কলারোয়ায় শিক্ষার নামে চলছে অর্থ লোপাট

 

কে এম আনিছুর রহমান,কলারোয়া (সাতক্ষীরা) ॥ সাতক্ষীরার কলারোয়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী নিয়ে উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষার নামে নীরবে সরকারি অর্থ লোপাট করার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়নাধীন ‘চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’ (পিইডিপি-৪) এর সাব-কম্পোনেন্ট ২.৫ ‘আউট-অব-স্কুল চিলড্রেন কর্মসূচি’ উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে সারাদেশে ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সাতক্ষীরা জেলার ৬টি উপজেলায় ঝরে পড়া শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪২০টি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আর এ শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য লিড এনজিও হিসেবে নির্বাচিত হয় “সাতক্ষীরা উন্নয়ন সংস্থা সার্স” নামক একটি বেসরকারি সংস্থা।
তবে ৬টি উপজেলার মধ্যে কলারোয়া উপজেলায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সাতক্ষীরা উন্নয়ন সংস্থা সার্স লিড এনজিওর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে আরেক বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন পরিষদ (উপ) অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে ঝরে পড়া শিশু শিক্ষার্থী দেখিয়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ৭০টি উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রে এ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিটি স্কুলে ২৫-৩০ জন শিক্ষার্থী থাকবে। অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী এখানে ভর্তি করা যাবে না। ছাত্র-ছাত্রীর বয়স হবে ৮ থেকে ১৪ বছর। স্কুলগুলো দেখাশুনা করার জন্য মাসিক হারে ১৫ হাজার টাকা বেতনে ১ জন উপজেলা কর্মকর্তা, ১৫ হাজার টাকা বেতনে ৫ জন সুপারভাইজার, ৫ হাজার টাকা বেতনে শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীদের সুন্দর ও পরিষ্কার পরিবেশে পাঠদানের জন্য প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের জন্য ১৫০০ টাকা ভাড়া, শিক্ষা কেন্দ্র ডেকোরেশন খরচ ৫ হাজার টাকা, ছাত্র-ছাত্রীদের মাসিক ভাতা জনপ্রতি ১২০ টাকা করে ৩৬ মাস, ফ্লোর/ কার্পেট খরচ ৫ হাজার, ৩ হাজার টাকা বাজেটের ফ্যান কেনার জন্য বরাদ্দ আছে। এছাড়া স্কুলে লিউবলাইন, পানির জার ,স্টিলের ট্রাঙ্ক ,জাতীয় পতাকা ,সাইনবোর্ড ,হাতল অ’লা চেয়ার ,টুল ,স্কুলব্যাগ, স্কুলড্রেস ,শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড ,টিচিং এইড এবং গেমস উপকরণ দেয়ার কথা।
কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একবারেই ভিন্ন চিত্র। আজ পর্যন্ত ফ্যান থেকে শুরু করে তাদেরকে কিছুই দেয়া হয়নি। শিক্ষাথীদের জন্য অধিকাংশ স্কুল করা হয়েছে বিভিন্ন মানুষের বারান্দা, গোয়ালঘর, রান্নাঘর, দোকানঘরে। তবে ওইসব জায়গায় হচ্ছে না ক্লাস। কেবলমাত্র সাইনবোর্ড সীমাবদ্ধ। এখনো পর্যন্ত কোন ছাত্র-ছাত্রীকে ভাতার টাকা, স্কুলব্যাগ, স্কুলড্রেস, শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ডও দেয়া হয়নি। তাছাড়া বেশির ভাগ স্কুল বন্ধ থাকে। প্রত্যেক স্কুলে ৩০ জন করে ঝরে পড়া শিশু শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার কথা। কিন্তু কোন স্কুলে ৩০ জন শিক্ষার্থী নেই। বর্তমানে কয়েকটি স্কুল চলছে। তবে সেসব স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭-৮ জন। তারা আবার বিভিন্ন মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী।
সরেজমিনে গিয়ে আরো দেখা যায়, কেঁড়াগাছি ইউনিয়নের কাকডাঙ্গা শিক্ষা কেন্দ্রে সাইনবোর্ড ভেতরে, একটি রান্না ঘরে ক্লাস হচ্ছে ৭ জন শিশু নিয়ে। তাদের মধ্যে একজনও ঝড়ে পড়া শিশু শিক্ষার্থী না। তারা প্রত্যেকেই কোন না কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।
পূর্ব কয়লা উপআনুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ওই স্কুলের শিক্ষিকা নাসরিন সুলতানা বলেন, গৃহ না থাকায় তিনি বুইতা গ্রামে স্কুল পরিচালনা করছেন।
উত্তর বাটরা উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ পেয়ে শিক্ষিকা মমতাজের বাড়িতে গেলে তার স্বামী বলেন, মমতাজ স্কুলে। ফের স্কুলে গিয়ে ৫ বছরের একটা শিশুকে পাওয়া যায়। আর ওই বাচ্চা পায়খানা করার কারণে ১০ মিনিট আগে ছুটি দেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
এদিকে কয়লা কওমী মাদ্রাসার পাশে উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রের সাইনবোর্ড ঝুলানো স্বল্প পরিসরের জানালাবিহীন একটি তালাবদ্ধ দোকানে। ওই দোকানে ৩০ শিক্ষার্থীর বসার জায়গা নেই বলে মনে হয়েছে।

শ্রীপতিপুর ঋষিপাড়া শিক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর স্থলে ৫ থেকে ৬ বছর বয়স্ক প্রায় ২০ শিশুকে দেখা যায়।
এদিকে ২ দিন গিয়ে কেএল হাইস্কুলের বাউ-ারিওয়াল সংলগ্ন খাসপুর ঋষিপাড়া উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ পাওয়া যায়।
কেএল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নূরুল ইসলামসহ স্থানীয়রা জানান, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থী ও কিছু শিশু নিয়ে মাঝে মাঝে স্কুল চলে। লাঙ্গলঝাড়া বাজার শিক্ষাকেন্দ্রের সাইনবোর্ড ঝুলানো রয়েছে রান্নার কাঠ রাখা ঘরে। শিক্ষিকা আত্মীয় বাড়ি বলে প্রতিবেশীরা জানায়।
লাঙ্গলঝাড়া পশ্চিমপাড়া কেন্দ্রের সাইনবোর্ড এলাই নামক ব্যক্তির বাসভবনে ঝুলানো থাকলেও শিক্ষিকা বা শিক্ষার্থীর কোন হদিস পাওয়া যায়নি।
আলাইপুর কেন্দ্রের হদিস না পেয়ে শিক্ষিকা খাদিজা সুলতানার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ১২ কিমি দূরে দেয়াড়া গ্রামে আত্মীয় বাড়ি আছেন বলে জানান। তবে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি অসংলগ্ন কথাবার্তা শুরু করেন।
এদিকে দেয়াড়া ইউনিয়নের কয়েকটি কেন্দ্রসহ অধিকাংশ ইউনিয়নের অধিকাংশ শিক্ষাকেন্দ্রের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এভাবে সাইনবোর্ড সর্বস্ব দুই একটি শিক্ষাকেন্দ্রে শিশু ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উপবৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থী নিয়ে নামকাওয়াস্তে উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা সচল দেখানো হচ্ছে বলে দেখা যায়। আর এরকম চিত্র সারা উপজেলাতে।
স্থানীয় লোকজন জানায়, মাঝে মাঝে কিছু লোকজন ও শিশু দেখা যায়।
লাঙ্গলঝাড়া ইউনিয়নের তৈলকূপি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাছিমা খাতুন, কলারোয়া পৌর সদরের তুলশিডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রেহানা খাতুন ও কেঁড়াগাছি ইউনিয়নের পাঁচপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খোরশেদ আলম বলেন, আমাদের স্কুল এলাকায় তেমন কোন ঝরে পড়া শিক্ষার্থী নেই। বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থী ,মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, এছাড়া বেনামি ভুয়া শিক্ষার্থী দেখিয়ে উপানুষ্ঠানিক স্কুল চালাচ্ছে তারা। এমনকি আমাদের স্কুলের কিছু ছেলে মেয়েকে নিয়ে তারা স্কুল চালাচ্ছে জানতে পেরে আমরা এনজিও কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেছি। তারা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।
কলারোয়া উপজেলার অন্য প্রতিষ্ঠানের একাধিক ছাত্রের অভিভাবক তানিয়া খাতুন,তরিকুল ইসলাম, আমির আলীসহ একাধিক অভিভাবক জানান, আমাদের সন্তানদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনার কথা জানালেও তারা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার কথা বলে ছেলে মেয়ের তালিকা নিয়ে গেছে। আমরা বিভিন্নভাবে খোঁজ খবর নিয়ে দেখি তারা আমাদের ছেলে মেয়েদের কোন সুযোগ সুবিধা দেয় না। আমরা আর আমাদের সন্তানদেরকে তাদের প্রতিষ্ঠানে পড়াতে আগ্রহী নই।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী শেখ সাদি, রফিকুল ইসলাম, আয়েশা খাতুন, সাদিয়া সুলতানাসহ অনেকে জানায়, তারা অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তাদেরকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাদের স্কুলে ভর্তি করা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদেরকে কোন টাকা, স্কুল ব্যাগসহ কোন কিছু দেয়া হয়নি। তাই তারা আর ওই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে যায় না। পূর্বের প্রতিষ্ঠানে যায়।
বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন পরিষদ ( উপ) এনজিও’র নিয়োগপ্রাপ্ত শাহানারা খাতুন, আফরোজা খাতুন, সাবিনা,ইতি, পারুল,মুর্শিতা, আফিয়া,জেসমিন আরাসহ একাধিক শিক্ষিকা জানান, ঝরে পড়া শিক্ষার্থী ২/৪ জন পাওয়া যায় ।এখন এসব এলাকায় ঝরে পড়া শিশু পাওয়া যায় না। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি ওইসব শিশুকে শিক্ষাকেন্দ্রে আনার। তারা জানান, খাতা কলমে ২৭ থেকে ৩০ জনের নাম থাকলেও প্রতিদিন হাজির হয় ৭/৮ জন। তাদের মধ্যে ১/২ জন ঝড়ে পড়া শিশু রয়েছে। আমরা আজ পর্যন্ত ১ মাসের বেতন পেয়েছি। আর পায়নি।

এনজিও উন্নয়ন পরিষদের উপজেলা ম্যানেজার রবিউল ইসলাম বলেন, আমরা এখনও কোনো টাকা পাইনি। তাই স্কুলের ফ্যান দেয়া হয়নি।
উন্নয়ন পরিষদের (উপ) নির্বাহী পরিচালক আব্দুস সালাম বলেন, প্রত্যেক স্কুলের কমবেশি সমস্যা আছে। তবে এ মাসের মধ্যেই আমরা সকল সমস্যা সমাধান করবো। প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের জরিপ অনুযায়ী ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪.৫৫% অর্থাৎ ১২৮৭ জন, কিন্তু ৭০ কেন্দ্রে ২১০০ শিক্ষার্থী কোথা থেকে এসেছে এমন প্রশ্নের কোন জবাব তিনি দিতে পারেন নি।
উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর সাতক্ষীরার সহকারী পরিচালক হীরামন কুমার সরকার বলেন, কলারোয়ার অভিযোগ শুনতে শুনতে আমরা অতিষ্ঠ। তবে কোন অনিয়ম হলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

Lab Scan
ভাগ