চেতনায় অমর একুশে

মহিউদ্দীন মোহাম্মদ ॥ যুগে যুগে বাংলাকে নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। সেই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে বাঙালি জাতি। আমরা আজকে ইতিহাসের সেই অধ্যায়ের সাথে পরিচিত হব-যখন কিনা বাংলা ভাষার চর্চাটাকে অগৌরবের মনে করা হতো। আসুন সেই গোড়ার গল্পটি শুনি।
ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ ‘আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিতে’ উল্লেখ করেছেন, নবী নূহ (আ.)-এর সময়ের মহাপ্লাবনের পর তাঁর অন্যতম পুত্র হাম পৃথিবীর দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। হামের এক পুত্র হিন্দ যে অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন সে অঞ্চল হিন্দুস্তান বা হিন্দুস্থান। হিন্দের দ্বিতীয় পুত্র বঙ্্ উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। বঙের বংশধরদের আবাস্থলই ‘বঙ্গ’ নামে পরিচিতি। বঙের সন্তান সন্ততিরা এ অঞ্চলে কতকাল বসবাস করেন তা জানা যায় না। প্রাচীনকালে নানা পরিবর্তনের ফলে ‘বঙ’ জনগোষ্ঠীর পরে ক্রমে নেগিটো, অস্ট্রোলয়েড বা অস্ট্রোএশিয়াটিক,মঙ্গোলয়েড বা ভোটচীনীয় ও দ্রাবিড় গোষ্ঠী এদেশে আসেন। তাদের অনেক পরে এ অঞ্চলে আর্যদের আগমন ঘটে। বঙ্্ জাতির পর বিভিন্ন জাতির সংমিশ্রণেই বর্তমান ‘বঙ্গ’ জাতির আদি মানবগোষ্ঠী। আর্যরা হিন্দুস্থানে আসেন খ্রিস্টের জন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। আর তারা হিন্দুস্থানের পূর্বাঞ্চলে আসেন এরও প্রায় দুই হাজার বছর পরে। বাংলা ভষাার সৃষ্টি ও সমৃদ্ধিতে এসকল প্রাচীন জাতি ও গোষ্ঠীর অবদান প্রবল প্রভাব বিস্তার করে আছে। এদেশবাসীর জীবনে দ্রাবিড়দের প্রভাব সবচাইতে বেশি। মুণ্ডা, কোল ইত্যাদির প্রভাবও নগণ্য নয়।
পণ্ডিত দীন মুহাম্মদ আরও উল্লেখ করেছেন, ‘বৌদ্ধ ধর্মাশ্রিত চর্যাপদগুলোতে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন পাওয়া যায়। এগুলো বাংলায় পালদের শাসনামলে রচিত হয়। কাজেই বলা যায়, বাংলাদেশ বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশ লাভ ঘটে বৌদ্ধ আমলে, বিশেষ করে পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায়। কিন্তু পরবর্তীতে পাল রাজত্বের অবসানে আর্য সেন আমলে সাহিত্য ও রাষ্ট্রভাষায় সংস্কৃত আমদানি করে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা রহিত করা হয়। রাজাদেশ অনুসরণ করে শাস্ত্রবিদ পণ্ডিতগণও ‘দেবভাষা’ সংস্কৃত ছাড়া লোক ভাষায় শাস্ত্রালোচনা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। তারা ফতোয়া দেন-‘অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানিচ।/ভাষায়াং মানব শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ।’ অর্থাৎ অষ্টাদশ পুরাণ ও রামচরিত ইত্যাদি ধর্ম শাস্ত্র ‘লোক ভাষায়’ শ্রবণ ও আলোচনা করলে রৌরব নরকে যেতে হবে। তাই দেখি খ্রিস্টীয় নবম থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চার দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়।’ এ থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার-বহুকাল আগে থেকেই এ বাংলার সাথে শত্রুতা চলেছে। এজন্য খানিকটা সময় লেগেছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে।
মূলত বঙ্গে মুসলিম বিজয়ের পর থেকে বাংলা ভাষা চর্চা শুরু হয়। আর সেটা ছিল ত্রয়োদশ শতাব্দি। মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচেষ্টায়ই বাংলা ভাষা লালিত ও পরিপুষ্ট হয়। মুসলিম আমলেই বাংলার সত্যিকার বিকাশ ও স্ফূর্তি ঘটে। বাংলায় মুসলিম আগমন না ঘটলে এবং মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কোনোদিন বর্তমান অবস্থায় পৌঁছতে পারতো কিনা সন্দেহ। একথা ঐতিহাসিক সত্য যে, বাংলাদেশে মুসলিম আগমন বাংলাদেশ ও বাংলার জনগণের জন্য বাংলা ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতির রতœভাণ্ডার স্বর্ণশিখরে আরোহন করে। অনেকেই তাই মধ্যযুগকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলে আখ্যা দেন। বাংলা ভাষায় কথা বলা এবং শাস্ত্রাদি আলোচনা ও কাব্য চর্চা যারা নিষিদ্ধ করেছেন, তাদের লক্ষ্য করেই আমাদের মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিম উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন-‘ যে জন বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী,/ সে জন কাহার জন্ম নির্ণয়ন জানি।’ এদেশে জন্মেও এদেশি ভাষার চর্চায় যাদের অনীহা, তারা এ দেশে ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায় না কেন, বলে তিনি তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। অনেকের ধারণা, আঠার-উনিশ শতকে যেসব বিদেশাগত মুসলমান ঘরে ও বাইরে উর্দু ভাষা ব্যবহার করা আভিজাত্যের লক্ষণ বলে মনে করতেন এবং এ দেশের নিম্ন শ্রেণির হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত মুসলিম সমাজের ভাষা বলে বাংলাকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতেন, আর সে কারণে বাংলায় কথাবলা ও সাহিত্য চর্চায় অনীহা প্রকাশ করতেন, তাদের সম্পর্কে কবি আব্দুল হাকিম এ উক্তির মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ ধারণা ঠিক নয়। তিনি যে যুগে তার কাব্য রচনা করেছেন, সে যুগে উর্দু বাংলার তর্ক যুদ্ধ সৃষ্টি হয়নি। এ তর্ক যুদ্ধ সৃষ্টি হয়েছে ইংরেজ আমলে। এসময় আধুনিক বাংলা সাহিত্য পদে গদ্যে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে চলেছে। পরে বিশ শতকে এসে সে বিতর্ক মিটে যায়। বঙ্গে বাংলা ভাষা চর্চার হিন্দু-মুসলিম অধিকার স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলা ভাষা সম্পর্কে আলোচনায় একথাগুলি স্মরণ রাখতে হবে।

ভাগ