কখনো মৃত্যুকে জানে না, হে আমার জ্ঞান!’ এটা খুব সত্যি কথা যে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধি মানে জাতির মাথা উচ্চ শিখরে উন্নীত হওয়া। সভ্য জাতিগুলোর প্রধান অর্জন জ্ঞান-বিজ্ঞান। কিন্তু আমরা এ সত্যটি বুঝতে কার্পণ্যই করি বটে। লক্ষ্য করুন প্রিয় পাঠক, অষ্টম,নবম এবং দশম শতাব্দীতে মুসলিম সভ্যতা গৌরবের উচ্চশিখরে অধিষ্ঠিত। বিজ্ঞান চর্চায়ও মুসলমানেরা সর্বোন্নত জাতি। অথচ ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞান চর্চার কোনো বিরোধ ঘটেনি। দ্বাদশ শতাব্দীতে ইমাম গাজালি (রহ.) বিজ্ঞান চর্চাকে প্রয়োজনীয় মনে করেছেন এবং এই জ্ঞানকে ধর্মবিরোধী বলেননি। বরঞ্চ কুরআন শরীফে আল্লাহতাআলা মানুষকে- তার সৃষ্টিকে বিশেষভাবে জানার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এই বিশেষভাবে জানতে গেলে প্রয়োজন পড়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের। কোনো ভাবেই আমরা বিজ্ঞানকে অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে-এটা চর্চার জন্য মাধ্যম হিসেবে যে ভাষার প্রয়োজন সেটা বুঝতে আমরা বোকার স্বর্গে বাস করছি। আমরা মনে করছি এটা জানতে গেলে বাংলায় সম্ভব নয়। অথচ এটা একটা মারাত্মক ভুলা। ‘নানান দেশের নানান ভাষা/ বিনে স্বদেশী ভাষা মিটে কি আশা’-রামনিধিগুপ্ত’র একথা চরম সত্য।
ভাষা সংগ্রামের এত বছর পরে এসেও খুব লজ্জা লাগে যখন দেখি এভাষা নিয়ে অনেকের মধ্যে হীনমন্যতা ও বিপন্নতা। এজন্য একজন লেখক এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলা নিয়ে অজানা কোন কারণে কিছু ব্যক্তি হীনমন্যতায় ভোগেন। তারা মনে করেন এ ভাষাটি ঠিক জাতে ওঠেনি। এটি নতুন কিছুকে আত্মস্থ করতে পারে না। ইংরেজী, জার্মান, গ্রীক-এ জটিলতর যে সব ভাবনা ভাবা সম্ভব, বাংলায় হয়তো সেটা সম্ভবই নয়। এরা স্রেফ বাংলা নিয়ে নিজেদের অজ্ঞতার দায়টি চাপাচ্ছেন পুরো ভাষাটির উপরেই। সে অজ্ঞতা কাটানো এই আলোচনার ল্য নয়। তবু একটা উদাহরণ দেই, ‘ডেমক্রেসি’ শব্দটার কথাই ভাবুন। যে ভাষাভাষীদের মধ্যে এ ধারণার উৎপত্তি, তারা কি তাদের ভাষায় শব্দটা ছিলো বলেই ধারণাটা ভাবতে পেরছে ? না কি আগে ডেমক্রেসির ধারণাটিকে তারা উদ্ভাবন/আবিষ্কার করেছে পরে সেটাকে নাম দিয়েছে ‘ডেমক্রেসি’। আমরা এর পরিভাষা করেছি ‘গণতন্ত্র’। আমাদের ভাষাটাও সমৃদ্ধ হয়েছে এতে।’
অনেকে ইংরেজী শিখে ফেলেছেন বা নতুন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। এবং শুরুতে ভিনদেশি ভাষায় বিজ্ঞান শিখতে গিয়ে যে ‘লড়াই’টা তাদের করতে হয়েছে সেটাও ভুলে গেছেন। অনেকটা বড় হয়ে আমরা যেমন শিশু-কিশোরদের মন কী চায় সেসব ভুলে যাই তেমন। কিন্তু আমাদের পুরো বাঙালি জাতিই পিছিয়ে আছে বিজ্ঞান শিায়। তাদের বিজ্ঞানমনস্ক, বিজ্ঞান শিতি হয়ে ওঠার পথে ভিনদেশি একটা ভাষাকে কেন অন্তরায় হতে দিচ্ছি? একটা কথা এখানে স্পষ্ট করে বলা উচিৎ, বাংলায় ‘বিজ্ঞান শিার প্রচারণা চালানো’, মানে ‘ইংরেজী ত্যাগ করো’ আন্দোলন করা নয়। আন্তর্জাতিক ভাষা হিসাবে ইংরেজিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই শিখতে হবে। কিন্তু কাব্য চর্চার পূর্বশর্ত যেমন ইংরেজী হতে পারে না তেমনি, সেটাকে অযাচিতভাবে, বিজ্ঞানের মত নৈর্ব্যক্তিক একটা বিষয়কে শেখার পূর্বশর্ত বানালে চলবে না। খুবই টেকনিক্যাল বিষয়ে যোগাযোগের জন্য বর্তমান বিশ্বে সবাই ইংরেজীর দ্বারস্থ হয় ঠিকই। তবে ‘বিজ্ঞানের ভাষা ইংরেজী’ বা ‘ইংরেজী ছাড়া বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব নয়’এই ভাবনা পুরোপুরি ভুল।
বাংলা ভাষায় যদি বিজ্ঞান চর্চা করা হয় তাহলে সব থেকে বড় লাভ হলো, শিক্ষার্থীদের বাংলা সহজাত ভাষা হওয়ায় বিজ্ঞানের প্রতিটি জটিল বিষয়কে তারা সহজভাবে বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারবে। তাদের ভাষা শিার জন্য আলাদা সময় ব্যয় করতে হবে না। নিজস্ব ভাষা সহজবোধ্য হওয়ায় শিার্থীরা বিজ্ঞান চর্চায় অনেক বেশি উৎসাহী হয়ে উঠবে। চীন, রাশিয়া, জার্মানি ও জাপানসহ বিশ্বের উন্নত জাতিগুলোর দৃষ্টান্ত টেনে অধ্য অধ্যাপক ড. হাফিজুদ্দিন আহমেদ তার এক প্রবন্ধে বলেছেন, ‘উন্নত জাতিগুলো তাদের নিজেদের ভাষায়ই বিজ্ঞান চর্চা করে। আমাদের দেশের শিার্থীরা ওইসব দেশে পড়ালেখা করতে গেলে প্রথম ছয়মাস তাদের ভাষা শিখতে হয়। বাংলায় চিকিৎসাশাস্ত্রের বই লিখিত ও অনুবাদ হলে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। অনেক সময় দেখা যায় পরীার সাাৎকারে আমাদের শিার্থীরা অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না ইংরেজিতে প্রশ্ন করার কারণে। অথচ বাংলায় প্রশ্ন করলে দেখা যেত তারা সে প্রশ্নের উত্তর জানে।’ ‘বিদেশি ভাষাই শিা বিস্তারের জন্য প্রতিবন্ধক’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ উদ্ধৃতি উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. হাফিজুদ্দিন আহমেদ আরো বলেন, ‘মাতৃভাষায় শিা দান করা হলেই কেবল ভাষার জন্য আমাদের শহীদদের আত্মত্যাগ স্বার্থক হবে।’

ভাগ