৩৩ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের পরিকল্পনা

লোকসমাজ ডেস্ক॥খাদ্যশস্যের ঘাটতি মোকাবেলায় চলতি অর্থবছরেই চাল আমদানিতে ফিরেছে সরকার। আগামীতে এর পরিমাণ আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এজন্য নেয়া হয়েছে শুল্ক হ্রাসসহ নানা উদ্যোগ। আগামী অর্থবছরে খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ টনেরও বেশি। আমদানি ও অভ্যন্তরীণ উভয় উৎস কাজে লাগিয়ে আগামী অর্থবছরে ৩৩ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য সংগ্রহ করতে চায় খাদ্য মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে আমদানি বাড়ানোতেই জোর দেয়া হচ্ছে বেশি। এছাড়া ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় চাল বিতরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এজন্য আগামী অর্থবছরে বাড়তি বরাদ্দ চায় খাদ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে অর্থ বিভাগে এরই মধ্যে একটি চিঠিও দেয়া হয়েছে।
দেশে খাদ্যশস্যের মজুদ কমছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে খাদ্যশস্যের মজুদ নেমে এসেছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশে। অন্যদিকে উৎপাদনও কমছে। চালের দাম বাড়ছে টানা কয়েক মাস ধরে। সব মিলিয়ে দেশে এখন খাদ্যশস্যের ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গত সোমবার প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্যশস্যের সরকারি মোট মজুদ রয়েছে ৬ লাখ ২ হাজার টন। এর মধ্যে চাল ও গমের মজুদ রয়েছে যথাক্রমে ৫ লাখ ২১ হাজার ও ৮১ হাজার টন। অথচ গত বছরেও মার্চের মাঝামাঝিতে দেশে খাদ্যশস্যের মজুদ ছিল ১৭ লাখ ৫১ হাজার টন। এ পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরে খাদ্যশস্য সংগ্রহের মোট লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৩৩ লাখ ১০ হাজার টন। অন্যদিকে খাদ্য অধিদপ্তর ও এফপিএমইউর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত পাঁচ অর্থবছরে গড়ে ২৬ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করেছে সরকার।
আগামী অর্থবছরে খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্য বাড়ানো হলেও আমদানির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে তা চলতি অর্থবছরের তুলনায় বেশি হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে। বিশেষ করে চালের আমদানিতে মনযোগ দেয়া হচ্ছে বেশি। চলতি অর্থবছরে সরকারের চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে প্রায় ১০ লাখ টন। সর্বশেষ ১৫ মার্চ পর্যন্ত দেশে খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টন। দ্রুত আমদানি বাড়াতে এরই মধ্যে বেসরকারিভাবে চাল আমদানির পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। এজন্য শুল্কহারও কমানো হয়েছে বড় মাত্রায়।
অন্যদিকে সরকারিভাবে চাল আমদানির গতি বাড়াতে টেন্ডারের সময়সীমা কমানো হয়েছে প্রায় এক মাস। এছাড়া সরকারি আমদানিতে বৈচিত্র্য আনতে উেসরও বহুমুখীকরণ হচ্ছে। গত কয়েক মাসে চাল আমদানির সিংহভাগ এসেছে ভারত থেকে। তবে একক বাজারের ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকি এড়াতে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকেও চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আদতে খাদ্যশস্যের মজুদ নিয়ে কোনো ধরনেরই ঝুঁকি নিতে চাইছে না সরকার। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও সম্প্রতি বলেছেন, একক দেশের ওপর নির্ভর থাকলে তারা কোনোভাবে সরবরাহে ব্যর্থ হলে ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে। তাই ঝুঁকি এড়াতে তিনটি দেশ থেকে চাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা কমিটি। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সভায় অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রধান সমস্যা দুটি। প্রথমত, সরকারের চাল সংগ্রহের জন্য মিলারদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা। অনেক ক্ষেত্রে মিলাররা চাল না দিলে সরকারের সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। গত বোরো ও চলতি আমন মৌসুমেও সরকারের সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এ কারণেই এখন খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন আনছে সরকার। সংগ্রহের চেয়ে আমদানি বাড়ানোতেই জোর দেয়া হচ্ছে বেশি। চাল সংগ্রহে এখন আর এককভাবে মিলারদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে চায় না সরকার। এজন্য জিটুজির ভিত্তিতে চাল আমদানির ওপরও জোর দেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় বড় সমস্যা হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন মজুদাগারের অভাবের কথা। দেশে বর্তমানে সব মিলিয়ে খাদ্যশস্যের মজুদ সক্ষমতা প্রায় ২০ লাখ টন। এ কারণে চাইলেও এর অতিরিক্ত খাদ্যশস্য মজুদ করা সম্ভব হয় না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে চলতি ও আগামী অর্থবছরে নতুন কয়েকটি সাইলো ও মজুদাগার উদ্বোধন হচ্ছে। এতে দেশের খাদ্যশস্য মজুদ সক্ষমতা অনেকটাই বাড়বে। এ কারণে সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোও সম্ভব হচ্ছে।
এ বিষয়ে খাদ্য সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, মজুদ বাড়ানোর জন্য সব ধরনের উদ্যোগ চলমান রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও আমদানি উভয় বাজার থেকে সংগ্রহের প্রক্রিয়া জোরদার করা হচ্ছে। চাল ও গম আমদানিতে বাজার বহুমুখী করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চাল সংগ্রহ করলে বাজারে মূল্য আরো বেড়ে যাবে। তাই আমরা স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ না করে আমদানি করছি। চাল-গম আমদানি করে আমরা আমাদের মজুদ বাড়াব। পাশাপাশি আগামী বোরো মৌসুমে যে ধান উৎপাদন হবে, সেখানে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ধান সংগ্রহ করা হবে। সেজন্য আমরা আমাদের মজুদের ধারণক্ষমতা পর্যায়ক্রমে বাড়াচ্ছি। প্রতি বছরই গম আমদানি করলেও উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলে চাল সেভাবে আমদানি করা লাগে না। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন কম হলে চালও আমদানি করতে হয়। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ফসল ঘরে এলে আমাদের কোনো সংকট থাকবে না। তবে কার্যকর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অধিক সতর্কতার জন্য আমরা চাল আমদানি করছি।অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ লাখ ৫১ হাজার টন। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ২৯ লাখ ৭১ হাজার টনে উন্নীত করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয় নিয়ে সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আগামী অর্থবছরের সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্য সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে, সেটা ঠিক আছে। তবে শুধু লক্ষ্যমাত্রা ধরলে হবে না, তা অর্জন করার জন্য সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চলতি বছরেও অনেক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, কিন্তু সরকার বোরো-আমন কোনোটিতেই লক্ষ্য অনুযায়ী চাল সংগ্রহ করতে পারেনি। অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ নির্ভর করে উৎপাদনের ওপর। এখন উৎপাদন কেমন হবে, সেটাও দেখার বিষয়। বর্তমানে চালের বাজারে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, সেটা আগামী এপ্রিলের আগে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। কারণ এপ্রিলে বোরো চাল উঠলে তখন বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে। আমাদের যখন আমন উৎপাদন কম হলো, আমরা ঠিক সময়ে আমদানি শুরু করতে পারিনি। চাল আমদানির অনুমোদন মিলেছে গত আগস্টে। যদিও তা শুরু হয়েছে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে। এ অবস্থাটা চালকল মালিকরা বুঝতে পেরে সিন্ডিকেট করে চালের বাজারটা অস্থির করে তুলেছেন।পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আগামীতে সঠিক সময়ে সঠিক উদ্যোগ নেয়ার পাশাপশি বাজারে চাল সরবরাহ বাড়াতে আমদানিতে শুল্ক আরো কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
খাদ্য মন্ত্রণালয় এখন শস্য আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে ওএমএসসহ খাদ্যবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়ার পরিকল্পনা করছে। এজন্য মজুদ বাড়ানোর পাশাপাশি আগামী অর্থবছর এসব কর্মসূচির আওতায় ১৪ লাখ ৩০ হাজার টন চাল বিতরণ করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, খাদ্যের মজুদ বাড়াতে আগামী অর্থবছরে দেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দেড় লাখ টন ধারণক্ষমতার ১৬২টি খাদ্যগুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা করছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। সারা দেশে আধুনিক মানের ৫ লাখ ৩৫ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন স্টিং সাইলো নির্মাণ করা হচ্ছে। চালু করা হচ্ছে জনগণের মধ্যে খাদ্য বিতরণের ডিজিটাল পদ্ধতি। এজন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ চেয়েছে মন্ত্রণালয়টি। এছাড়া আগামী অর্থবছর নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি সিএসডি নির্মাণ ও খাদ্যশস্যের পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে প্রিমিক্স কার্নেল মেশিন ও ল্যাবরেটরি স্থাপনেরও চিন্তা করা হচ্ছে। এসব কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আগামী অর্থবছরে ২০ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর।