এগিয়ে যাওয়ার কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি

0

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন চলতি সরকারের প্রথম বছর পূর্ণ হলো মঙ্গলবার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সরকার গঠন করেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের এটা টানা তৃতীয় মেয়াদ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে আওয়ামী লীগ। ভোটারদের অংশগ্রহণ ও ভোটদানে নানা অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সহিংসতামুক্ত ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জোটসহ নিবন্ধিত ৩৯টি দলের অংশগ্রহণ ছিল সাম্প্রতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। সরকার গঠনের শুরুতেই ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভায় প্রবীণ-নবীনের সমন্বয়ে ৩১টি নতুন মুখ হাজির করার চমক দেখা গিয়েছিল। তবে, সরকারের প্রথম বছরটি রাজনীতি-অর্থনীতি ও সমাজ-সংস্কৃতির অঙ্গনে সাফল্য-ব্যর্থতার মিশেলে আশা-নিরাশার দোলাচলেই কেটেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ক্যাসিনো-জুয়াকাণ্ডের বিরুদ্ধে ‘শুদ্ধি অভিযান’। অভিযানে আওয়ামী লীগের কয়েকটি সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতা পদ হারান এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়। বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও আসে অনেকের বিরুদ্ধে। কিন্তু নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করা শুদ্ধি অভিযান হঠাৎই স্তিমিত হয়ে যাওয়ায় তা একইসঙ্গে হতাশাও সৃষ্টি করে। মার্চ মাসে দীর্ঘ ২৯ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু নির্বাচন প্রবলভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও ভিপিসহ কয়েকটি পদে রাজনৈতিক দলবিহীন প্রার্থীর জয়লাভের ঘটনা ছিল বড় ঘটনা। চাঁদাবাজিসহ বেশকিছু অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আরেকটি চমক দেন। কিন্তু ডাকসুসহ নানা স্থানে ভিপির ওপর সাত দফা হামলা এবং অক্টোবরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থী আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগের নেতাদের পিটিয়ে হত্যার ঘটনাসহ নানা ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো ছিল উত্তাল। এছাড়া বছরান্তে রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়েছে ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের নামের বিভ্রান্তিকর তালিকা।
রাজনৈতিক অঙ্গনের মতোই অর্থনীতিতে সাফল্য-ব্যর্থতার সালতামামিও মিশ্র। সরকারের এ মেয়াদেই ২০১৮-১৯ অর্থবছরের হিসাবে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৫১ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯০৯ ডলারে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধি আগের বছরের ৭ দশমিক ৮৬ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ১৫-তে উন্নীত হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে দণি এশিয়ার শীর্ষ অবস্থানে থেকে দ্রুত অগ্রসরমাণ অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের নাম সারা বিশ্বেই আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু দেশের রপ্তানি আয়ে কোনো প্রবৃদ্ধি নেই, আমদানিতেও একই অবস্থা। রাজস্ব আয়ে রয়েছে বড় ঘাটতি। নতুন আইন করেও ভ্যাট আদায় বাড়েনি। সরকারের ঋণের বোঝা উত্তরোত্তর বাড়ছেই। বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটেনি, কর্মসংস্থানও বাড়েনি। অন্যদিকে, খেলাপি ঋণ ও অবলোপন করা ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও বিপুল এই অনাদায়ী ঋণ আদায়ে কোনোভাবেই সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তারল্য সংকট থেকে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা আর দীর্ঘদিন ধরে পতনের ধারায় থাকা শেয়ারবাজারকে কিছুতেই টেনে তোলা যাচ্ছে না। একইসঙ্গে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিও সরকারের প্রথম বছরের আলোচিত বিষয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান এগুলেও অর্থনীতির অন্যান্য সূচকে অগ্রগতি না থাকা সতর্ক সংকেতই বটে। সরকারের প্রথম বছরে বহুল আলোচিত মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ ও দোহাজারী-কক্সবাজার পথে নতুন রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পে ভালো অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু সমাজে নিরাপত্তাহীনতা কমেনি। এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে গত বছরে ধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়ে ১ হাজার ৪১৩টিতে পৌঁছে গেছে। একই সময়ে ৩৮৮ জন মানুষ ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার’ হয়েছে। রোহিঙ্গা গণহত্যায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার মামলার শুনানি হলেও রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়া চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে জাতীয় ও আঞ্চলিক সংকটগুলো নিরসনে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি।