চোখ আজ ঢাকার দুই সিটির ইভিএমের নির্বাচনে

খালিদ সাইফুল্লাহ॥ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন আজ। এ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে দেশজুড়ে। সকাল ৮ থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা এ ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকায় এবারই প্রথম ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করা হচ্ছে। এ নিয়ে ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকরা বলছেন, সিটি নির্বাচন নিয়ে অনেক আশঙ্কা, উদ্বেগ ও শঙ্কার পাশাপাশি অস্বস্তিও রয়েছে। ইভিএম নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জালিয়াতির আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবুও বিতর্কিত নির্বাচনের সংস্কৃতি থেকে দেশকে উদ্ধার করতে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট পছন্দের প্রার্থীকে দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ভোটার উপস্থিতি না হলে নির্বাচনী কর্মকর্তার ভোট দেয়ার যে ক্ষমতা আছে সেটাকে অপব্যবহার করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দুই সিটির মোট ভোটকেন্দ্র ২ হাজার ৪৬৮টি। মোট ভোটার রয়েছেন ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৭ জন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩০ লাখ ১০ হাজার ২৭৩ জন। এক হাজার ৩১৮ টি ভোটকেন্দ্রে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনে মোট ভোটার ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা এক হাজার ১৫০ টি। ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের জন্য ২৮ হাজার ৮৭৮টি ইভিএম সেট প্রস্তুত করে কেন্দ্রগুলোতে পাঠানো হয়েছে। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় থেকে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে ইভিএমসহ ভোটের সরঞ্জামাদি পাঠানো শুরু হয়। আর সেটার উদ্বোধন করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা। ভোটগ্রহণের জন্য ইভিএম, এলইডি মনিটর, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন, স্ক্যানার, বুথের জন্য ত্রিপল, তাঁবু, বোর্ডশিটসহ প্রয়োজনীয় যাবতীয় সরঞ্জাম আলাদা আলাদা গাড়িতে করে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। নির্বাচনে দুই মেয়র পদে ১৩জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। আর কাউন্সিলর পদে সংরক্ষিত আসনসহ মোট প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ৭৪৫ জন। যার মধ্যে সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৫৮৬ এবং সংরতি ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ১৫৯ জন।
এদিকে, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) মহাপরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সাইদুল ইসলাম গতকাল এক ব্রিফিংএ সাংবাদিকদের বলেছেন, অনেক সময় ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে কনফিউশন থাকে। প্রিজাইডিং অফিসার অথবা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রিজাইডিং অফিসার ভোটারের আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করার পরও ভোট দিতে পারবে না, তিনি শুধু সমস্যা চিহ্নিত করার পর ব্যালট ওপেন করে দিতে পারবেন। কারণ তার দায়িত্ব কেন্দ্রের নির্বাচন পরিচালনা করা। তবে যাদের সমস্যা তাদের জন্য বলেছি তারা ১ শতাংশ ভোটারের সহযোগিতা করার জন্য ব্যালট ওপেন করে ভোটারকে ভোটের অনুমতি দিতে পারবে।
সাইদুল ইসলাম বলেন, যদি কেউ অবৈধভাবে কারো ভোট দিতে চায় সেেেত্র আমাদের সতর্কতা থাকবে। কারণ যাদের ভোটের জন্য অফিসার ব্যালট ওপেন করে ভোটের অনুমতি দেবেন তাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট ক্যাপচার করে রাখা হবে। পরে আমরা এটা চেক করব, ভার্চুয়াল চেকিংয়ের পর মূল সার্ভারের সঙ্গে পরীা করে দেখব। কেউ অবৈধভাবে ভোট দিয়েছে প্রমাণ পেলে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হবে। বৈধ ভোটারকে ভোট প্রদানে সহযোগিতা করার জন্য কমিশন বদ্ধ পরিকর। আমরা প্রমাণ করতে চাই। আমরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সম।
ভোটার চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি চিহ্নিত করার জন্য তার এনআইডি নম্বর দিলে তাকে চিহ্নিত করতে পারব। স্মার্ট কার্ড নিয়ে আসলেও ভোটারকে শনাক্ত করতে পারব। পোলিংদের সামনে শানাক্তের প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হবে। তবে কোন ভোটারের কাছে যদি কিছুই না থাকে সে েেত্র ভোটার তালিকা দেখে নম্বর দিলে কন্ট্রোল ইউনিটে তথ্য বের হবে। এছাড়াও প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ম অনুসরণ করে ১ শতাংশ ভোটারের ব্যালট ওপেন করতে পারবেন প্রিজাইডিং অথবা সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার। এর বেশি লাগলে রিটার্নিং কর্মকর্তা দেখেবে। প্রয়োজনে এরপর ইসির মাধ্যমে সমাধান করতে পারবে।
সুজন সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সিটি নির্বাচন নিয়ে অনেক আশঙ্কা, উদ্বেগ ও শঙ্কার পাশাপাশি অস্বস্তিও রয়েছে। ইভিএম নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জালিয়াতির আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবুও বিতর্কিত নির্বাচনের সংস্কৃতি থেকে দেশকে উদ্ধার করতে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট পছন্দের প্রার্থীকে দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, ইভিএমের দুর্বলতা নিয়ে স¦য়ং আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা নিজেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, গত নির্বাচনে যে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে তাতে ত্রুটি ছিল। কিন্তু কি ত্রুটি ছিল তিনি তা বলেন নি। এমনকি এই ত্রুটি দুর করে ঢাকার দুসিটি নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে কি ব্যবস্থা নিয়েছেন তাও তিনি আমাদের জানান নি। তার উচিত ছিল এ ব্যাপারে একটা ব্যাখ্যা দেয়া। এছাড়া ইভিএম হলো ফোনের মতোই একটা যন্ত্র। এই যন্ত্রকে যেই নির্দেশ ও কমেন্ড দেব সে মোতাবেকই সে কাজ করবে। তিনি বলেন, এই ইভিএমের কমান্ডে থাকবে আমাদের নির্বাচন কমিশন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন শূণ্যের কোটায়। তা সত্বেও এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। ড. মজুমদার বলেন, আমরা দেখছি নির্বাচন কমিশন নির্বিকার ও নিস্ক্রিয় আচরণ। অনেক প্রার্থীর আচরনবিধি লঙ্ঘন নিয়ে অনেক অভিযোগ ছিল। কিন্তু ইসি দেখেছি নির্বিকার। আপনারা ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হোন। ভোট প্রদান করুন। তাহলে বিতর্কিত সংস্কৃতি কে উত্তোরণ ঘটাতে পারবো।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ফেমারর চেয়ারপারসন মুনিরা খান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা জানতে হয়। যে ভাল ব্যবস্থাপনা করতে পারবে ভোট ব্যাংকের ভোটারদের আনতে পারবে তারাই ভাল ফল পাবে। তিনি বলেন, আপাত দৃষ্টিতে আমার নির্বাচন কমিশনের একটা স্বদিচ্ছা আছে ভাল নির্বাচন করার। দেখার বিষয় হলো ইভিএম নামক মেশিনটি কি আচরণ করে। ওটা বলা মুশকিল। তিনি বলেন, আমাদের দেশে সব প্রার্থীরাই জিততে চায়। তারা যেকোনো উপায়ে হোক জয় নিতে চায়। ফলে এতে সীমা লঙ্ঘনের প্রতিযোগীতা চলে। ইসির উচিত হবে কেউ যেনো কোনো ভাবেই সীমা লঙ্ঘন করতে না পারে। সে বিষয়টি কঠোরভাবে দেখা। এবারের নির্বাচন ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এখানে ফিফটি ফিফটি অবস্থা মনে করছি। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ঢাকার দুই মেয়র প্রার্থীর মধ্যে একজন নতুন এসেছেন। ঢাকা দণি সিটি মেয়র সাঈদ খোকনকে রেখে এবার মেয়র প্রার্থী করা হয়েছে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে। পরিবর্তন এসেছে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপ বিএনপির প্রার্থীর েেত্র। মির্জা আব্বাসের জায়গায় এবার প্রার্থী করা হয়েছে তরুণ ইশরাক হোসেনকে। অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সমুন্নত রেখে উন্নয়নের অঙ্গীকার করেছেন। এই সিটি করপোরেশন আলোচিত মেয়র প্রার্থী আছেন আরেকজন, জাতীয় পার্টির সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন।

ভাগ