আকরামুজ্জামান ॥ এক জমিতে বছরে পাঁচটি ফসল চাষ উৎপাদনের প্রক্রিয়া চলছে যশোরে। এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন যশোর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিকরা। ২০১৬ সালে পরীামূলক চাষের পর শুরু হয়েছে মাঠ পর্যায়ে চাষ। এরই মধ্যে সুফলও পেতে শুরু করেছেন কৃষকরা। বিজ্ঞানীরা জানান, এ পদ্ধতিতে চাষ করলে কৃষক এক দিকে যেমন লাভবান হবেন তেমনি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সক্ষম হবেন। যশোর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, মাত্র এক বছর আগেও কৃষক জমিতে বছরে এক থেকে দুটি ফসল উৎপাদন হতো। বিশেষ করে আমন ও বোরো ধান উৎপাদনের পর প্রায় বছরের অর্ধেক সময় খালি পড়ে থাকতো জমি। এতে কৃষকের ইচ্ছা থাকলেও চাষে লাভের মুখ দেখতো না। তাছাড়া গতানুগতিক নিয়মে চাষ করে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম না পেয়ে চাষে প্রতিবছর লোকসান করায় চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এসব দিক বিবেচনায় এনে কীভাবে কৃষককে লাভজনক পর্যায় নিয়ে যাওয়া যায় সে বিষয়ে গবেষণা শুরু হয় আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে। বর্তমান সেখানে পাঁচটি ফসল চাষের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই জমিতে বোরো, আমন ধান আবাদের সাথে শাক-সবজি, মশুর, ভ্ট্টুাসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে পরীামূলক চাষের পর শুরু হয়েছে মাঠ পর্যায়ে চাষ। এরই মধ্যে সুফলও পেতে শুরু করেছেন কৃষকরা।
কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. কাওসার আলী জানান, দেশের ফসলি জমি হ্রাস, জমির উর্বরতা রক্ষা, কৃষককে ফসল চাষে লাভজনক করে তুলতেই এ আমাদের গবেষণা। কৃষক এখন বছরে দুই মৌসুমের ধান আবাদের পাশাপাশি শাকসবজি, রবিশস্যসহ বিভিন্ন ফস চাষ করে বছরে এখন পাঁচটি ফসল ঘরে তুলতে পারছেন। এসব শাক সবজি চাষে সম্পূর্ণ মান বজায় রাখা হচ্ছে। এর ফলে কৃষক একদিকে যেমন একই জমিতে পাঁচ ধরনের ফসল চাষ করে লাভবান হচ্ছেন, তেমনি মান সম্মত সবজি চাষ উৎপাদনে সক্ষম হচ্ছেন । তিনি বলেন, আমাদের এ প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে দেশের কৃষি অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যাবে। গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোবিন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৪.১০ শতাংশ। মোট জনশক্তির ৪১ ভাগ কৃষি কাজের সাথে জড়িত। তাই মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কৃষির উন্নয়ন ছাড়া কোন উপায় নেই। অথচ প্রতিবছর দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, চাষযোগ্য জমি ও মৃত্তিকার উর্বরতা হ্রাসের পাশাপাশি জলবায়ূর বিরূপ প্রভাবের কারণে বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার নিশ্চিতকরণের বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এসব কারণগুলো মাথায় রেখে যশোর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তারই ধারাবাহিকতায় শস্য বিন্যাসের মাধ্যমে এক জমিতে এক বছরে পাঁচ ফসল উৎপাদনের সফল গবেষণা সমাপ্ত হয়েছে। তিনি বলেন, গবেষণা কেন্দ্রের মাঠে পরিচালিত এ প্রযুক্তি দেখে কৃষক ব্যাপক আশাবাদী। আমরা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে গবেষণার এ সুফল কৃষক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে চাই। কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে কর্মরত কয়েকজন কৃষক জানান, আমরা আগে জানতাম এক জমিতে দুই থেকে তিন ফসল করা সম্ভব। বিশেষ করে ধান আবাদের পর জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হতো। এখন বিজ্ঞানীদের এ গবেষণা সফল হওয়ায় আমরা এই পদ্ধতিতে ফসল আবাদের চিন্তা করছি। জেলা সদরের চুড়ামনকাটি এলাকার সবজি চাষি রহমত আলী বলেন, গত ৬ মাস ধরে আমরা কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে এক জমিতে পাঁচ ফসলের পরীক্ষামূলক চাষ দেখে আসছি। একই জমিতে মাত্র কয়েকদিন আগে আমন ধান চাষ করা হয়েছে। এখন সেখানে, বাঁধাকপি, ভুট্টা, মশুর, ধনিয়াপাতা, মটরশুটি চাষ করা হয়েছে। আর কয়েকদিন পরে বোরো আবাদ করা হবে। তিনি বলেন, এ চাষে একদিকে ফলনও বেশি হচ্ছে, লাভও বেশি হচ্ছে। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে এ প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়লে কৃষক ব্যাপক লাভবান হবেন।




