পাইকারি ও খুচরা বাজারে বিস্তর ফারাক বিপুল সবজি উৎপাদন করেও কাঙ্খিত দাম পায় না চাষি

আকরামুজ্জামান॥ যশোরে পাইকারি বাজারে সবজির দাম কম থাকলেও খুচরা বাজারে তা প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। চলতি মৌসুমে জেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শীতকালীন সবজি উৎপাদন হলেও চাষিরা কাঙ্খিত দাম পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। পাইকারি বাজারে মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে বলে সবজি চাষিরা জানান। অভিযোগ উঠেছে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সিংহভাগ মুনাফা লুটে নিচ্ছেন এসব পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
কৃষকরা জানান, অন্যান্য বছরে শীতকালীন সবজি আবাদের সময় ঝড়বৃষ্টিসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সবজি আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এবছর সে ধরণের পরিস্থিতি দেখা যায়নি। বলা চলে অনেকটা বিপদমুক্ত অবস্থায় কৃষক সবজির আবাদ করেছেন। ফলনও পেয়েছেন ভালো। ভরা মৌসুমে শীতকালীন সবজিতে যশোরের সাতমাইল বাজারসহ বিভিন্ন সবজির মোকাম ভরে যাচ্ছে। প্রতিদিন শ’ শ’ ট্রাক সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ের পাইকার বাজারগুলোর দাম নিয়ে শঙ্কিত চাষিরা। তারা বলছেন, পাইকার বাজারে সবজির দাম কম হলেও খুচরা বাজারে গিয়ে তা কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে চাষিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে জানান।
যশোর সদর উপজেলার শাহাবাজপুর এলাকার সবজি চাষি কোহিল হোসেন জানান, তিনি এবছর তিন বিঘা জমিতে বাধা কপি ও শীম চাষ করেছেন। এবছর আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় ফলনও হয়েছে ভালো। তবে প্রথমদিকে বাজারে সবজির দাম ভালো হলেও বর্তমানে দাম পড়ে কমে যাওয়ায় তারা কাঙ্খিত সুফল পাচ্ছেনা। ব্যবসায়ীরা পাইকার বাজার থেকে পানির দরে সবজি কিনে নিয়ে খুচরা বাজারে নিয়ে তা দ্বিগুন দামে বিক্রি করছেন।
একই এলাকার চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, এবছর চাহিদার চেয়ে কয়েক গুন বেশি সবজি চাষ করেছেন চাষিরা। তবে এতে আমাদের খুশি হওয়ার কিছু নেই। ইতিমধ্যে পাইকার ব্যবসায়ীরা সবজির দাম নিয়ে কারসাজি শুরু করেছে। তারা পরিকল্পিতভাবে বাজারে সবজির দাম কমিয়ে দিচ্ছে। সামনে বাজারে যত বেশি সবজি উঠতে থাকবে ততই পাইকারী বাজারে সবজির দাম পানির দরে নেমে যাবে বলে তিনি দাবি করেন।  কথা হয় রবিউল ইসলাম নামে আরেক সবজি চাষির সাথে। তিনি বলেন, মঙ্গলবার সাতমাইল সবজি বাজারে প্রতিমন বেগুন বিক্রি হয়েছে ৮শ টাকা মণ, পাতাকপি প্রতিপিস ৮ থেকে ১০ টাকা, ফুলকপি প্রতিপিস ১০ থেকে ১২ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, টমেটো ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। অন্য সবজির দামও কম বলে তিনি জানান। অথচ একই সবজি যশোর বড় বাজারে গিয়ে বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি। ব্যবসায়ীরা পরিবহন খরচের অজুহাতে এসব সবজির দাম কম দরে কিনে বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এদিকে  বুধবার সন্ধ্যায় যশোর শহরের বড়বাজারের সবজির দোকানে গিয়ে দেখা অধিকাংশ সবজিই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি ফুলকপি ২০ থেকে ২৫ টাকা, পাতাকপি ১৮ থেকে ২০ টাকা, বেগুন ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, পালং শাক ৩০ টাকা, লাউ ৪০ থেকে ৫০ টাকা, শিম ২৫ টাকা, টমেটো ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ এসব সবজি মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে পাইকার বাজারে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। বড়বাজারে কথা হয়, সবজি ব্যবসায়ী ও ইসমাইল হোসেনের সাথে। তাদের দাবি পাইকার বাজার থেকে সবজি কম দামে বাজারে তুললেও তা আড়ৎদাররা বাড়তি দাম দিয়ে নির্ধারণ করে দেয়। যেকারণে তাদেরকে বেশি দামে সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে বলে তিনি জানান।  তবে চাষিদের এসব অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন পাইকার ব্যবসায়ীরা। সাতমাইল বাজারের পাইকার ব্যবসায়ী মকলেছ হোসেন দাবি করেন, পাইকার বাজার থেকে সবজি কিনে খুচরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছানোর পর তাতে পরিবহণ খরচ, শ্রমিক খরচসহ আনুষাঙ্গিক আরও অনেক খরচ পড়ে যায়। এতে খুচরা বাজারে সবজির দাম বেশি হওয়ার মূল কারণ। তিনি বলেন, চাষিরা সবজির দাম নিয়ে হা-হুতাশ করলেও আমার জানা মতে অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর পাইকার পর্যায়ে সবজির দাম অনেক বেশি বিক্রি হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে যে পরিমান সবজি চাষ হয় তার অন্তত ৬০ ভাগ হয় যশোরে। এই সবজির মাত্র এক ভাগ চাহিদা রয়েছে যশোর অঞ্চলে। বাদ বাকি সবজিই পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। এজন্য যশোরে সবজি চাষ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজির চাষ হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ সূত্রে জানাগেছে।