মোচিক শ্রমিক ইউনিয়নের অবাক নির্বাচন!

আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ॥ এবার ভোট প্রক্রিয়ার চাক্ষুষ ঘটনা গায়েব হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সে প্রক্রিয়ায় ভোট সরাসরি না হলেও কাগজে কলমে হয়েছে। সে ভোটে তফসিল ছিল, ভোট গ্রহণ ছিল, ছিল সমস্ত রকমের আনুষ্ঠানিকতার হিসেব। সব শেষে নির্বাচন হয়ে ১৩ সদস্যের দুবছরের কমিটিও হয়েছে এবং সে তালিকা যথানিয়মে জেলা শ্রম অধিদফতরে জমা দেয়া হয়েছে। অথচ কেউ দেখেনি, কেউ ভোট দেয়নি, কোনো পোস্টার দেখা যায়নি। এমন ঘটনা ঘটেছে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ মোবারকগঞ্জ চিনিকল (মোচিক) শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচনে।
সূত্র মতে, ১৩ টি পদে সবাই গোপনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ইউনিয়নের সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। শ্রমিকরা পাননি ভোটের তফসিল। মনোনয়নপত্র বিক্রি থেকে শুরু করে ভোটের সব প্রক্রিয়া হয়েছে অত্যন্ত গোপনে। এমনকি সংগঠনটির গঠনতন্ত্রে নির্বাচন প্রক্রিয়া শ্রম অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হওয়ার সুষ্পষ্ট বিধান থাকলেও সেটাও মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাধারণ শ্রমিকরা বলছেন, কখন তফসিল ঘোষণা, কখন ভোটার তালিকা প্রকাশ আবার কখন ভোট হয়ে গেল তারা কিছুই জানতে পারেননি। তাদের ভাষ্য গোটা ভোট প্রক্রিয়া গায়েব হয়ে গেছে।
কালীগঞ্জ উপজেলায় ১৯৬৫ সাল প্রতিষ্ঠা করা হয় মোবারকগঞ্জ চিনিকল। আর শ্রমিকদের প্রয়োজনে ১৯৭৪ সালে গঠিত হয় মোবারকগঞ্জ চিনিকল শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়ন নামের শ্রমিক ইউনিয়ন। ইতিপূর্বে সংগঠনটির কার্যনির্বাহী পরিষদ ছিল ২৫ সদস্য, বর্তমানে ১৩ সদস্যের। দুই বছর পর নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের আইন রয়েছে। ২০১৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে সভাপতির পদসহ ৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
শ্রমিক নেতারা জানান, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আঞ্চলিক শ্রম দফতর কুষ্টিয়া থেকে পাঠানো এক চিঠি দেখে তারা বিস্মিত হয়েছেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে মোবারকগঞ্জ চিনিকল শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নের নির্বাচন ২০২১ এ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনী ফলাফল ও ভোটার তালিকা সংশ্লিষ্ট দফতরে জমা দেয়া হয়েছে। যার কিছুই তারা জানেন না। গোপন নির্বাচনের কাগজপত্র অনুযায়ী চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়। যেখানে ৭ ফেব্রুয়ারি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ ও পদভিত্তিক প্রতীক প্রকাশ, একই দিন সকাল ১০ টা থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩ টা পর্যন্ত ভোটার সংশোধনী আবেদন গ্রহণ, ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৯ টায় চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ, একই দিন সকাল ১০ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বিক্রি, একই সাথে ওই দিনই সকাল সাড়ে ১০ টা থেকে বেলা ১২ টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র গ্রহণ, যাচাই বাছাই শেষে ওই দিনই বিকেল ৫ টায় পদভিত্তিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ, ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮ টা হতে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত প্রার্থীতা প্রত্যাহার, ১৩ ফেব্রুয়ারি পদভিত্তিক প্রতীকসহ চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮ টা হতে একটানা বিকেল ৪ টা পর্যন্ত মোবারকগঞ্জ চিনিকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভোট গ্রহণ, ভোট গ্রহণ শেষে ওই দিনই বে-সরকারি ভাবে ফলাফল ঘোষণা। ঘোষিত তফসিলে আরো দেখা যায়, মোচিক শ্রমিক ও কর্মচারি ইউনিয়নের কার্যকারী পরিষদের ০২ ফেব্রুয়ারি তারিখে মোচিক/ শ্রঃইউঃ/২০২১-২২/০২ স্মারকে চিঠি ও গঠনতন্ত্র মোতাবেক সোহেল আহম্মেদকে আহ্বায়ক, মো. রফিকুল ইসলামকে যুগ্ম আহবায়ক, মো. মনিরুজ্জামান, মো. আবুল হোসেন ও মো. কবির আলমকে সদস্য করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি অস্থায়ী নির্বাচনী কার্যালয় (মোচিক সাধারণ কাব অফিস) সভা করে এই তফসিল ঘোষনা করা হয়। সভায় নির্বাচনের বিষয়ে সার্কুলার করার জন্য মোচিকের সকল নোটিশ বোর্ড, ক্যান্টিন, নির্বাচনের অস্থায়ী কার্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে সাটানোসহ প্রয়োজনে অনান্য মাধ্যমেও প্রচারের ব্যবস্তা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়।
কাগজপত্রে পাওয়া এই নির্বাচনে যাদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে তারা হলেন সভাপতি পদে মো. গোলাম রসুল, সহ-সভাপতি পদে মো. ফজের আলী, সাধারণ সম্পাদক পদে মো. শরিফুল ইসলাম-৩, সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে মো. রফিকুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ফিরোজ আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ পদে মো মশিয়ার রহমান, দফতর সম্পাদক পদে মো. সায়েম বিশ^াস, প্রশাসন ও হিসাব বিভাগের কার্যনির্বাহী সদস্য মো. সাইদুর রহমান (পিকু), ইক্ষু বিভাগে মো. মহি উদ্দীন-২, মোছা. সালমা খাতুন, পরিবহন বিভাগে মো. নজরুল ইসলাম-৩ এবং কারখানা বিভাগের সদস্য মো. রবিউল ইসলাম ও মো. আক্তারুজ্জামান। শ্রমিক নেতারা জানান, বর্তমান পরিষদের ইক্ষু বিভাগের সদস্য আনসার আলী চাকরি থেকে সদ্য অবসরে যাওয়ায় ওই স্থানে মোছা. সালমা খাতুনের নাম দেওয়া হয়েছে। বাকি সবগুলো পদেই পুরাতনরা বহাল রয়েছেন।
এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া আঞ্চলিক শ্রম দফতরের উপ-পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানান, একটি ফলাফল তাদের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। যেটা সঠিক নিয়মে না হওয়ায় তারা গ্রহণ করেননি। এ বিষয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহবায়ক সোহেল আহম্মেদ জানান, তারা ভোটের কোনো ফলাফল জমা দেননি। তিনি এখনও দায়িত্ব নেননি। বর্তমান কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জানান, চিনিকল বাঁচানোর স্বার্থে পুরাতন কমিটি আবারো থেকে যাক এটা শ্রমিকরা চান। যে কারণে ভোট না করার কথা হয়েছে।