লোকসমাজ ডেস্ক ॥ চীন থেকে আসা দুই হাজার জনকে পরীা করে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা না গেলেও বাংলাদেশ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। নতুন ধরনের একটি করোনাভাইরাসের সংক্রমণে চীনে ইতোমধ্যে অর্ধশত মানুষ মারা গেছে। আক্রান্ত হয়েছে কয়েক হাজার। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশেরও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গাঢ় বলে ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের বেশ আসা-যাওয়া রয়েছে। বাংলাদেশে অনেক প্রকল্পে চীনা নাগরিকরা কাজ করছেন। এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে একবার ভাইরাস চলে এলে দ্রুতই তা বহু মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই জনসচেতনতা বাড়ানো তাগিদও দিচ্ছেন তারা। চীনে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর গত ২১ জানুয়ারি চীন থেকে আসা বিমানযাত্রীদের পরীার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ সরকার। রোববার পর্যন্ত ২ হাজার ১৯০ জনকে পরীা করা হলেও কারও শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
দণি এশিয়ার নেপাল ও পাকিস্তানে নতুন ধরনের এই ভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। আক্রান্ত সন্দেহে ভারতের কেরালা ও মহারাষ্ট্রে শতাধিক মানুষকে পর্যবেণে রাখা হয়েছে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, জাপান, দণি কোরিয়া, তাইওয়ান, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায়ও আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। চায়না ইস্টার্ন, চায়না সাউদার্ন, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স চীন থেকে সরাসরি ঢাকায় যাত্রী পরিবহন করে। আর ড্রাগন এয়ারলাইন্স সরাসরি যাত্রী পরিবহন করে হংকং থেকে। এই চারটি এয়ারলাইন্সের ২ হাজার ১৯০ জন যাত্রীর শারীরিক পরীা-নিরীা করা হয়েছে বলে বিমানবন্দরে কর্মরত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. শাহারিয়ার সাজ্জাদ জানান। তিনি বলেন, “তবে আমরা এখন পর্যন্ত কারও শরীরে এ রোগের কোনো লণ পাইনি।” চীন থেকে আসা বিমানযাত্রীদের বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্রিনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্যের একটি কার্ড পূরণ করতে হচ্ছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক এ এইচ এম তৌহিদ-উল-আহসান এর আগে জানিয়েছিলেন, থার্মাল স্ক্যানারে পরীায় কোনো যাত্রীর শরীরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি পাওয়া গেলে তাকে প্রথমে বিমানবন্দরের পর্যবেণ কে রাখা হবে। পরে তাকে প্রয়োজনে কুর্মিটোলা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে। ভাইরাস সংক্রমণের বিভিন্ন লণ সম্পর্কে বিমানবন্দরে ডিজিটাল ফরমেটে তথ্য দেওয়া হয়েছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফোরা
বলেছেন, চীন থেকে জ্বর না নিয়ে এলেও আসার ১৪ দিনের মধ্যে যদি কারও জ্বর আসে, তবে যেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। গত ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে করোনাভাইরাস পরিবারের নতুন এই ভাইরাসটির প্রথম দেখা মেলে। চীনা কর্মকর্তারা বলছেন, উহানের বন্যপ্রাণী ও সামুদ্রিক খাবারের বাজারে কোনো দূষিত প্রাণী থেকেই ভাইরাসটি ছড়িয়েছে।
ঝুঁকি বেশি বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশের কারণে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, “যে কোনো ভাইরাস কোথাও একবার ঢুকলে তা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে সব সময়ই একটা ঝুঁকি থাকে। “আমাদের দেশে ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ আমাদের দেশ জনবহুল। এছাড়া মানুষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে কম, রাস্তাঘাটে থুতু-কফ ফেলে।” এছাড়া ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশে বিরাজমান তাপমাত্রা-বাতাসের আর্দ্রতা উপযোগী বলেও জানান অধ্যাপক বাশার। প্রাণিবিদ্যার এই অধ্যাপক বলেন, বিভিন্ন প্রাণির মাধ্যমেও রোগটি ছড়াতে পারে।
“প্রাণীদের কোনো সীমানা নেই। এ কারণে এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে যেতে পারে। ভারত থেকে যদি সীমান্ত পেরিয়ে আসে তাহলে কেউ আটকাতে পারবে না। এখন খেজুরের রসের সময়। বাদুরের মাধ্যমে খেজুরের রসের সঙ্গে জীবাণু মিশে যেতে পারে।” মধ্যপ্রাচ্যে আতঙ্ক ছড়ানো মার্স করোনাভাইরাসের সঙ্গে চীনের নতুন করোনাভাইরাসটির মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। ২০১২ সালে প্রথম সৌদি আরবে সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর তার নাম দেওয়া হয় মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা সংেেপ মার্স। আবু ধাবি থেকে আসা এক বাংলাদেশির এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর মিলেছিল এর আগে। বিএসএমএমইউর মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, করোনাভাইরাস প্রাণীদেহ থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে। এর মধ্যে একটির নাম মার্স বা মিডল ইস্ট রেসপাইরেটরি সিনড্রোম, আরেকটা সার্স বা সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপাইরেটরি সিনড্রোম।
“মার্স হয় উট থেকে, সার্স বিড়াল-বাদুরসহ বিভিন্ন প্রাণী থেকে আসতে পারে। এসব প্রাণীর সংস্পর্শে এসে মানুষের মধ্যে রোগটি ছড়ায়। আগে মনে করা হত, শুধু অন্য প্রাণীর মাধ্যমে রোগটি হয়। পরে দেখা গেছে মানুষের মাধ্যমেও রোগটি ছড়ায়।” এই ভাইরাসের এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি বলে প্রতিরোধকেই জরুরি মনে করছেন ডা. আবদুল্লাহ। “যেহেতু রোগটি চীনে হচ্ছে, এ কারণে এখন চীনে না যাওয়াই ভালো।” জনবল বাড়ানো হয়েছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরে স্ক্যানার বসানো হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, এ কাজের জন্য জনবল বাড়ানো হয়েছে। তিনি রোববার সংসদে বলেন, “করোনাভাইরাস রোধে আমরা সি পোর্ট, ল্যান্ড পোর্ট এবং এয়ারপোর্টে স্ক্যানার বাসিয়েছি, জনবল বৃদ্ধি করেছি। যে কোনো যাত্রী এলে স্ক্যানারের মাধ্যমে তাকে আমরা শনাক্ত করতে পারব।” করোনাভাইরাস রোধে জনসচেতনতা গড়ে তুলতেও পদপে নেওয়ার কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।





