আলোচনায় টাক মিলনের উত্থান ও ধনী বনে যাওয়ার কাহিনী

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ হত্যা ও বিস্ফোরকসহ ১০ মামলার আসামি বহুল আলোচিত যুবলীগ নেতা জাহিদ হোসেন ওরফে টাক মিলন আটক হওয়ার পর তার উত্থান, সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলা এবং কোটিপতি বনে যাওয়া নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। হিংস্র প্রকৃতির এই টাক মিলন কয়েকটি হত্যাকান্ডের মাস্টারমাইন্ড বলেও তথ্য মিলেছে। তবে শুধু তাকে নয়, তার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যদের আটকের দাবি উঠেছে।
যশোর জেলা যুবলীগের প্রচার সম্পাদক জাহিদ হোসেন ওরফে মিলনের বাড়ি পুরাতন কসবা মানিকতলায় বলা হলেও আসলে তার বাড়ি বিধুভূষণ রোডে। এলাকার রুস্তম আলীর ছেলে তিনি। নানা কারণে তার লেখাপড়া তেমন হয়নি। তবে অল্প বয়সে তিনি এলাকায় একটি ছোট দোকান বসান সংসারের হাল ধরার জন্য। কিন্তু পরে দোকান বন্ধ করে চলে যান মালয়েশিয়ায়। এরপর এক সময় তিনি সেখান থেকে দেশে ফিরে আসেন। পুরাতন কসবা ভিত্তিক আওয়ামী লীগের একটি পক্ষের সাথে চলাফেরা করতে করতে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। অত্যন্ত চতুর ও হিংস্র প্রকৃতির এই টাক মিলন এলাকায় ও রাজনীতিতে নিজের অবস্থান জানান দিতে গড়ে তোলেন সন্ত্রাসী বাহিনী। টাকা দিয়ে দলীয় বিভিন্ন মিটিংয়ে তিনি তার সহযোগীদের নিয়ে যাওয়ার কারণে বড় ভাইদের সু-দৃষ্টিতে পড়ে যান। সন্ত্রাসের আধিপত্যে খুব সহজে সে বাগিয়ে নেয় যুবলীগের প্রচার সম্পাদকের পদ। এরপর তার আর পেছনে তাকাতে হয়নি। সন্ত্রাসী বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে তিনি এলাকার বাড়ি নির্মাণে চাঁদাবাজি শুরু করেন। প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করেন নানাভাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, রাজনীতির বড় ভাইদের আশীর্বাদ থাকায় বহুল আলোচিত টাক মিলন সরকারিসহ বিভিন্ন দফতরে টেন্ডারবাজি করতে থাকেন। যে সব দফতরে উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডার আহবান করা হতো সেখানে টাক মিলনের সন্ত্রাসীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেতো। টাক মিলনের লোক এসেছে এমন কথা জানাজানি হলে সংশ্লিষ্ট দফতরে আতঙ্কের সৃষ্টি হতো। অন্যান্য ঠিকাদার তার সন্ত্রাসী বাহিনীর কারণে তাকে সমীহ করতেন। ছাত্রলীগের একজন সাবেক নেতা জানান, যশোরের সকল দফতরের টেন্ডারের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন টাক মিলন এ কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু কেউ এতোদিন তার বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। পালবাড়ির একটি সূত্র জানায়, এলাকায় ইজিবাইকের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন টাক মিলন। সেখানে ইজিবাইক চালকদের টাক মিলন সিন্ডিকেটকে দৈনিক নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিতে হয়। তার সহযোগীরা টাকা তোলার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। পর একটি সূত্র জানায়, পুরাতন কসবার বাসিন্দা জেলা যুবলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক ফিরোজ আলমকে টাক মিলন ও তার সহযোগীরা হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। গুরুতর আহত ফিরোজ আলমকে এ জন্য দীর্ঘদিন ঢাকায় চিকিৎসা নিতে হয়েছে। অনেকে বলেছেন, ফিরোজকে হত্যা প্রচেষ্টার মাধ্যমে টাক মিলন আলোচনায় আসেন। সন্ত্রাসী বাহিনীর কারণে লোকজন ভয়ে তাকে সমীহ করে চলতেন। মোটকথা পারতপক্ষে কেউ তার বিরুদ্ধাচারণ করতেন না। যারা তার বিরুদ্ধে যেতেন তাদের তিনি নানাভাবে শায়েস্তা করেছেন। ূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে ডিশ মানিক নামে এক যুবক খুন হন। এই হত্যাকান্ডের মাস্টারমাইন্ড টাক মিলন বলে প্রচার রয়েছে। কিন্তু অনেকে জানলেও কেউ এ বিষয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তার পরিকল্পনা ও উপস্থিতিতে খুন হয়েছেন তারই ক্যাডার বলে পরিচিত যুবলীগকর্মী শরিফুল ইসলাম সোহাগ। সোহাগ একপর্যায়ে মিলনের পক্ষ ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের এমপি গ্রুপে যোগ দিলে তার উপর ক্ষুব্ধ হয় সে। টাক মিলনের সন্ত্রাসী বাহিনীতে ইয়াছিন মোহাম্মদ কাজল নামে একজন পেশাদার কিলার রয়েছে। তাকে দিয়েই সোহাগকে খুন করা হয়েছে। এই কিলার কাজলকে দিয়ে টাক মিলন ডিশ মানিককেও খুন করিয়েছিলেন বলে ঘটনার পর চাউর হয়। এছাড়া ডিশ মানিক হত্যা মামলার আসামিদের মধ্যে পরে খুন হওয়া সোহাগও ছিল।
পুরাতন কসবার একটি সূত্র জানায়, যুবলীগের আলোচিত নেতা টাক মিলন টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি করলেও তার ভাগ্য বদলে যায় পালবাড়ির আলোচিত রয়েল কমিউনিটি সেন্টারের জুয়ার আসর থেকে। জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার মাধ্যমে পালবাড়ির রয়েল কমিউনিটি সেন্টারে ওয়ান টেনের নামে প্রতিরাতের জুয়ার আসর থেকে বিপুল অংকের টাকা আয় করতে থাকেন তিনি। রয়েল কমিউনিটি সেন্টারের ওই আলোচিত জুয়ার আসর নিয়ে সচেতন মহল ক্ষুব্ধ থাকলেও পুলিশ কর্মকর্তার আশীর্বাদের কারণে সেটি কয়েক বছর ধরে চলে। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা জানান, ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কাজীপাড়ায় সোহাগ খুনের পর ডিবি পুলিশ জোরালো তৎপরতা শুরু করায় ভয় পেয়ে যান টাক মিলন। এ সময় তিনি বেশিরভাগ ঘোষপাড়ায় আত্মগোপনে থাকতেন। কিন্তু ২০১৯ সালের ২৬ জানুয়ারি গভীর রাতে কাজীপাড়ায় সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদের বাড়িতে বোমা হামলার পর ফের আলোচনায় আসেন টাক মিলন। পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতার কারণে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে পালিয়ে দুবাই চলে যান। পুলিশ বহুবার তাকে আটকের চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু দুবাই পালিয়ে থাকার কারণে তাকে ধরতে পারেনি। তবে এরপর তাকে দুইবার যশোরে প্রকাশ্যে দেখা গেছে। এর একটি জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে এবং অপর উপস্থিতি ছিলো সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, যুবলীগকর্মী সোহাগ খুনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে টাক মিলনের নাম প্রকাশ পাওয়ায় তাকে আটকের গ্রিন সিগন্যাল ছিলো পুলিশের কাছে। তাছাড়া অনেকে মনে করেন, তাকে আটকের পেছনে তার রাজনৈতিক দলীয় প্রতিপক্ষ গ্র“পের একজন জনপ্রতিনিধির ভূমিকা রয়েছে।