শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাড়ছে পরিচালনা কমিটির দৌরাত্ম্য

মুরাদ হুসাইন॥ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। এর ফলে ইচ্ছেমতো শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতি, শারীরিক-মানসিকভাবে লাঞ্ছনাসহ নানাভাবে অপদস্ত করা হচ্ছে। কমিটির সভাপতিসহ অন্য সদস্যদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কিছু গেলে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিচালনা কমিটির ক্ষমতায় রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক জগদীস চন্দ্র পাল এবং মিরপুর সিদ্ধান্ত হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক নেতা নজরুল ইসলাম রনিকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। জানা যায়, ভিকারুননিসার শিক্ষক জগদীস চন্দ্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের একটি গ্রুপে পোস্ট দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং কমিটি তাকে সাময়িকভাবে চাকরিচ্যুত করে। আইনি লড়াই করে ১৯ মাস পর চাকরি ফিরে পেলেও বেকার থাকা সময়গুলোতে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করেন। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় পরিবারের চার সদস্য নিয়ে ঢাকায় বসবাস করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে চাকরিচ্যুতির ছয় মাস পরে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে মানবিক কারণে আবেদন করলে তাকে বেতন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে অবশ্য আদালত থেকে তার পক্ষে রায় দিলে ১৯ মাস পর তিনি পুনরায় চাকরিতে যোগদান করেন।
জগদীস চন্দ্র পাল এ বিষয়ে বলেন, ফেসবুকে একটি সাধারণ পোস্ট দেওয়ায় আমার জীবনে দুর্যোগ নেমে আসে। প্রায় দুই বছর চাকরি ও বেতন ছাড়া আমাকে দিন পার করতে হয়েছে। গভর্নিং কমিটির সাবেক সভাপতি ও অধ্যক্ষ ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমার সঙ্গে অবিচার করেছেন। আর কারও সঙ্গে যেন এমন না ঘটে, সেই দাবি জানাই। অন্যদিকে গত ৩০ অক্টোবর জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয় মিরপুর সিদ্ধান্ত হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম রনির। বিদ্যালয়ে ঢুকে একদল যুবক এ ঘটনা ঘটায়। তারা জোর করে নজরুলের অফিস কক্ষের চাবি, কাগজপত্র, চেক ও চেক রেজিস্ট্রার খাতাসহ সব প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে যায়। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মুজিব সারোয়ার মাসুম এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তবে তিনি ওই যুবকদের বাধা দেননি। সভাপতির ইন্ধনেই এমন ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম রনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে জোর করে একদল সন্ত্রাসী একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছে। জোর করেই আমার দায়িত্বে থাকা ব্যাংকের চেক, কাগজপত্রসহ সব প্রয়োজনীয় জিনিস নেওয়া হয়। সেসময় সভাপতিসহ অনেকে উপস্থিত থাকলেও কেউ বাধা দেননি। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের ফান্ডের অর্থ আমার একক স্বাক্ষরে ওঠানো সম্ভব নয়, যৌথ স্বাক্ষরে অর্থ তোলা হয়। একটি সাজানো নাটক তৈরি করে বর্তমান সহকারী প্রধান শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক করতে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে।
ভুক্তভোগী এই শিক্ষক বলেন, এমন অপরাধের তদন্ত করে সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছি। এ বিষয়ে স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি করায় বর্তমানে আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সভাপতি মুজিব সারোয়ার মাসুম বলেন, দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক নজরুল নানা অনিয়ম করে আসছেন। বারবার তাকে সর্তক করা হলেও কোনো লাভ হয়নি। তুচ্ছ কারণে তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেন। প্রতিষ্ঠানের ফান্ডের অর্থ তছরূপ করেছেন। তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষকের অনিয়মের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ডিও লেটারও দিয়েছেন। এ কারণে তাকে তিন মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তার পাওনা পরিশোধ করা হবে। তবে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করে সভাপতি মাসুম প্রয়োজনে ওই শিক্ষককে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেন।
শুধু রাজধানীতেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা ব্যবস্থাপনা ও গভর্নিং কমিটির সভাপতিসহ কমিটির সদস্যদের কাছে শারীরিক-মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছেন, এমন অভিযোগ নিয়মিতই পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে অপরাধীর বিচারের দাবিতে শিক্ষকদের আন্দোলনও করতে দেখা গেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটির সদস্য ও সভাপতির মাধ্যমে শিক্ষক লাঞ্ছনার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের কাছে এ ধরনের অভিযোগ এলে তদন্ত করে তার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে পরিচালনা কমিটিতে যুক্ত হয়ে অনেকে নানা কৌশলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ উপার্জনের চিন্তা করেন। এজন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে নির্বাচনে জয়ী হয়ে কমিটিতে যুক্ত হন। তাদের জন্য অনেক সুনামধারী প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মুখে পড়ছে। জোর করে কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা সম্ভব নয়। অভিযোগ এলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।