সুজায়েত শামীম ॥ আজ ৩০ ডিসেম্বর। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তির দিন। দিনটি বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে কেবল কলঙ্কিত নয়, জনগণের ভোটাধিকার লুণ্ঠনে অবিশ^াস্য রকমের বল প্রয়োগের এক ন্যাক্কারজনক অধ্যায়। রাষ্ট্রযন্ত্রের সব ধরণের শক্তির অপপ্রোয়গ ঘটিয়ে এবং সাধারণ ভোটারদের পাশ কাটিয়ে প্রহসনমূলক একটি নির্বাচন মঞ্চস্থ হয় এই দিন। তরুণ প্রজন্ম বিস্ময়ে দেখেছে সাউন্ড গ্রেনেডের নাটকে রাতের আঁধারে হয়ে যাওয়া এক জাতীয় নির্বাচন। শুধু সাউন্ড গ্রেনেড নয়, অসংখ্য নাটকের ওই নির্বাচনের স্মৃতিচারণ করতে দেখা যায় জাতীয় পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত।
এক কথায় বলতে গেলে সার্বভৌম রাষ্ট্রের মালিক যে জনগণ; এই পরম সত্যকে অস্বীকার করা হয়েছে। জনগণের মূল্যায়ন তো দূরের কথা, জনগণের প্রতি অবিচার ও অবমূল্যায়ন করেই পুনর্বার ক্ষমতাসীন হয় আওয়ামী লীগ, যারা এর আগেও ২০১৪ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিহীন এবং ভোটারবিহীন একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ‘ক্ষমতা’র মসনদেই থেকে যায়। নিদারুণ সেই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে ভোট না হওয়া সত্বেও নৌকা প্রতীক নিয়ে সংসদে নেতৃত্ব দেয় দলটি। এবারেও তাই! বাংলাদেশের ইতিহাসে পূর্ববর্তী সকল নির্বাচনের অনিয়ম ও ভোট কারচুপির রেকর্ড ভঙ্গ করে এক প্রকার জোরপূর্বক নতুন করে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে দলটি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসীল ঘোষণার অনেক আগে থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলেও সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ গ্রহনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ ৭ দফা দাবি আদায়ে ব্যর্থ হওয়ার পরও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই গণফোরামের নেতা ডা. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মহাজোট গঠন করে তাদের নেত্বেত্বে নির্বাচনে অংশ নেয় ১৪ দল ছাড়াও এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারা। তবে শুরু থেকেই নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হিসেবে সামনে আসে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের দিন পর্যন্ত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অনুপ¯ি’তির কথা বলে গেছে এবং বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের কোথাও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ দেখা যায়নি। বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার ও প্রার্থীদের ওপর হামলার অসংখ্য খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলেও নির্বাচন কমিশনের নিরপেতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ডিসেম্বর মাস জুড়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত নানা খবরে দেখা গেছে, সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতা কর্মীর ওপর ২,৮৯৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেসব ঘটনায় প্রাণ হারান ৯ জন। এছাড়া আহত হন দলের ১৩ হাজার নেতা-কর্মী। অন্তত ১২ জন প্রার্থীর ওপর সরাসরি হামলা হয়। যশোর সদর ৩ আসনের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের ওপর ৩ দফা হামলা চালায় সরকারি দলের গুন্ডা বাহিনী। প্রচারণা চলাকালে তার ওপর গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এমনকি ৩০ ডিসেম্বর ভোটের দিনও সরাসরি তার ওপর হামলা চালায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী নাবিল আহমেদের পোষ্য গুন্ডারা। ভাঙচুড় করা হয় প্রার্থীর গাড়ি এবং ঘটনাস্থলে একজন মিডিয়া কর্মীকে জখম করা হয়। এসব ঘটনা ছাড়াও সারা দেশে ১০ হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়, ১৭ জন প্রার্থীকে কারাগারে পাঠানো হয়, যা বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে বিরল একটি ঘটনা। নির্বাচনের দিনে সহিংসতায় সারাদেশে নিহত হন ১৮ জন।
তফসীল ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন কমিশনের আচরণ এবং সরকারের মোটিভ দেখে অনুমান করা যাচ্ছিল, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পথে যেতে রাজি নয় সরকার। কেননা বিভিন্ন সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে সরকার নিজেদের জনপ্রিয়তার বেহাল অবস্থার বাস্তবতা অনুভব করে। সাধারণ মানুষকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেয়া হলে তা আওয়ামী লীগের দু’দফা শাসন আমলের অনিয়ম, দুর্নীতি, দমন পীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের প্রতিফলন ঘটে যাওয়ার সম্ভবনা আঁচ করেই জনগণের ভোটাধিকার লুণ্ঠনের সূদুর প্রসারী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটায় ৩০ ডিসেম্বর। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি কতকগুলো বৈশিষ্ট্যর কারণে কলঙ্কিত হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত; এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জোরপূর্বক মানুষের পেশাগত নৈতিকতার জায়গাটি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের পবিত্র দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত সরকারি ও বেসরকারি নানা পেশাজীবীর মানুষকে বাধ্য করা হয়েছে অনিয়মকে সহায়তা করতে। তৎকালীন সময়ে ভোট কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের চাকরি, জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নতজানু থেকেছেন। ভোটের আগের দিন রাতেই তারা সরকারি দলের লোকজনের হাতে ব্যালেট পেপার তুলে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো প্রিসাইডিং অফিসার বা সহকারি প্রিসাইডিং অফিসার হিসাবে মনোনীত হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে টেলিফোন করে বা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরাসরি তাদের কর্মস্থলে গিয়ে আগাম খোঁজ খবর নেয় প্রশাসনের লোকজন, যা এক ধরণের মনস্তাত্তিক চাপ তৈরি করে সরকারের নির্দেশ পালনে বাধ্য করার একটি প্রক্রিয়া বলে প্রতিয়মান হয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, নির্বাচনের দায়িত্বে মনোনীত ব্যক্তিরা কে কোন দল করেন, তারও একটি গোপন তালিকা তৈরি করা হয় পুলিশের সহযোগিতায়। সে হিসাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যতটা সম্ভব তাদরে পক্ষের লোকজনদের মাঝে ভোটের দায়িত্ব বন্টন করে পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে রাখার পরিবেশ তৈরি করে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা প্রয়োজন এবারের নির্বাচনের ৭০২ কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর ভাতাসহ অন্যান্য প্রয়োজনে।
দ্বিতীয়ত; মনোনয়ন পত্রে নানা ত্রুটির কথা তুলে ধরে ভোটের আগেই অর্ধেকের বেশি আসন নিজেদের আয়ত্তে নেয়ার পরিকল্পনা যে করা হয়েছিল, তা এবারের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাতিলের রেকর্ড দেখে সহজে অনুমান করা যায়। বিষয়টি আগাম আঁচ করতে পেরে সব আসনেই বিএনপি একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়। ২৯৫টি আসনে বিএনপির পক্ষে ৬৯৬ জন মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। অপর দিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ২৬৮টি আসনে ২৮১টি মনোনয়নপত্র জমা দেয়। আওয়ামী লীগের শরিক দল জাতীয় পার্টি ২১০টি আসনে ২৩৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিলেও দলের মহাসচিবসহ কয়েকজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। কেবল এই মনোনয়ন বাতিল করা নয়, মনোনয়নপত্র জমা দানকালে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের বাধা সৃষ্টি করা এবং তা গ্রহন না করার নানা অভিযোগ ওঠে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। এমন কি আদালতের শরণাপন্ন হতে হয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের। তবে শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের রায়ে মনোনয়ন বাতিল হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ১৩ প্রার্থীর।
তৃতীয়ত; তফসীল ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই পরিকল্পিত অভিযানের মাধ্যমে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। ফলে বিএনপির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও সংগঠক শ্রেণীর কেউই নিজ নিজ বাড়িতে, এমন কি নিজের এলাকায় থাকতে পারেননি। অসংখ্য নেতাকর্মী বাধ্য হয়ে আত্মগোপনে চলে যায়, প্রচন্ড শীতের মধ্যে সারা রাত নির্জন মাঠে, ধান ক্ষেতে লুকিয়ে কিংবা বারবার স্থান পরিবর্তন করে গ্রেফতার এড়ানোর চেষ্টা চালায়। নানা প্রতিকুলতার পরও যারা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করতে শুরু করেছিলেন, তাদের কোন ভাবেই শান্তিতে থাকতে দেয়নি পুলিশ। পাশাপাশি অব্যাহত ছিল সরকারি দলের সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ তান্ডব। সবচেয়ে দুঃখজনক এবং অমানবিক দৃষ্টান্ত হলো বিএনপির সক্রিয় নেতা কর্মী ও তাদরে পরিবারকে মানসিক ভাবে দূর্বল করে দিতে তাদের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। পুরো ডিসেম্বর মাস জুড়েই সারা দেশে বিরাজ করে এমন পরিবেশ। যশোর সদর আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের প্রচারণায় অংশ নেয়া কোন কোন নেতাকর্মীর বাড়িতে নারকীয় তান্ডব চালায় প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সন্ত্রাসী বাহিনী একাধিকবার। শুধু কি তাই; প্রচারণার দিনগুলোতে এমন অসংখ্য মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যারা বিএনপির কোন নেতা বা কর্মী নন, যাদের রাজনীতির সাথে কোন সম্পর্ক নেই, যারা কেবলই নীরব সমর্থক। ধানের শীষের পক্ষে তারা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়ার অপরাধে তাদরেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে প্রতিটি এলাকার সরকারি দলের নেতাকর্মীরা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ লোকজনের তালিকা তৈরি করে পুলিশকে সরবরাহ করে এবং সেই অনুযায়ী ভোটের আগের দিন রাত পর্যন্ত গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রাখে আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনী। মূল কথা হলো যে কোন উপায়ে ভোটের আগে প্রার্থীকে নেতাশূন্য করে দেওয়ার একটি পূর্ব পরিকল্পনা প্রশাসনের সহযোগিতায় বাস্তবায়ন করে আওয়ামী লীগ।




