খুলনাঞ্চলে কাঁচাপাটের বাজার নিয়ে ষড়যন্ত্রের গন্ধ! হঠাৎ করে মূল্য ধস

মো. জামাল হোসেন, খুলনা॥ খুলনা বিভাগে চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে প্রতি মণ পাটের দাম কমে গেছে ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। বছরে মৌসুমের শুরুতে কাঁচা পাটের দামও ছিলো বেশ চড়া। বাজার ছিল চাঙ্গা। মণ প্রতি ৩-৪ হাজার টাকা বিক্রি হয়। কিন্তু হঠাৎ করে কাঁচা পাটের বাজারে ধস নেমেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। এটার মধ্যে কাঁচাপাটের বাজার নিয়ে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। গত বছর থেকে পাটের দাম এবং চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পাট চাষে উৎসাহিত হন কৃষকরা। ফলে এ বছর এ অঞ্চলের কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পাটের চাষ করেছেন। এখন হঠাৎকরে বছরের শুরুতে পাটের বাজার পড়ে যাওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে তাদের মধ্যে। কাঁচা পাটের বাজারে বড় ধরণের দর পতনকে সংশ্লিষ্টরা কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেছেন।
পাট চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, বছরের শুরুতে যখন কাঁচা পাট বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার টাকার উপরে, সেখানে এভাবে হঠাৎ করে ধস নামতে পারেনা। তারা এর সঠিক কারণ অনুসন্ধানের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের মতে, হঠাৎ এই দরপতন পাটের বাজার ধ্বংসের কারণ হতে পারে। যে কোনোভাবে কারসাজি করে এই বাজারকে ক্ষতি করার চেষ্টা করা হচ্ছে কোনো পক্ষ থেকে। তাদের মতে সরকারের উচিৎ এখনই অনুসন্ধান করা নতুবা চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
অপরদিকে রফতানিকারকরা বলছেন, করোনার প্রভাবের পাশাপাশি রফতানিকারক দেশের চাহিদা অনুযায়ী কাঁচাপাট সরবরাহ না করা এবং দেশের কারখানাগুলোর চাহিদা মেটানোর কারণে কাঁচাপাট রফতানি কমে যাচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও কমছে। ফলে অনেকেই ব্যবসা থেকে সরে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশনের (বিজেএ) তথ্য মতে, ২০০৭-২০০৮ অর্থবছর থেকে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের (এপ্রিল) মধ্যে দেশের কাঁচাপাট রফতানিতে ব্যাপক পতন হয়েছে। রফতানি কমে যাওয়ায় ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের লোন সমন্বয় করতে না পারায় অনেকে জেলে, আবার কেউবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে।
বিজেএর সূত্র জানায়, এমনও অর্থবছর ছিলো যেসময় বাংলাদেশ থেকে ২৮ লাখ বেলের বেশি পাট রফতানি করত ব্যবসায়ীরা। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে পাট রফতানি। সর্বশেষ অর্থবছরে মাত্র ৫ লাখ বেল কাঁচাপাট রফতানি করেছে।
এদিকে বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশে পাট রফতানি হলে সেটি কমে এসেছে মাত্র ১৩টি দেশে। তবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এখনও বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ পাট আমদানি করছে বলে বিজেএ সূত্র জানায়।
বিজেএ পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের বরাবর গত ২৩ মে চিঠি প্রেরণ করেছে। ওই চিঠিতে ২০২০-২১ অর্থবছরের এপ্রিল মাস অবধি ৪৬ জন ব্যবসায়ী ৫ লাখ ২ হাজার ৭২১ বেল পাট রফতানি করে বলে জানানো হয়। এ সকল কাঁচাপাট চট্টগ্রাম, বেনাপোল, মোংলা ও বাংলা বান্দা বন্দর থেকে রফতানি হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, চীন, নেপাল, ব্রাজিল, বেলজিয়াম, ভিয়েতনাম, আইভরি কোষ্ট, এলসারভাদর, রাশিয়া, ফিলিপাইন, ইউকে, তিউনিশিয়া, কোরিয়ায় মোট ১৩টি দেশে পাট রফতানি হয়েছে। এর মধ্যে ভারতে রফতানি হয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩২ বেল এবং পাকিস্তানে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৪৬ বেল।
বিজেএর খুলনার অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে দেশ থেকে পাট রফতানি হয়েছিল ২৮ লাখ ৭০ হাজার ৯৮৪ বেল। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে ৩০-৩৫টি দেশ কাঁচাপাট নিতো এবং ৭০/৮০ জন রফতানিকারক সেই চাহিদা পূরণ করতেন।
খুলনার পিনিতাহ ট্রেড ইন্টারন্যাল কোম্পানির স্বত্বাধিকারী ও প্রগতি জুট সাপ্লাইয়ের সিইও এস এম সাইফুল ইসলাম পিয়াস বলেন, করোনার প্রভাবে কাঁচাপাট রফতানি কমেছে। এছাড়া দেশে কাঁচাপাট উৎপাদনও কমে যাওয়া পাট রফতানি হ্রাসের প্রধান কারণ। ২০২০-২১ অর্থবছরে যে পাট রফতানি করা হয়েছে তাতে রফতানিকারকরা বেশি লাভ করতে পারেনি। তাছাড়া পাটের দামও ৩শ থেকে ৪শ টাকা মণ প্রতি বেশি হওয়ায় পাট কিনতে অনীহা ছিল ব্যবসায়ীদের।
বিজেএ সভাপতি শেখ সৈয়দ আলী জানান, করোনায় কাঁচাপাট ব্যবসায়ীদের খুবই খারাপ অবস্থা। সরকার থেকে কোনো প্রণোদনাও দেওয়া হয়নি। দিনে দিনে দেশ থেকে কাঁচাপাট রফতানি কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা হতাশায় পড়েছেন। অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক লোন সমন্বয় করতে পারেনি। রফতানি কমে যাওয়ায় আয়ও কমছে। ফলে ব্যবসায়ীদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

Lab Scan
ভাগ