দাম বাড়ার ঘোষণা শুনেই শ শ ফিলিং স্টেশন বন্ধ দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি ব্যবসায়ীরা মুহূর্তেই লুটে নিল কয়েক শ কোটি টাকা

 

আকরামুজ্জামান ॥ দাম বাড়ার ঘোষণা শুনেই যশোরসহ দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনগুলো বন্ধ করে দেয় মালিকরা। নামমাত্র কয়েকটি পাম্প ক্রেতাদের চাপে শুক্রবার রাত ১২টা পর্যন্ত পূর্ব নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি করলেও অধিকাংশ তেল পাম্প কোনো ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ রেখে কম দামে কেনা জ্বালানি তেল পরদিন বিক্রি করে সরকার নির্ধারিত বাড়তি দামে। এ অসাধু প্রক্রিয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি ব্যবসায়ীরা কয়েক শ কোটি টাকা মুনাফা লুটে নেয় বলে ভোক্তাদের অভিযোগ।
শুক্রবার রাত ১০টায় সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে হঠাৎ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ে লিটারপ্রতি ডিজেল ১১৪ টাকা, কেরোসিন ১১৪ টাকা, অকটেন ১৩৫ টাকা ও পেট্রোল ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এটি ওইদিন রাত ১২টা থেকে কার্যকর করার নির্দেশনা দেয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের পরই মিডিয়ার কল্যাণে দেশবাসী জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির খবর জেনে যায়। খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সকল ফিলিং স্টেশন একযোগে বন্ধ করে দেয়া হয়। হাজার হাজার ক্রেতা লাইন দেয় ফিলিং স্টেশনগুলোতে। বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন থেকে জানিয়ে দেয়া হয় তেল বিক্রি করা সম্ভব নয়। আবার কোনো কোনো ফিলিং স্টেশন থেকে বলা হয়, তেল নেই। আগামীকাল তেল পাওয়া যাবে। হঠাৎ করে শ শ ফিলিং স্টেশন তেলশূন্য হয়ে যাওয়ার কোনো সঙ্গত কারণ না থাকায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ক্রেতারা। আগের দামে কেনা তেল বাড়তি দামে বিক্রি করতেই যে ব্যবসায়ীরা এ অসাধু পথ বেছে নিয়েছে তা কারো বুঝতে অসুবিধা হয়নি। এজন্য তারা তেল পাম্পের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন আগের দামে তেল কেনার জন্য। এ পরিস্থিতিতে কয়েকটি পাম্প থেকে ক্রেতারা আগের দামে তেল পেলেও অন্য তেল পাম্প থেকে শুন্য হাতে ফিরে যেতে হয় তাদের।
জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীদের হিসেব অনুযায়ী, পদ্মার দক্ষিণে ২১ জেলায় প্রায় ১১ শ ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এরমধ্যে যশোর জেলায় পাম্পের সংখ্যা ৭৩টি। প্রতিটি ফিলিং স্টেশন দিনে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার লিটার ডিজেল, দেড় থেকে দুই হাজার লিটার পেট্রোল, এক থেকে দেড় হাজার লিটার অকটেন এবং আট শ থেকে এক হাজার লিটার কেরোসিন বিক্রি করে। সন্ধ্যারাত নাগাদ প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে যদি সর্বনিম্ন এক হাজার লিটার ডিজেল, পাঁচ শ লিটার পেট্রোল, তিন শ লিটার অকটেন এবং দুই শ লিটার কেরোসিনও মজুত থাকে, তো এই তেল বাড়তি দামে বিক্রি করলে মুনাফা দাঁড়ায় কয়েক কোটি টাকা। এই হিসেবে দক্ষিণাঞ্চলের ফিলিং স্টেশনগুলো সরকারের জ্বালানি তেল বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে কয়েক শ কোটি টাকা মুনাফা লুফে নিয়েছে।
শনিবার সকালে যশোর মনির উদ্দীন পাম্পের একজন বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, আমরা সরকারি সিদ্ধান্তের পর রাত ১২টা পর্যন্ত পূর্ব নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি করেছি। তবে ক্রেতাদের চাপের কারণে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। তাদের আচরণ দেখে রীতিমত আমরা ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ একটি পাম্পে তেল, নগদ টাকাসহ অনেক সম্পদ থাকে।
তবে শহরের গাড়ীখানা রোডস্থ তোফাজ্জেল হোসেন পাম্পসহ অধিকাংশ পাম্পই ১০টার পরপরই বন্ধ করে দেয়া হয়। পাম্পগুলোতে ক্রেতারা গিয়ে কর্তৃপক্ষকে না পেয়ে ফিরে যায়। এরমধ্যে শহরতলীর কেসমত নওয়াপাড়ার রজণীগন্ধা তেল পাম্পে তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা ভাঙচুর চালায়।
পাম্প মালিকরা বলেন, ফিলিং স্টেশনগুলোতে খুব বেশি তেল মজুতের সুযোগ নেই। কারণ স্থানীয় জেলা প্রশাসনকে প্রতিদিনের স্টক জানাতে হয়। খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিপুল পরিমাণ তেল মজুত থাকে। তারাই এ পরিস্থিতিতে মুনাফা করেছে বেশি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাজ্জাদুল করীম কাবুল বলেন, সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর পাম্প মালিকরা যে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লুফে নিয়েছেন এমন অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা এমন সময় দেয়া হয়েছে যা আমাদের মারাত্মক খারাপ পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে। প্রতিটি পাম্পই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় অধিকাংশ পাম্পের কর্মচারীরা হুমকির মুখে পড়ে। তার নিজস্ব একটি পাম্পে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, দাম বাড়লেও আমাদের তেমন লাভ হবে না। সরকার দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেলের ট্রানজিট লস পুন:নির্ধারণ করেনি। ২০৮০ সালে লিটার প্রতি ৪ পয়সা নির্ধারণ করলেও তা এখনও বিদ্যমান আছে। ডিজেলের কমিশনে ২ টাকা ৭ পয়সার স্থলে বর্তমান ২ টাকা ৭৮ পয়সা, পেট্রোলের ৩ টাকা ৯৫ পয়সার স্থলে বর্তমান ৪ টাকা ২৫ পয়সা ও অকটেনে ৪ টাকার স্থলে বর্তমান ৪ টাকা ৩০ পয়সা কমিশন বাড়ানো হয়েছে। যা আহামরি কিছু না। অথচ বাড়তি জ্বালানি খরচ দিয়ে এসব তেল আনা-নেওয়ায় এখন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, পেট্্েরাল পাম্পে তেল মজুত করে রাখার কোনো সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ীই তেল সংগ্রহ ও মজুত করা হয়।

 

 

Lab Scan
ভাগ