অমাবশ্যার জোয়ারে প্লাবিত উপকূল

লোকসমাজ ডেস্ক॥ প্রবল জোয়ারে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার উপকূলীয় উপজেলার গ্রামগুলো। ক্ষতি হয়েছে বাড়ি-ঘর, ফসলের ক্ষেত এবং ভেসে গেছে মাছের ঘের।
খুলনা ব্যুরো জানায়, এবার অমাবশ্যার প্রবল জোয়ারের পানিতে ভাসছে খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রা ও পাইকগাছা। আম্পানের রেশ কাটতে না কাটতেই উপজেলা দু’টির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সম্প্রতি জোয়ারে কয়রায় ৫টি স্থান ভেঙ্গে ৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ১০ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। কপোতা আর কয়রা নদীর পানি উপচে পড়েও প্লাবিত হচ্ছে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে ২ নম্বর কয়রা, গোবরা, ৩ নম্বর কয়রা ও বেদকাশি গ্রাম। গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে লোকজন স্বেচ্ছাশ্রমে ভেঙ্গে যাওয়া স্থানগুলো আটকাতে চেষ্টা করেন। এর আগে বুধবার কয়রা উপজেলার কাজীপাড়া, পুটিহারী, হরিণখোলা, কাশিরহাট খোলা, ঘাটাখালি প্লাবিত হয়। অপরদিকে, পাইকগাছা উপজেলার শিবসা নদীর পানির চাপে হাড়িয়ার বাঁধ বুধবার ভেঙে মাজরাবাদ, বয়ারঝাপা ও টেংরামারী গ্রাম প্লাবিত হয়। স্থানীয় লোকজন বৃহস্পতিবার স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধটি আটকানোর কাজ শুরু করেন। উত্তর বেদকাশি গ্রামের বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন বলেন, অতিরিক্ত পানি বাড়ায় কয়রার উত্তরবেদকাশি আবারও লবণ পানিতে প্লাবিত হয়েছে। কয়রার গাজী পাড়ার সিরাজুল ইসলাম বলেন, আম্পানের পর কোন মতে ঘরে ফিরে বসবাস করছিলাম। কিন্তু জোয়ারের পানিতে আমরা ফের প্লাবিত হয়েছি। এখন আমার ঘরের মধ্যেও পানি প্রবেশ করেছে।

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, হঠাৎ করে জোয়ারের অতিরিক্ত পানির তোড়ে বাঁধ উপচে বিভিন্ন গ্রামে পানি ঢুকেছে। এতে নতুন করে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবারও ৫টি জায়গা ভেঙেছে। কয়রার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জাগ্রত যুব সংঘের সহ-সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, জোয়ারের পানির চাপে কয়রার হরিণখোলা, গাটাখালী ও ২ নম্বর কয়রায় ৫টি স্থানের বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে আরও ৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে আড়াই হাজার পরিবার সঙ্কটে পড়েছে। সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ আটকানোর কাজ বিকেল থেকে শুরু করেছেন। হঠাৎ করে অতিরিক্ত জোয়ারের পানিতে কয়রা ডুবেছে। কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, জোয়ারের পানির চাপে ঘাটাখালী, ২ ও ৩ নম্বর কয়রায় বাঁধ ভেঙে গেছে। সাধারণ মানুষের প্রষ্টোয় বাঁধ আটকানোর কাজ চলছে। আর কিছু জায়গায় বাঁধ ও পাকা সড়ক উপচে গ্রামে গ্রামে পানি প্রবেশ করছে। কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, জোয়ারের পানির চাপে বিভিন্ন স্থান ভেঙ্গে ও সড়ক উপচে গ্রামে পানি প্রবেশ করছে। জোয়ার কমলে এ সব স্থানে প্রয়োজনীয় মেরামত করা সম্ভব হবে। আর বিভিন্ন স্থানে স্বেচ্ছাশ্রমের কাজে বস্তা সরবরাহ করা হচ্ছে।
অপরদিকে, পাইকগাছায় গত দু’দিনে অমাবশ্যার প্রবল জোয়ারের পানির চাপে ৪টি ইউনিয়নের ৭টি স্থানে ওয়াপদার বাঁধ ভেঙ্গে ও উপচে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে মৎস্য ঘের, ফসলের তে ও বাড়িঘর তিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এর উদ্যোগে সাময়িকভাবে বাঁধ মেরামত করা হলেও বেতবুনিয়ার আবাসন প্রকল্পের ৫ শতাধিক পরিবার পানির মধ্যে বসবাস করছে। জোয়ারে উপজেলার সোলাদানা ইউনিয়নে বেতবুনিয়া আবাসন ও গুচ্ছগ্রাম পানিতে থৈ থৈ করছে। একই ইউনিয়নের টেংরামারী ও ভাঙ্গা হাড়িয়ার ওয়াপদার বাঁধ ভেঙ্গে বুধবার ৫ হাজার বিঘা চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়ে ফসল ও মাছের ব্যাপক তি হয়। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের উদ্যোগে রাত সাড়ে ১০ টা পর্যন্ত স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ভাঙ্গনরোধ করলেও গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কিছু অংশ ভেঙ্গে যায়। বিকেলে ভাটার সময় স্থানীয় চেয়ারম্যান এস. এম এনামুল হক ৪ শতাধিক লোক নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বাঁধটি মেরামত করেন। এ সময় শতাধিক লোক টেংরামারী পুরাতন গেট সংলগ্ন ওয়াপদার ভাঙ্গনও মেরামত করেন। অপরদিকে, দেলুটি ইউনিয়নের চকরি-বকরি বদ্ধ জলমহল ও গেওয়াবুনিয়ার ওয়াপদার বাঁধ উপচে জোয়ারের পানি এলাকায় প্রবেশ করে। এতে এলাকায় ব্যাপক মাছ ও ফসলের ব্যাপক তি হয়েছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান রিপন মন্ডল বলেন, দ্বীপ বেষ্টিত দেলুটি সবসময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার। বুধবার গদাইপুরের কচুবুনিয়া ও লতার কাঠামারীর ওয়াপদার রাস্তা জোয়ারের পানি উপচে শ শ বিঘার চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপ সাময়িকভাবে বাঁধ দিয়ে রা করার চেষ্টা করেন। পাইকগাছার সোলাদানার ভাঙ্গাহাড়িয়ার ভাঙ্গন স্থানীয় লোকদের নিয়ে বুধবার বিকেল থেকে অধিক রাত পর্যন্ত মেরামত করেছে বলে স্থানীয় ইউিপি চেয়ারম্যান এসএম এনামুল হক নিশ্চিত করেছেন। ইউপি সদস্য কল্যাণী মন্ডল বলেন, বাঁধ ভেঙে ৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে। ১৫ হাজার মানুষ তিগ্রস্ত হয়েছে। পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, ভাঙ্গন কবলিত এলাকা আপাতত আটকানো হয়েছে। এখানে দ্রুত টেকসই বাঁধ দেয়ার ব্যাপারে জরুরি ব্যবস্থা নেয়া হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ফরিদউদ্দীন জানান, ইতোপূর্বে ৪ বার সরকারি ও স্থানীয়ভাবে বাঁধ মেরামত করা হলেও টেকসই মেরামতের অভাবে বারবার পাইকগাছার এ এলাকাটি ভেঙ্গে জোয়ারের পানি ঢুকছে। বাঁধ মেরামতের জন্য ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরা উপকূলে বাঁধ ভেঙে পানিবন্ধি লক্ষাধিক মানুষ
সাতক্ষীরা সংবাদদাতা জানান, নদীতে প্রবল জোয়ারের চাপে রিং বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে চারটি ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রাম। শুক্রবার সকালে আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ও শ্রীউলা ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের লেবুগুনিয়া এলাকায় বাঁধ ভেঙে দুটি গ্রাম প্লাবিত হয়। গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল ইসলাম জানান, কপোতাক্ষের প্রবল জোয়ারের তোড়ে লেবুগুনিয়া এলাকায় বৃহস্পতিবার বাঁধ ভেঙে যায়। সেই স্থানটি এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে মেরামত করে আসার পর শুক্রবার বেলা ২টার দিকে তার পাশে দুটি স্থানে আবারো ভেঙে গেছে। লেবুগুনিয়া, চকবারা, গাবুরা ও খোলপেটুয়া চারটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তিনশ’ পরিবারের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর গিফারী বলেন, গাবুরা এলাকার বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। জোয়ারের সময় পানি প্রবেশ করছে লোকালয়ে। বাঁধ সংস্কারের জন্য কাজ শুরু করা হয়েছে। পানিবন্দি হওয়ার খবর আমাকে কেউ এখনো জানায়নি। অন্যদিকে, আশাশুনিতে কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর বাঁধ ভেঙে অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আশাশুনি উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান অসীম বরণ চক্রবর্তী জানান, আম্ফানের পর স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানগণ বাঁশ দিয়ে রিং বাঁধ দিয়েছিলেন, সেই বাঁধ সবই ভেঙে গেছে জোয়ারের তোড়ে। কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর বাঁধ ভেঙে শ্রীউলা ও প্রতাপনগর ইউনিয়ন পুরোপুরি প্লাবিত। লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। শ্রীউলা ইউনিয়নের হাজরাখোলা এলাকায় ও প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাওনিয়া, হিজলিয়া, কোলা, চাকলা, হরিশখালি এলাকার বাঁধ ভেঙে গোটা এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তিনি বলেন, আম্ফান ঝড়ের সময় এই বাঁধগুলো ভেঙে যাওয়ার পর আর মেরামত করা হয়নি। নদীর জোয়ারের পানিতে আবারো নতুন করে প্লাবিত হয়েছে গোটা এলাকা। এছাড়া আশাশুনি সদরে দয়ারঘাট জেলেখালি এলাকা বাঁধ ধসে সেখানেও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে মানুষ। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ নির্বাহী প্রকৌশলী (শ্যামনগর) আবুল খায়ের বলেন, লেবুগুনিয়ায় স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসন মিলে একটি রিং বাঁধ দিয়েছিল আম্ফানের পর। সেটির ছয়টি পয়েন্টে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। সেগুলো মেরামতের কাজ চলছে। আজ (শুক্রবার) দুপুরের দিকে আরও দুইটি পয়েন্টে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। সংস্কারের জন্য আমরা কাজ শুরু করেছি। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ নির্বাহী প্রকৌশলী (আশাশুনি) সুধাংশু জানান, চাকলা, হিজলা, কোলাসহ বিভিন্নস্থানে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। চাকলা হিজলা ও কোলা এলাকায় বাঁধ সংস্কারের জন্য সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যেহেতু বর্ষাকাল চলছে সেজন্য সেনাবাহিনী কাজ শুরু করেনি। কাজের পরিবেশ পাওয়া মাত্রই তারা বাঁধ রক্ষার কাজ শুরু করবে। তিনি বলেন, বর্তমানে যেসব স্থানে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে সেসব স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ড জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বাঁধ সংস্কারের কাজ অব্যাহত রেখেছে।

Lab Scan
ভাগ