আমনের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি

 

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এবং অনাবৃষ্টিসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ পেছনে ফেলে কৃষকরা ফসল ফলিয়েছে। দেশের সর্বত্রই এবার আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠে মাঠে সোনালী ফসল দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ধান কাটাও শুরু হয়েছে। এক তৃতীয়াংশ ধান কাটা হয়েছে। অচিরেই শেষ হবে ধান কাটা। কৃষি বিভাগ বলছে, এবার আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫২ হাজার ২২০ টন। আবাদের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, ৫৫ লাখ ৫৭ হাজার হেক্টর জমি। আবাদ হয়েছে ৫৫ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১ শতাংশ বেশি। এটি দেশের জন্য সুসংবাদ। অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তবে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, অনুকূল আবহাওয়া এবং সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রণোদনা ও সময়মতো সার সরবরাহ করায় এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। অপরদিকে কৃষকরা বলছেন, সারসহ সকল কৃষি উপকরণ এবং ডিজেলে অস্বাভাবিক মূল্য তাদের দায় দেনায় ভরে দিয়েছে।
বিশ্বে খাদ্যসঙ্কটের পূর্বাভাস আগে থেকেই দেয়া হয়েছে। দুর্ভিক্ষ হতে পারে এমন বার্তাও জাতিসংঘ থেকে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বে খাদ্যসঙ্কটকে তীব্র করে তুলছে। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে, আমাদের দেশও খাদ্য ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আগামী বছর দেশে খাদ্যসঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে বলে সকলকে সতর্ক করেছেন। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তিনি প্রতি ইঞ্চি জমি চাষের আওতায় আনার তাকিদ দিয়েছেন। কৃষিমন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে অধিদফতরকে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির এ উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং খাদ্য সঙ্কট মোকাবেলার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারবে। বিশ্বে যখন খাদ্য উৎপাদন ও বিপনন ব্যাহত হচ্ছে, তখন দেশে আমনের বাম্পার ফলন কিছুটা হলেও স্বস্তির বিষয়। তবে এই স্বস্তি কৃষক পর্যায়ে পৌঁছাতে সরকার উৎপাদন ব্যয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে ক্রয় মূল্য নির্ধারণ, ক্রয় নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকরা আমন ধান ঘরে তোলার পাশাপাশি বোরো উৎপাদনেরও কার্যক্রম শুরু করেছে। বীজতলা তৈরি ও জমি প্রস্তুত করার পাশাপাশি অর্থের সংস্থান করছে। আমনের মূল্যই তাদের প্রধান ভরসা। বলা বাহুল্য, আমাদের দেশের কৃষকের খাদ্য উৎপাদনের স্পৃহা চিরন্তন। তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে উৎপাদন করে থাকে। এক্ষেত্রে উৎপাদন উপকরণÑ বীজ, সার ও সেচের সুবিধা অবারিত থাকলে উৎপাদনের হারও বেড়ে যায়। এবারের আমনের বাম্পার ফলনের ক্ষেত্রে তা পরিলক্ষিত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ও অনাবৃষ্টির উচ্চমূল্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে অদম্য স্পৃহার কারণেই তাদের এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
আমরা মনে করি, উৎপাদিত আমন ধান সংগ্রহে সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে আমরা চাই যেন ধানের ন্যায্যমূল্য পায়। প্রায় প্রতিবছরই কৃষক উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে হতাশ ও ক্ষুদ্ধ কৃষক ফসল সড়কে ফেলে প্রতিবাদ করে। খাদ্যসঙ্কটের এই সময়ে যাতে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা না ঘটে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সতর্ক থাকতে হবে। আসন্ন বোরো মৌসুমে কৃষক যাতে সময়মতো সার, বিদ্যুৎ, সেচ সর্বোপরি নগদ আর্থিক সহায়তা পায়, এ ব্যাপারে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। এবারের আমনের বাম্পার ফলন এবং আসন্ন বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ফসলের সমন্বয়ে দেশে বড় ধরনের খাদ্য মজুদের সুযোগ যেন নষ্ট না হয়।