পুলিশের যাবজ্জীবন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সদস্যের অপরাধ, পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগে কারও বিচার ও সাজা হয় না- এমন একটি ধারণা এদেশে প্রচলিত রয়েছে। গত সপ্তাহে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ থানা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুকে ঘিরে ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট দায়েরকৃত মামলার যে রায় দেন তা ওই ধারণা ভেঙেছে। এ রায় দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মাইলফলক হয়ে থাকবে। সাড়ে ছয় বছর আগে রাজধানীর পল্লবীতে একটি গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান থেকে ইশতিয়াক হোসেন জনি ও ইমতিয়াজ হোসেন নামের দুই ভাইকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তাদের অপরাধ উক্ত অনুষ্ঠান থেকে পুলিশের সোর্স সুমনকে খালি গায়ে নাচানাচি করে নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের জন্য বের করে দেয়া। এ নিয়ে সুমনের সঙ্গে বাকবিতন্ডা হলে পল্লবী থানায় খবর দিলে পুলিশ এসে দুই ভাইকে ধরে নিয়ে যায় এবং নির্যাতন করে। এক পর্যায়ে নির্যাতনে ইশতিয়াকের অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মর্মান্তিক এ ঘটনার জেরে ২০১৩ সালে পাসকৃত নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন ভাই ইমতিয়াজ। এটি সাত বছর আগে পাস হওয়া নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (বিবারণ) আইনে করা কোন মামলার প্রথম রায়। রায়ে পল্লবী থানার সঙ্গে তৎকালে সংযুক্ত ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজন পুলিশকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডসহ নিহতের পরিবারকে তিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। একই সঙ্গে পুলিশের দুই সোর্সকে দেয়া হয় অর্থদন্ডসহ সাত বছর কারাদন্ড। অবশ্য দন্ডিত আসামিদের দু’জন এখনও পলাতক। থানা হেফাজতে নির্যাতনে ইশতিয়াক মুমূর্ষু অবস্থায় পানি চাইলে তার মুখে থুথু দেয়া হয়। বিজ্ঞ বিচারক এই ঘটনাকে ‘চরম মানবাধিকারের’ লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেন। নিহতের ভাই ইমতিয়াজ জানিয়েছেন, পুলিশের বিরুদ্ধে করা এই মামলার বিচার পেতে তাদের অনেক বাধা-বিপত্তি পেরোতে হলেও শেষ পর্যন্ত তারা ন্যায় বিচার পেয়ে খুশি। অন্যদিকে আসামিরা বলছে, তারা রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করবে উচ্চ আদালতে। আইনের চোখে সবাই যে সমান- এই রায়ের মধ্য দিয়ে সেটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সর্বোপরি এতে স্বাধীন বিচার বিভাগ ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।
দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের জন্যই পুলিশ বাহিনী। সেই প্রোপটে দেশের পুলিশ বাহিনীকে সর্বদাই আইনের রকের ভূমিকায় জনবান্ধব হিসেবে অবতীর্ণ হতে হবে। জনসাধারণের সমস্যাকে দেখতে হবে আন্তরিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময়ে পুলিশকে মানুষের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে গুরুত্ব দিতে হবে সর্বাধিক।
আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের পুলিশ অনেকাংশেই জনবান্ধব ও হিতকারী। সীমিত জনবল, পর্যাপ্ত আধুনিক যানবাহন ও অস্ত্রশস্ত্রের অভাব, তথ্যপ্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার স্বল্পতা, মাত্রাতিরিক্ত খাটুনি ইত্যাদি অস্বীকার করা যায় না। তবে গত কয়েক বছরে বিশেষ করে বর্তমান সরকারের আমলে তাদের সুযোগ-সুবিধা এমনকি বেতন-বোনাস দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে । তারপরও বর্তমানে পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগও তুলনামূলকভাবে বেশি। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা প্রশংসনীয় করতে ঘুন, দুর্নীতি বন্ধকরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ও মানবাধিকার রা বিশেষ অবদান রাখতে হবে। আমরা আশা করবো, পুলিশ বিভাগ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনআ করবে।