চেতনায় অমর একুশে

মহিউদ্দীন মোহাম্মদ ॥ কবি সমুদ্র গুপ্তের একটি কবিতার চারটি চরণ এরকম-‘রাত্রিদিবার অন্য সকল সময়/একুশ যেন সতর্ক প্রহরা/এদিক ওদিক একটু সরে গেলে/একুশ বলে নিজের পায়ে দাঁড়া।’ একুশ আসলে শুধুমাত্র ভাষা আন্দোলন হিসেবে স্মর্তব্য নয়। এটার ভেতর ছিল দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নটিও। যে কারণে এ আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল উনিশশ’ একাত্তরে। স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যদিয়ে বিশ্বে ভাষার নামে একটি দেশের জন্ম হলো। এমন ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নাই।
তবে আজকে আমরা একটা জিনিস লক্ষ্য করছি-আমরা সেই দার্ঢ্য বাঙালি বোধ হয় নেই। ‘তোরা পরের ওপর ভরসা ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়া।’ সত্যিই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছি না বোধ হয়। এবং চূড়ান্তভাবে যেটি পারছি না তাহল-ঔপনিবেশিক চিন্তা থেকে বের হতে। ভাষা সৈনিক আহমদ রফিক তার ‘ভাষা আন্দোলন’ গ্রন্থে লিখেছেন-বাংলা রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক ওই অর্জনের বাইরে একুশে আমাদের জাতীয় জীবনে যা দিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে এক নয়া চেতনার প্রকাশ, যা একাধারে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিবাদী চরিত্রের। একইভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অনুরূপ চেতনার প্রকাশ ঘটেছে এবং তা নানামুখী বাধা সত্ত্বেও। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের জনস্বার্থনির্ভর স্লোগান এখন পর্যন্ত পুরোপুরি অর্জিত না হলেও এর রাজনৈতি গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তিনি আরো লিেেখছেন-…বাঙালির জাতীয়তাবোধক আত্ম-অন্বেষা ও আত্মচেতনার ধারা একান্তভাবে একুশের দান। এ ধারায় সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী মনোভাবের প্রকাশ ক্রমেই বিস্তার লাভ করে, বিশেষ করে শিক্ষিত মহলে। এমন এক ইতিহবাচক জাতীয়তাবোধের প্রকাশ ঘটেছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী উচ্চারণে:‘পূর্বপাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’। ওই আহ্বান দাঙ্গা রোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে এবং এক্ষেত্রে আমির হোসেন চৌধুরীর শহীদ হওয়ার ঘটনাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
শহীদ আমির হোসেন চৌধুরী ১৯৬৪ সালের ১৫ জানুারি ঢাকায় সকল বিপন্ন প্রতিবেশীকে রা করেছিলেন । দাঙ্গা থেমে যেতে বাজারের পথে কিছু দুষ্কৃতী তাকে প্রকাশ্যে দিবালোকে হত্যা করে। এই ঘৃণ্য হত্যার প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের সকল প্রগতিশীল সংবাদপত্রে সেই দিন শিরোনাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’। সত্যিই ওই মানবিক চেতনার বলিষ্ঠ প্রকাশ বিস্মিত ও বিচলিত করেছিল পাকিস্তানের অবাঙালি প্রধান কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীকে। তাই ষাটের দশকের অধিকাংশ সময় জুড়ে চলেছে সামরিক শাসন। আর পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির বরাবর চেষ্টা ছিল পূর্ববাংলায় ক্রমবর্ধমান গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ধর্মীয় চেতনার প্রভাবে বিনষ্ট করে দেওয়ার। তাদের সে চেষ্টা সফল হয় নি।…একুশের ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিল না, ছিল গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের নেপথ্য শক্তি। এ শক্তির ধারাবাহিকতায় সম্ভব হয়েছিল উনসত্তরের গণ-আন্দোলন, এমনকি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ। আর ওই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন ভাষিক রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এই ফাঁকে একটা বিষয় প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বয়ান অনুসারে বলি- যতই আমরা বাগাড়ম্বর করি, দেশে এখন দেশপ্রেমের ভীষণ অভাব। মাতৃভাষার প্রতি অবজ্ঞা ও অবিচার সে কথাটাই নীরবে বলে যাচ্ছে, আমরা শুনছি না। বলছে এই কথাও যে, এই রাষ্ট্রে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি বাংলা যাদের মাতৃভাষা। বাংলা চালু আছে শুধু সমাজের অপোকৃত নিম্নস্তরে। সর্বোপরি বলছে এটাও যে, এ দেশ মোটেই স্বাধীন নয়, রয়েছে সে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের অধীনে, যার ভাষা বাংলা নয়, ইরেজি বটে।’ গরীবানায় ধাতস্ত হয়ে আমরা এমন হীনম্মন্যতাকে পুঁজি করে বসে আছি যে, জেতার মানসিকতার চেয়ে হারের মানসিকতাকে আগেই মেনে নিয়েছি। ভিখিরীরও স্বজাত্যবোধ আছে,কিন্তু আমাদের নেই। বলা হচ্ছে যে, বাংলা ভাষার চর্চা করতে গেলে আমাদের পে বিপদ আছে কুয়োর ব্যাঙ হয়ে পড়ার। এত বড় অসত্য ভাষণ, নিমতিতা কথা আর দ্বিতীয়টি হয় না। বাংলা ভাষার চর্চা করলে আমরা মোটেই কূপম-ক হবো না, বরঞ্চ হব আন্তর্জাতিক। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সারা বিশ্বের যত অর্জন সবটা অনুধাবন, অনুবাদ ও রচনার মধ্য দিয়ে আত্মস্থ করে নেবো এবং সেই আহরণটা একদিকে যেমন হবে গভীর ও সৃজনশীল, তেমনি আবার হবে সর্বজনীন। জ্ঞান ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকবে না, পরিণত হবে সমষ্টিগত সম্পদে। আমরা খাড়াখাড়ি ওপরের দিকে উঠে যাব না; অন্যকে খাটো করে নিজে বড় হব না, আমরা ছড়িয়ে যাব আড়াআড়ি, উন্নত হব সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, একের উন্নতি পুষ্টি হবে বহুর উন্নতির দ্বারা। বহুর উন্নতি বৃদ্ধি পাবে একের পর একের সংযোজনে।

ভাগ