আর যেন ভোটাধিকার হরণ না হয়

0

সব জল্পনা কল্পনা আলোচনা সমালোচনা হিসেব-নিকেশের অবসান ঘটিয়ে শেষ হলো ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। পহেলা ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনমত প্রতিফলিত হয়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে ব্যাপকভাবে সরকার দলীয় অর্থাৎ নৌকা প্রতিকের দুই মেয়র প্রার্থী ও তাদের কাউন্সিলর প্রার্থীদের কর্মীরা কেন্দ্র দখল থেকে শুরু করে ভোট জালিয়াতি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রার্থী তাদের এজেন্ট এবং নেতারা অভিযোগ করেছেন নৌকার পোলিং এজেন্ট ও সন্ত্রাসীরা ধানের শীষের এজেন্টদের অধিকাংশ কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে। যারা গঞ্জনা সহ্য করে কেন্দ্রে থেকেছেন তাদের নীরব দর্শক থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। কেউ এর প্রতিবাদ করলে তাকে মারধরও করা হয়েছে। নেতারা এ অভিযোগের প্রমাণ দিতে গিয়ে বলেছেন সন্ত্রাসী ও কেন্দ্র দখলের সংবাদ সংগ্রহকারী সাংবাদিকরাও রেহাই পাননি। অন্তত ৭ জন সাংবাদিককে নৌকা সমর্থকরা কুপিয়ে এবং পিটিয়ে জখম করেছে। ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ করে সন্ত্রাসের নিন্দা ও বিচার দাবি করেছেন।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল মেশিনে ভোট দেয়া। সকল বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন একবারই দুই সিটি কর্পোরেশনের সকল কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট গ্রহণে সিদ্ধান্ত নেন। সরকার পক্ষের সমর্থন নিয়ে ইসি তার সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। সংবাদ মাধ্যম ও বিরোধী দলের পৃথক অভিযোগ হচ্ছে ইভিএমে ভোট জালিয়াতি ছাড়াও ভোটারদের বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে। খোদ সিইসি কেএম নুরুল হুদা এই বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন বলে নিজেই জানিয়েছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফর উল্লাহ একই রকম অভিযোগ করেন। সংবাদ মাধ্যমগুলো বলেছে, অধিকাংশ প্রবীণ ভোটার বিড়ম্বনার শিকার হয়ে কেউ ভোট দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, কেউবা দীর্ঘক্ষণ পর ভোট দিতে পেরেছেন। সব মিলে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ইভিএম জাতীয় বা সিটি নির্বাচনের জন্য এখনও উপযুক্ত নয়। স্বাভাবিক বা দ্রুত ভোট গ্রহণে সহায়কের বদলে এটা অন্তরায় হয়েছে। ভোটের ধীর গতির যে অভিযোগ তার প্রধান কারণ ইভিএমের যান্ত্রিক ত্রুটিসহ ভোটারদের অনভিজ্ঞতা। সব মিলে ইভিএমে এক সাথে রাজধানীর সব কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত বিতর্কিত হয়েছে এবং এ ব্যাপারে নতুন করে সিদ্ধান্তের দাবি জোরালো হয়েছে।
অথচ, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে এবার আশার কমতি ছিল না। তফসিল ঘোষণার পর যে পরিবেশ দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় দেখা গেছে, তাতে আশাবাদি হওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল। কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল সমর্থিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল বেশি। ফলে দলের মধ্যেই সংঘর্ষ ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বড় হয়ে দেখা দেয়নি। নির্বাচনের আগে প্রচারের সময় যে গোলযোগ হয়েছে তা অন্য যে কোন নির্বাচনের সময়ের চেয়ে খুব একটা বেশি নয় বলে ধরা যায়। অতীতের প্রায় সব নির্বাচনে রাজনৈতিক দল কর্মী সমর্থকদের মধ্যে এমন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এবারের সিটি নির্বাচনে সে পরিবেশ শেষ পর্যন্ত বড় হতে পারেনি। এসবকারণেই ধরে নেয়া হয়েছিল এবার একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দেয়া যাবে। শেষ পর্যন্ত সেই আশা আর পূরণ হয়নি। ভোটের দিন সার্বিক উত্তেজনাময় পরিস্থিতিতে দিনশেষে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ ভাগ ভোটার অংশ নিতে পেরেছে। তারপরও তারা ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বাভাবিক পরিবেশ পাননি। অনেকেই অভিযোগ করেছেন এমন অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আর নির্বাচন হয়তো হবে না। জনগণ ভোট দিতে আসবে না।
ভোটার-জনতা এসব অভিযোগ এবং সন্ত্রাসের চিত্র তুলে ধরে বিএনপি নির্বাচনের দিন বিকেলেই নির্বাচন ও ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। তারা প্রতিবাদ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে ২ ফেব্রুয়ারি (গতকাল) রাজধানীতে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচির ঘোষণা করে। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে এমন প্রতিবাদ তাদের জন্য স্বাভাবিক বলেই আমরা মনে করি। ২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর বিএনপি প্রতিবাদহীন থাকায় তাদের জনক্ষোভে পড়তে হয়। আগের রাতে ভোট কেটে নেয়ার পর বিএনপির গণতান্ত্রিক দল হিসেবে কোন কর্মসূচি না দেওয়া জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এবার অন্তত পক্ষে তারা সেই অভিযোগ মোচন করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা এ প্রতিবাদ সমর্থন করি, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার দাবি রেখে। গতকাল সে হরতাল শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ায় আমরা তাদেরকে ধন্যবাদও জানাই। একই সাথে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে জনগণের ভোটাধিকার যাতে আর হরণ না হয় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি রাখি। কারণ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ মানুষের সাংবিধানিক মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। এটি ধ্বংস করা স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠারই নামান্তর। পরিশেষে নির্বাচন যেমনই হোক নির্বাচিত ঘোষিত দুই মেয়রসহ কাউন্সিলরদের আমরা অভিনন্দন জানাই। তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা নির্বাচনের সময় দেয়া ইস্তেহার বাস্তবায়ন করে তারা রাজধানীকে একটি বাসযোগ্য নগরে পরিণত করবেন।