ঋণের বাকি অংশ ৪২ মাসে ফেরত দিতে চান নিট পোশাকশিল্প মালিকরা

লোকসমাজ ডেস্ক॥ প্রণোদনার ঋণের অর্থ ফেরত দিতে আরও সময় চেয়েছেন নিট পোশাকশিল্প মালিকরা। ঋণের বাকি ১৪ কিস্তি দিতে ৪২ মাস সময় চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরকে চিঠি দিয়েছে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
নিট পোশাকশিল্প মালিকরা প্রণোদনা ঋণের ১৮ কিস্তির মধ্যে এ পর্যন্ত চার কিস্তি পরিশোধ করেছেন। বাকি ১৪ কিস্তি পরিশোধে ৪২ মাস সময় চেয়েছেন। সংগঠনটির সভাপতি এ কে এম সেলিম ওসমান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ঋণ পরিশোধে বাড়তি সময়ের সঙ্গে বেশকিছু দাবিও জানিয়েছেন।
চিঠিতে বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, করোনার প্রভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তৈরি পোশাকখাত থেকে রপ্তানি হয় মাত্র ২৭ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ১২ শতাংশ কম। সরকার নীতিসহায়তা দেওয়ায় ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ তৈরি পোশাকখাত ৩১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি করতে সক্ষম হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরু থেকে কারখানাগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করে। কিন্তু উদ্যোক্তারা পোশাক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল— তুলা, সুতা, ডাইস কেমিক্যালসহ অন্যান্য কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যায় পড়ে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে কনটেইনারের অপ্রতুলতা ও ভাড়া বেড়ে আকাশচুম্বী হয়। কাঁচামালের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের বাজার থেকে বেশি পরিমাণে তুলা সংগ্রহের কারণে তৈরি পোশাকের উৎপাদন খরচ বহগুণ বেড়ে গেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে তৈরি পোশাকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২২ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং নিট পোশাকের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। তবে এই প্রবৃদ্ধির পেছনে মূলত ভূমিকা রেখেছে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া।
বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, সংকটকালে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা লোকসান দিয়ে রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং রপ্তানি আদেশ দেওয়ার পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী জাহাজ ও কনটেইনার সংকটের কারণে রপ্তানি পণ্য সময়মতো জাহাজীকরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এখনো বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করে রপ্তানি আদেশ বাতিল বা স্থগিত করা হচ্ছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে ডিসকাউন্ট দেওয়ার শর্তারোপ করা হচ্ছে।
এ অবস্থায় তৈরি পোশাক-শিল্পের ব্যবসা চলমান রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিকেএমইএ বেশকিছু দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-
>> বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৭ এর মাধ্যমে পোশাক শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য প্রদত্ত ঋণের বাকি ১৪ কিস্তি পরবর্তী ৪২ মাসে প্রদানের ব্যবস্থা করা। বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত নিট কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) সর্বোচ্চ সীমা ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বর্ধিত করা। কাঁচামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পণ্য এরই মধ্যে রপ্তানি করা হয়েছে কিন্তু তার বিপরীতে ক্রেতার নিকট হতে নির্দিষ্ট সময়ে পেমেন্ট না পাওয়ায় তারল্য সংকট দেখা দিচ্ছে।
>> বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানাগুলোর জন্য ইডিএফের লিমিট ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা। কোনো নিট কারখানার ইডিএফ থেকে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ফান্ড প্রয়োজন হলে কেসভিত্তিতে সমাধান করা।
>> ইডিএফ ফান্ডের আকার ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে আরও বাড়ানোর জন্য প্রয়ােজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। বিল অব এন্ট্রি ম্যাচিং সংক্রান্ত এফই সার্কুলার নং ২৫, তারিখ ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ এর সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
>> নন-বন্ডেড তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশন গাইড লাইন-২০১৮ সংশোধনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আগের মতো ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে নির্দেশনা দেওয়া।
>> সব ধরনের কাঁচামালের মূল্য মাত্রাতিরিক্ত বাড়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ সীমা (ব্যাক টু ব্যাক ক্রেডিট লিমিট) ৭৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া।
>> বস্তুমূল্যের পরিবর্তে সরাসরি প্রত্যাবাসিত এফওবি মূল্যের ওপর নগদ সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা-সংবলিত নতুন একটি মাস্টার সার্কুলার জারি করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। আমদানি-পরবর্তী অর্থায়নের ক্ষেত্রে এলসি করার অনুমোদন দিয়ে স্থানীয় শিল্পের বিকাশে সহায়তা দেওয়া এবং তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে প্রস্তাবিত বিষয়গুলো বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।