২৬ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছাত্রলীগ নেতা সাদিককে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি॥ সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বিকাশের ২৬ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাদিকুর রহমান সাদিককে ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ। তবে ‘পলাতক’ সাদিককে পুলিশ খুঁজে পাচ্ছে না। তাকে গ্রেফতারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পুলিশ জানায়, ২৬ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাইফুল ও দ্বীপ বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও সাদিকুর রহমান এর ২২ লাখ টাকা ও কিছু অস্ত্র নিয়ে পলাতক রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে নারাজ পুলিশ। কর্মকর্তারা জানান, সাদিক যাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য সীমান্তে বিজিবি সতর্ক আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন, ‘এত কিছুর পরও জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে সাদিকের থাকাটা রহস্যজনক। তার কারণে ছাত্রলীগের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বন্দুকযুদ্ধে নিহত দ্বীপ ও সাইফুল জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদিকের খুব কাছের ছিল। সেই সাহসে বাজে আচরণ করতো। কিন্তু কিছু বলতে পারিনি। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কখন কিছু বলতে পারতো না। কারণ তাদের একজন স্থানীয় এক এমপির আস্থাভাজন ছিল।’ ওই নেতা আরও দাবি করেন, দ্বীপ ও সাইফুল বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও সাদিক বাহিনীর অন্যতম সন্ত্রাসী ফজলে রাব্বি শাওন, ফারিব আজবির, জামাল, তৌকির, মৃণাল মন্ডল, কাজী সাদিকুর রহমান দ্বীপ ও নাইম সরোয়ারের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে এরা এখন গা ঢাকা দিয়েছে, তবে সুযোগ পেলে আবারও সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাতে পারে। জেলা ছাত্রলীগের একাধিক নেতা জানান, দ্বীপ মুন্সিপাড়ার সোহাগ নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করেও সাদিক ও স্থানীয় এক এমপির কারণে রক্ষা পেয়ে যায়। এরপর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে সাদিক বাহিনীর অন্যান্য সদস্যরা। সাদিক নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে ঢাকায় অবস্থা করছিল। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ দিতে কেন্দ্রীয় নেতারা সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় গেলেও সে ঢাকা থেকে সাতক্ষীরা আসেনি। দ্বীপ ও সাইফুল নিহত হওয়ার পর সে ফেসবুকে তাদের পক্ষে আবেগি স্ট্যাটাস দিলেও পরে সেটা ডিলিট করে দেয়। এরপর থেকে সাদিকের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় বলেন, ‘সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদিকের বিষয়ে আমরা জানি। খুব দ্রুত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইলতুৎমিশ বলেন, ‘সাদিকের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। তাকে ধরতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। তদন্তের স্বার্থে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না।’ সাতক্ষীরা ৩৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফনেট্যান্ট কর্নেল গোলাম মহিউদ্দিন খন্দকার বলেন, ‘জেলা ছাত্রলীগ নেতা সাদিকের ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনও মেসেজ নেই। তবে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সীমান্তে বিজিবির টহল সর্তক অবস্থানে আছে। কেউ অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করতে চাইলে তাকে আটকে দেওয়া হবে।’
এদিকে রবিবার (১ ডিসেম্বর) বেলা ১টার দিকে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপারের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিকাশের ২৬ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের মাস্টারমাইন্ড ছিল সাদিক। ছিনতাইয়ের পর ২২ লাখ টাকা সাদিকের হাতে তুলে দেয় দ্বীপ ও সাইফুল। সাইফুল ও দ্বীপ বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও সাদিক ওই ২২ লাখ টাকা ও কিছু অস্ত্র নিয়ে পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। এই ঘটনায় আরও অনেকে জড়িত আছে। তাদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। কে কী করে সেটা দেখা হবে না। অপরাধ করলে তাকে অপরাধী হিসেবে দেখা হবে এবং অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ পুলিশ সুপার আরও জানান, টাকা ছিনতাই ঘটনার সঙ্গে জড়িত মোট ৯জনের মধ্যে সাতজনকে আটক করা হয়েছে। এরই মধ্যে দুই আসামি সাইফুল ইসলাম ও মামুনুর রহমান দ্বীপ গত ২৯ নভেম্বর রাতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। অস্ত্রসহ আটক দুই আসামি আজিজুর রহমান ওরফে সামী হাসান ওরফে সোহানকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। তারা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। ছিনতাইকারীদের স্বীকারোক্তির বর্ণনা দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, গত ৩১ অক্টোবর শ্যামনগর উপজেলা বিকাশ এজেন্টের শাখা ব্যবস্থাপক প্রদীপ কুমার,ফিল্ড কর্মকর্তা তামিম ও কাস্টমার কেয়ার অফিসার মিথুন সাতক্ষীরা সাউথ ইস্ট ব্যাংক থেকে বিকাশের ২৬ লাখ টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলে শ্যামনগর যাচ্ছিলেন। এসময় কালিগঞ্জের কাটাখালি এলাকায় পৌঁছালে তিন ছিনতাইকারী পিস্তল দিয়ে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে টাকা ছিনতাই করে। ছিনতাইকারীরা আশাশুনি উপজেলায় গিয়ে মোটর সাইকেলের রঙ পরিবর্তন করে টাকা নিয়ে সাতক্ষীরায় আসে। এসময় তাদের আগে পাহারা দেওয়ার জন্য আরও একটি মোটর সাইকেল ছিল। এ ঘটনায় মামলা হয়।

ভাগ