গরিব মানুষের ঈদ

সৈয়দ আবদাল আহমদ
মাহে রমজান শেষ হতে চলেছে। রমজানের শেষ দশকের আর কয়েকটি দিন বাকি। বরকতময় এ মাসের ফজিলত লাভের জন্য আমরা কে কেমন ইবাদত-বন্দেগি করেছি এবং তা কতটুকু মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল হয়েছে, তা একমাত্র তিনিই জানেন। তবে যারা নেককার বান্দা তাদের অন্তরগুলো মাহে রমজানের ফজিলত লাভের আশায় ব্যাকুল হয়ে আছে। মসজিদে নববীর খতিব ড. জুবাইতীর জুমার খুতবার বাংলা তরজমা পড়ছিলাম। তিনি বলেন, ‘এ সময়ে রবের সান্নিধ্য অর্জনে যে কদমগুলো অগ্রসর হয় এবং যেসব হাত বিনয়ের সাথে দোয়ায় নিমগ্ন থাকে, তা মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে পেশ করা হয়।’ মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিন, এ প্রত্যাশাই করছি।
সমাগত ঈদুল ফিতর। কিন্তু মানুষের মনে আনন্দ নেই। এই ঈদ যেন নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর জন্যই আসছে। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও গরিব জনগোষ্ঠীর মধ্যে একধরনের হাহাকার চলছে। অর্থনৈতিক সঙ্কট এত ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যে, গরিব মানুষের জন্য সাধারণ জীবন ধারণ করাই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে একের পর এক দুর্যোগ তাদের মনোবল আরো ভেঙে দিচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির দুর্যোগ, শিলাবৃষ্টি ও অকাল বন্যায় ফসলহানির দুর্যোগ এবং সরকারের করা কালো আইনে নির্যাতনের দুর্যোগে মানুষ একপ্রকার দিশেহারা।
অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। টিসিবির ট্রাকগুলোর দিকে তাকালে যে কারোরই চোখে পড়বে অসহায় মানুষের দীর্ঘ সারি। এই যে মানুষ দ্রব্যমূল্যের চাপে যন্ত্রণা ভোগ করছে, তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো আন্দোলনও চোখে পড়ছে না। দেশে অনেক রাজনৈতিক দল থাকলেও ছোটখাটো আলোচনা সভায় দ্রব্যমূল্যে বাড়ার বিরুদ্ধে দু-একটি কথা বলা ছাড়া তাদের আর কোনো ভূমিকা রাখতে দেখা যাচ্ছে না। মুনাফালোভীরা মুনাফা করেই যাচ্ছে। আর তাদের গডফাদাররা আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে।
করোনা মহামারী এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। এটি ইতিবাচক দিক। তবে করোনা মহামারী অর্থনৈতিক সঙ্কটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে গেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), পিপিআরসি ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) গবেষণা ও জরিপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার করোনাপূর্ব ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যদিও সরকার বলে যাচ্ছে এই হার অনেক কম। এক দিকে আয় কমেছে ২০ শতাংশ, অন্য দিকে ব্যয় বেড়েছে ৩৬ শতাংশ; অর্থাৎ ১০০ টাকার আয় কমে ৮০ টাকা হয়েছে এবং ১০০ টাকার ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১৩৬ টাকা। আয়-ব্যয়ের ব্যবধান হলো ৫৬ শতাংশ। এ বিশাল ঘাটতি মেটানোর কোনো উপায় সাধারণ মানুষের জানা নেই। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের কাছে বাজার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার তিনটি। পণ্যের ওপর শুল্ক কর কমানো, খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি বাড়ানো এবং বাজার তদারকি জোরদার করা। সরকার খোলাবাজারে টিসিবির পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করলেও তা প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রতুল। বাজার তদারকির কাজটি মোটেই কার্যকর নয়। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। গরিব মানুষের আহাজারিতে তাই ঈদের আনন্দ মিলিয়ে যাচ্ছে। ঈদ যেন আসছে একটি শ্রেণীর আনন্দ-ফুর্তির জন্যই।
কৃষকের কান্না
প্রকৃতিতে এখন চলছে কালবৈশাখী মৌসুম। এপ্রিল-মে দুই মাস পুরোদমেই চলে কালবৈশাখী। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কালবৈশাখী আঘাত না হানলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। গত শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন জায়গাতেও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। পত্রিকায় বিভিন্ন জেলায় প্রচ- শিলাবৃষ্টি হওয়ার খবর প্রায় প্রতিদিনই ছাপা হচ্ছে। বোরো ধান এখন কাটার সময়। কিন্তু দেখা গেছে, শিলাবৃষ্টিতে কৃষকের পাকা ধান একেবারে মাটির সাথে মিশে গেছে। অনেক কৃষকই ক্ষেতের পাশে বসে মাথায় হাত রেখে হাউমাউ করে কাঁদছে। শিলাবৃষ্টির কয়েক দিন আগে হাওরে অকাল বন্যায় যা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্টি হয়েছে; কৃষকের ফসল ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। হাওরের বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ কেটে দেয়ায় এ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতি বছরই বাংলাদেশে ঘটে। কিন্তু এর প্রতিকারের জন্য কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সে ধরনের কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। ফসল হারিয়ে কৃষকের কান্নাই এখন সার। এবারের ঈদে তাই গ্রামের কৃষকের মুখেও হাসি দেখা যাচ্ছে না। তাদের ঘরেও ঈদ নেই।
নির্যাতনের হাতিয়ার
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সমাজসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘ দিন ধরেই সোচ্চার। এ আইনটি ব্যবহার করে নির্যাতনের অভিযোগ বহুদিনের। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেনও স্বীকার করেছেন যে, এ আইনটির অপপ্রয়োগ হয়েছে। কিন্তু আইনটি বহাল তবিয়তেই আছে এবং এর অপপ্রয়োগ ঘটেই চলেছে।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শুধু মতপ্রকাশের কারণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে প্রায় ৪০০ মামলা হয়েছে গত দুই বছরে। দেখা গেছে, ২৬ মাসে ফেসবুককেন্দ্রিক মামলা হয়েছে ৫৫৬টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে এক হাজার ১৭৫ জনকে। এসব মামলার মধ্যে ৩৯৯টি হয়েছে মতপ্রকাশের জন্য। এ ছাড়া হয়রানির অভিযোগে ৫১টি, আর্থিক জালিয়াতির ২৯টি এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে ৮৫টি মামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্ট্রিংগুইশড প্রফেসর ডক্টর আলী রিয়াজের নেতৃত্বে একটি দল এ গবেষণাটি সম্পন্ন করে। অধ্যাপক আলী রিয়াজ এ প্রসঙ্গে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়েরের হার ক্রমেই বাড়ছে। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রথম ১৩ মাসে ৪২৬ মামলায় ৯১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং ২৭৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী ৯ মাসে ৪৬৪টি মামলায় এক হাজার ৩৩১ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব মামলায় ৬০৯ জন আটক হয়েছেন।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে নিবন্ধ লেখার সময় তাকে বহু চিন্তা করতে হয়। তিনি বলেন, ‘আমি ফেসবুক ব্যবহার করি না, বেশির ভাগ ই-মেইলের জবাব দেই না। বই লিখতে গেলেও নানা দিক চিন্তা করতে হয়। তাই ভ্রমণকাহিনী লিখি।’ সুজনের ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় সরকার আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করে অধিকার হরণ করে। ২০১৮ সালের কাছাকাছি সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও নিরাপদ সড়ক আইন হয়।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি বাতিলের জন্য সর্বমহল থেকে দাবি তোলা হলেও সরকার এ নিয়ে ভ্রƒক্ষেপ করছে না। বরং নতুন আরো কালো আইন করতেই ব্যস্ত। সম্প্রতি গণমাধ্যম কর্মী আইন নামে একটি আইন করার জন্য এর খসড়া সংসদে পেশ করা হয়েছে। সাংবাদিকরা ইতোমধ্যে এর প্রতিবাদ করে বলেছেন, ওই আইনটির দ্বারা সাংবাদিকদের ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ই তুলে দেয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা নিয়ে হইচই হচ্ছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ার, গুম, বিচারহীনতা, মামলা-হামলা ইত্যাদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের খারাপ পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে মার্কিন রিপোর্টে। বিশ্বের প্রায় ১৯০টি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির যে পর্যালোচনা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে খারাপ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এর আগে বাংলাদেশের একটি আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সংস্থাসহ কয়েক ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এমন পরিস্থিতিতে যখন সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করা দরকার, সেখানে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটানো হচ্ছে।
মেগা প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ
কুয়ালালামপুরের মালায়া ও মোনাশ মালয়েশিয়া ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ও গ্লোবাল লেবার অর্গানাইজেশনের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহ বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোর বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন, বাংলাদেশের সামনেও অর্থনৈতিক ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে।
সহযোগী দৈনিকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে মেগা প্রকল্পগুলো রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এই ক্রমবর্ধমান আর্থিক ভার বহন করতে সক্ষম কি না, তা নির্ভর করছে প্রকল্পগুলো আর্থিকভাবে কতটা লাভ ফিরিয়ে দেবে এবং আমাদের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য। যদি দু’টিই নেতিবাচক হয়ে যায়, তবে আমরাও শ্রীলঙ্কার মতো সঙ্কটের মুখোমুখি হতে পারি। সুবিধাভোগী ঠিকাদার ও লোভী রাজনীতিবিদদের ব্যক্তিস্বার্থে প্রকল্পের খরচ অসম্ভব বেড়ে গেলে বিপর্যয় এড়ানো খুব কঠিন হবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব।

[সংকলিত]

Lab Scan
ভাগ