শৈত্যপ্রবাহ ও বৃষ্টিতে বিপাকে আলুচাষি

আকরামুজ্জামান ॥ তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় এবছর যশোরে আলুর ফলনে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন চাষিরা। গত এক দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে দুই দফা শৈত্যপ্রবাহ, মধ্যরাতে অসময়ের গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি ও তীব্র ঘন কুয়াশার কারণে আলু ক্ষেতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। লোকসানের আশংকায় অনেক চাষিই এখন অপরিপক্ক আলু তুলে বাজারে নিয়ে বিক্রি করছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে যশোরের ৮ উপজেলায় প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। চাষের শুরুতে এবছর আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় আলু ক্ষেতে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। আর কয়েকদিন পরই এসব আলু কৃষক ঘরে তুলবেন। তবে ফলনের শেষ মুহূর্তে তীব্র ঘন কুয়াশা ও দুই দফা মৃদু বৃষ্টির কারণে আলু ক্ষেত লেটব্রাইট রোগে নষ্ট হতে শুরু করেছে। অধিকাংশ ক্ষেতের আলু গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে ও গোড়ায় পচন দেখা দিয়েছে। এতে কৃষক মারাত্মক ফলন বিপর্যয়ের আশংকা করছেন।
কৃষক জানান, ডিসেম্বরের শেষ সময়ে ক্ষেতে গাছের গোড়ায় যখন আলুর ফলন আসতে শুরু করে। ঠিক তখনি যশোরাঞ্চলের ওপর দিয়ে শুরু হয় মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। এসময়ে মাত্রাতিরিক্ত শীত-কুয়াশার পাশাপাশি পরপর দুই দিন রাতে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়। এর ফলে এ অঞ্চলের মাঠের পর মাঠ আলু ক্ষেতের সমস্যা দেখা দেয়। প্রতিটি ক্ষেতের আলু গাছ শুকিয়ে হলুদ বর্ণ হতে থাকে। এ অবস্থায় কৃষক কৃষি বিভাগের লোকজনদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে জমিতে ছত্রাকনাশক স্প্রে করে কিছুটা প্রতিকার পেলেও সর্বশেষ গত তিনদিন ধরে এ অঞ্চলে আবারও শৈত্যপ্রবাহ শুরু হওয়ায় আবার ক্ষতির মুখে পড়েন তারা। দ্বিতীয় দফা ঘন কুয়াশা ও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির কারণে আলু ক্ষেতে গোড়ায় পচন দেখা দিয়েছে। অনেকে ভয়ে অপরিপক্ক আলু তুলে বাজারে নিয়ে বিক্রি করছেন।
যশোর সদর উপজেলার নোঙরপুর মাঠের কয়েকজন কৃষক বলেন, তাদের ক্ষেতে লেটব্রাই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় কৃষি বিভাগের পরামর্শে জমিতে স্প্রে করা শুরু করেছেন। তারপরও কাজ হচ্ছে না।
আলু চাষি হাসমত আলী বলেন, এবছর ধার-দেনা করে দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। গাছও হয়েছে খুব ভালো। কিন্তু গত দেড় সপ্তাহে দুই দফা রিমঝিম বৃষ্টি ও চলমান ঘন কুয়াশায় ক্ষেতে রোগ দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় কৃষি বিভাগের লোকজনদের কাছে পরামর্শ চাইলে তারা আমাদেরকে ছত্রাকনাশক স্প্রে করার কথা বলছে। তিনি বলেন, আলুর পাশাপাশি টমেটো ক্ষেতেরও একই অবস্থা। অধিকাংশ টমেটো গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। একই কথা বলেন, আলু চাষি জয়নাল হোসেন। তিনি বলেন, আলু ক্ষেতে মড়ক দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গাছ শুকিয়ে যাওয়ায় আমরা আতঙ্কে আছি। এ অবস্থায় আমরা অনেকেই আলু তুলে ফেলতে বাধ্য হচ্ছি। আর ১৫ থেকে ২০ দিন পর এসব আলু তুলে বাজারে নিলে ফলন বেশি হতো। কিন্তু আলুর পচন ধরার ভয়ে আমরা আর ক্ষেতে রাখতে চাচ্ছিনা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সুশান্ত কুমার তরফদার বলেন, এ অঞ্চলে পরপর দুটি মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ ও গুঁড়ি-গুঁড়ি বৃষ্টির কারণে কৃষক আলু ক্ষেতে লেটব্রাইট রোগের শঙ্কায় আছে। আমরা ইতিমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আলু ক্ষেত সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। আজও কেশবপুরের বিভিন্ন মাঠে গিয়ে আলু ক্ষেত দেখেছি। কিছু কিছু ক্ষেতে এ ধরনের সমস্যা আছে। তবে এ পরিস্থিতিতে আমরা স্ব স্ব এলাকার কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে আলু ক্ষেতে ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দিয়েছি। তিনি বলেন, শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে বোরোর বীজতলা নিয়ে বেশি চিন্তায় ছিলাম। তবে অধিকাংশ বীজতলার ধানের চারার বয়স বেশি হওয়ায় ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটা কমে গেছে। সামনে বড় ধরনের বৈরী আবহাওয়া না হলে এবছর কৃষকের ধানের চারা নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না। এদিকে যশোর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মতিউর রহমান বিমান ঘাটির আহাওয়া অফিসের সূত্রে জানা গেছে, শনিবার যশোরে সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকলেও উত্তুরের হিমেল বাতাসের কারণে শীত অনুভূত হয়ে কনকনে ঠান্ডা। আগামী ২৪ ঘন্টা আবহাওয়া পরিস্থিতি এভাবে চলতে পারে বলে আবহাওয়া অফিস জানায়। তবে এসময়ে তীব্র ঘন কুয়াশার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভাগ