শৈশব কাটছে টিভি-ফোনে, স্ক্রিন আসক্তি কাটবে কীসে? 

লোকসমাজ ডেস্ক॥ “যখনই খাবার সময় হবে, বাচ্চারা সেটা খাবে টিভি দেখতে দেখতে। টিভি বন্ধ করে দিলাম তো ফোন দেখতে থাকবে। ফোনটা নিয়ে নিলাম তো আবার টিভি। ওরা ফোন বা টিভি ছাড়া থাকতেই পারছে না।”
গত জুলাই মাসে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনার প্রাথমিক প্রতিবেদন বলছে, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে নিজের ব্যবহারের জন্য মোবাইল ফোন রয়েছে ৫৫ দশমিক ৮৯ শতাংশের; যা ওই বয়সী শিশুর মোট সংখ্যার অর্ধেকের বেশি। একই বয়স শ্রেণির শিশুদের মধ্যে ৩০ দশমিক ৬৮ শতাংশ আবার ইন্টারনেটও ব্যবহার করে।
আজকের যুগে এটা খুব বেশি? যুক্তরাজ্যে সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকমের এক জরিপে বলছে, সে দেশের অধিকাংশ শিশু ১১ বছর বয়সেই নিজের স্মার্টফোন হাতে পায়। নয় বছর বয়সীদের ৪৪ শতাংশের নিজের ফোন রয়েছে, এবং ১১ বছর হতে হতে তা বেড়ে ৯১ শতাংশে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা কিছুটা কম। সেখানে নয় থেকে ১১ বছরের শিশুদের ৩৭ শতাংশের নিজের স্মার্টফোন রয়েছে।
১৯টি দেশ নিয়ে ইউরোপীয় এক গবেষণার বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, নয় থেকে ১৬ বছর বয়সী ৮০ শতাংশ শিশু স্মার্টফোন ব্যবহার করে অনলাইনে আসার জন্য; তারা বলতে গেলে প্রতিদিনই অনলাইনে থাকে।
পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তা বোঝাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইরভিনে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার সাইকোলজিকাল সায়েন্সের অধ্যাপক ক্যানডিস অডজারস বিবিসিকে বলেন,”আমরা বুড়ো হওয়ার আগেই ৯০ শতাংশ শিশুর হাতে ফোন দেখা যাবে।”
শিশুরা কোন বয়সে হাতে ডিজিটাল ডিভাইস আর কতক্ষণ স্ক্রিন টাইম পেতে পারে, তার একটি মানদ- দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
সেখানে বলা হয়েছে, এক বছরের কম বয়সী শিশুর হাতে ডিভাইস যাওয়া একদমই উচিত নয়। দুই বছর বয়সী শিশুর জন্য এক ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন টাইম নয়, এর থেকে কমানো গেলে ভালো। আর তিন থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা এক ঘণ্টার বেশি যেন ডিভাইস ব্যবহার না করে।
স্ক্রিন আসক্তি কমানো কেন জরুরি
অনেক মা-ই বলে থাকেন, খাওয়ার সময় টিভি ছেড়ে না দিলে কিংবা মোবাইল হাতে না দিলে বাচ্চা খেতে চায় না। কিডজ লিডজের পরিচালক লীনা ফেরদৌস বলছেন, টিভি ছেড়ে রেখে বাচ্চাকে খাওয়ানো একদমই ঠিক না।
“তখন হয় কি, বাচ্চা স্বাদ বোঝে না। ও চিনি খাচ্ছে না লবণ খাচ্ছে, মিষ্টির স্বাদ কেমন, মাছের স্বাদ, সবজির স্বাদ কেমন… বাচ্চা তো ওর মনোযোগ অন্যখানে দিয়ে রেখেছে।”
নিজের ডে কেয়ার পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে লিনা বলছেন, মহামারীর বছরে জন্মানো যে শিশুরা তার প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, তাদের অনেকেরই কথা বলা শিখতে দেরি হওয়ার (স্পিচ ডিলে) সমস্যা দেখা যাচ্ছে।
“যে বাচ্চারা আসছে দুই বছর বয়সের, তাদের বেশির ভাগেরই এক সমস্যা। বাচ্চা কথা বলছে না। এর কারণ হতে পারে ওই সময় বাবা-মা অনলাইনে কাজে ব্যস্ত থেকেছেন।”
স্ক্রিন টাইমের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও রয়েছে
ঢাকা শিশু হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. লুনা পারভীনও বললেন, স্ক্রিন আসক্তি থেকে শিশুর এমন সমস্যা হতে পারে। তবে দুবছর পর্যন্ত তারা সাধারণত ‘স্পিচ ডিলে’ বলেন না।
“দুই-আড়াইয়ের পরে যদি দেখি অর্থপূর্ণ শব্দ বলতে পারছে না, তাহলে স্পিচ ডিলে হিসেবে ধরি। স্ক্রিন টাইমে থাকা মানে বাচ্চা শুধু দেখছে, সে কথা বলছে না। বাচ্চাকে অবশ্যই শোনার সঙ্গে সেভাবে কথা তৈরি করে বলতে হবে। এটা টু-ওয়ে কমিউনিকেশন হবে।”
স্ক্রিন টাইমের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও রয়েছে জানিয়ে ’শিশুর যতেœ মায়ের জিজ্ঞাসা’ বইয়ের এই লেখক বলেন, “এতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। তাতে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। আর ভায়োলেন্স রয়েছে এমন কনটেন্ট দেখলে বাচ্চাদের মনের নরম-কোমল ভাবটা কমে যেতে পারে।”
“এতক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকায় ওদের চোখের উপরও প্রভাব পড়ছে। মাথাব্যথা করে ওদের। কোথাও বেড়াতে গেলে আগে বলে ‘ফোন দাও’। আমাদের সময় যেমন বাসায় মেহমান এলে আমরা সামনে যেতাম, আমি সেটা আমার বাচ্চাদের বেলাতেও চেষ্টা করি। তবু যেন আমার মনে হয় সারাক্ষণ ফোন নিয়ে থাকাতে থাকতে ওরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যায়।”
স্ক্রিন আসক্তি কখনও কখনও রোগ হিসেবেও গণ্য হতে পারে বলে জানালেন ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনষ্টিটিউট ও হাসপাতালের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার।
রোগ ও রোগীর বিশ্লেষণে ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকাল ম্যানুয়াল অফ মেন্টাল ডিসঅর্ডারস বা ডিএসএম প্রতিবেদনটি যুক্তরাষ্ট্রের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এর পঞ্চম সংস্করণ বা ডিএসএম-ফাইভ এ বছর মার্চে প্রকাশ করেছে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন। এবার মানসিক রোগ হিসেবে সেখানে ‘ইন্টারনেট গেইমিং ডিসঅর্ডার’ যোগ করা হয়েছে।
বিদেশি গবেষণা কী বলছে?
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজের এক্সপেরিমেন্টাল সাইকোলজিস্ট অ্যামি অরবেন ও তার সহকর্মীরা গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেন, সোশাল মিডিয়ার ব্যবহারে জীবনের পরবর্তী ধাপে হতাশা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিতে।
এই গবেষক দলটি ১০ থেকে ২১ বছর বয়সী ১৭ হাজার শিশু-কিশোরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। তাদের ভাষ্য, ১১ থেকে ১৩ বছরের মেয়ে ও ১৪ থেকে ১৫ বছরের ছেলেদের বেলায় যত বেশি সোশাল মিডিয়ায় সময় কাটানো বেড়েছে, পরের বছর খানেকের মধ্যে তাদের মধ্যে হতাশা দেখা গেছে।
এর বিপরীত দিকটিও সত্য হতে দেখা গেছে এ গবেষণায়। অর্থ্যাৎ ওই একই বয়সীরা সোশাল মিডিয়াতে কম সময় দেওয়ার ফলে জীবন নিয়ে তাদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের মাত্রা বেশি ছিল।
অরবেন বলেন, “বিকশিত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়টা এই টিন বয়স। এই বয়সে সবকিছুকে সূক্ষ্মভাবে দেখার আগ্রহ জাগে। মানুষ এসময় তাকে দেখে কী ভাবছে তা জানতে ইচ্ছে হয়। আর সোশাল মিডিয়া যেভাবে সাজানো হয়, অর্থ্যাৎ এখানে যেভাবে যোগাযোগ, প্রতিক্রিয়া দেখানো আর বাটনে ক্লিক করতে হয়, তা অনেক সময়ই মানসিক চাপ ফেলতে পারে।”
‘ভালো কিছুও’ হতে পারে
সন্তানদের স্ক্রিন অভ্যস্ততা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও দুই সন্তানের মা নুসরাত আহমেদ মনে করেন, ভালো কিছুও শেখা সম্ভব।
“আমার বড় মেয়ে আগে থেকেই আঁকতে পারত। প্যানডেমিকের সময় ও ইন্টারনেট থেকে দেখে অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি এঁকেছে। এমনকি আমি বলা বা শেখানোর আগেই আরও অনেক কিছু আমার মেয়ে ফোনে ইন্টারনেট থেকেই শিখে গেছে। ইউটিউব থেকে শিখেছে।”
বিবিসি লিখেছে, বিশেষ করে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের বেলায় ফোন সাথে থাকা যেন প্রাণ ফিরে পাওয়ার মত। ফোন ও অনলাইন থেকে বিশেষ সুবিধা, নেটওয়ার্কিং ও স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্য জানতে পারে তারা।
১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের ওপর জরিপ চালিয়ে ডেনমার্কের গবেষকরা বলেছেন, সঙ্গে স্মার্টফোন থাকার কারণে তারা বরং স্বাধীনভাবে বাইরে সময় কাটাতে পারে। বাবা-মাও সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে অনেকখানি নিশ্চিত বোধ করেন।
কেন এই আসক্তি?
এক ইউরোপীয় জরিপ বলছে, নবজাতক থেকে আট বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারে আসক্তি তৈরি হয় বাড়িতে বাবা-মাকে দেখে।
বাংলাদেশেও অভিভাবকদের এই ’ভুল’ থেকে শিশুদের স্ক্রিন আসক্তি দেখা দিচ্ছে বলে মনে করছেন প্রবাসে থাকা আট বছরের সন্তানের মা মাবরুকা তোয়াহা।
তবে পল্লবীর বাসিন্দা নুসরাত আহমেদ বলছেন, মহামারীর ঘরবন্দি দিনেই তার দুই সন্তানের টিভি দেখা ও ফোন চালানোর ঝোঁক বেড়ে গেছে।
“তখন সারা দিনরাত ওরা বাইরে যেতে পারত না, খেলতে যেতে পারত না, কারো সাথে মিশতে পারত না। অ্যাপ, গ্যাজেট, মোবাইল বা টিভি নিয়েই থাকত।”
করণীয় কী?
বিবিসি লিখেছে, শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ে এই উদ্বেগ সারা বিশ্বেই বাড়ছে। তবে সন্তানকে কোনো শর্ত দেওয়ার আগে অভিভাবদের বরং নিজের ফোন চালানোর অভ্যাসের দিকে ভালো করে তাকানো দরকার।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে প্যারেন্টিং ফর এ ডিজিটাল ফিউচার বইয়ের লেখক যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অফ ইকনোমিকসের সোশাল সাইকোলজির অধ্যাপক সোনিয়া লিভিংস্টোন বলেন, “তাদেরকে ফোন ধরতে মানা করা হবে, কিন্তু বাবা-মা নিজেই খাওয়া-ঘুমের সময় তা করে যাবে, এমন দুমুখো আচরণ শিশুরা অপছন্দই করে।”