১৫ আগস্ট ২০১৯

গোলাম মাওলা রনি
আজ সকালে ঘর থেকে বের হলাম একরাশ বেদনা নিয়ে। অনেক দিন ধরেই কানাঘুষা শোনা যাচ্ছিল, ভারত তার জন্মের শুরু থেকে অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল থেকে জবরদখলে থাকা জম্মু ও কাশ্মিরকে যে আলাদা মর্যাদা দিয়ে আসছিল, তা অচিরেই প্রত্যাহার করে নেবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার জন্য কয়েক দশক ধরে ক্ষমতাসীন বিজেপি সারা ভারতবর্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছিল, তাদের সংবিধানে ৩৭০ ধারা এবং ৩৫‘ক’ ধারা নামে যে বিধান সন্নিবেশিত রয়েছে তা বেআইনি এবং সংবিধানের মৌলিক নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক। বিজেপি লাখো কোটি ভারতীয় রুপি খরচ করে সারা দেশে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে উল্লিখিত ধারা দু’টি সংবিধান থেকে বাদ দেয়ার জন্য জনমত গঠনের চেষ্টা চালায়। তাদের সেই সুদীর্ঘকালের চক্রান্ত তারা সফলভাবে বাস্তবায়ন করল এই আগস্ট মাসে।
বাংলাদেশের জন্য আগস্ট মাসটি জাতীয় শোক দিবস হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর থেকেই মাসটি আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের জন্য একটি গজবের মাস হিসেবে নানান শঙ্কা-দুঃখ-বেদনা ও নতুন চক্রান্তের আতঙ্ক হিসেবে কাজ করে। আওয়ামী লীগের ’৭৫-পরবর্তী জীবনকে আগস্ট-কেন্দ্রিক অনেকগুলো দুর্ঘটনা-চক্রান্ত এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ মোকাবেলা করতে হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে কতগুলো ছিল সত্যিকার অর্থেই পিলে চমকানোর মতো নির্মম ও নিষ্ঠুর। ফলে আগস্ট এলেই আওয়ামী লীগ শোকাতুর হয়ে পড়ে এবং অজানা আতঙ্কে সন্ত্রস্ত অবস্থায় থাকে। অন্য দিকে, আওয়ামীবিরোধীদের কেউ কেউ আগস্ট মাসকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু আওয়ামী বন্ধু ভারতের কাছে আগস্ট হলো আনন্দ-ফুর্তির মাস এবং ১৫ আগস্টে তারা কিরূপ আনন্দ করেছিল তা কারো অজানা নয়।
১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল অবধি, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতার বাইরে ছিল তখন তাদের পক্ষে বর্তমানের মতো করে আগস্ট মাসের শোক পালন সম্ভব ছিল না। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ আগস্ট মাসজুড়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং দলীয়ভাবে বহুমুখী কর্মসূচি, কাঙালিভোজ এবং সভা-সমিতি-সেমিনারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালন করে আসছিল। আগস্ট মাসের প্রথম দিন থেকেই শহর-বন্দর-গ্রামের জনবহুল এলাকাগুলোতে সকাল থেকে গভীর রাত অবধি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজতে থাকে মাইকে। কট্টরপন্থী আওয়ামী নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করেন- কেউ কেউ আবার নিজ নিজ বাড়িতে কালো পতাকা উত্তোলন করেন। ১৫ আগস্টের দিনটিতে কাঙালিভোজের নামে বড় বড় গরু জবাই করে বিশালকায় জিয়াফত করার রেওয়াজ প্রায় এক যুগ ধরে গণহারে বেড়েই চলেছে।
উল্লিখিত অবস্থার কারণে আমাদের দেশের আগস্ট মাসে একধরনের সরগরম ও কোলাহলমুখর শোকাতুর আবহাওয়া বিরাজ করে। কিন্তু এবারের আগস্ট মাসকে যেন কেমন কেমন মনে হচ্ছে। ১ আগস্ট থেকে যে ঐতিহ্যের কোলাহল বিগত দিনে চলে আসছিল তা এবার খুব একটা দেখা যাচ্ছিল না। পাড়া-মহল্লায় মাইকের আওয়াজ নেই- মুজিব কোট পরিহিত কালো ব্যাজ ধারণকারী নেতাকর্মীদের আনাগোনা চোখে পড়ছে না এবং কাঙালিভোজের গোশত-খিচুড়ির তোড়জোড়ের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
গত এক মাসের প্রবল বন্যায় দেশের উত্তরাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা নিমজ্জিত। প্রায় এক কোটি লোক পানিবন্দী হয়ে নিদারুণ দুর্ভোগ-দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বাংলাদেশের বিগত দিনের বন্যাগুলোতে মানুষ যেভাবে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে বন্যার্তদের সাহায্যের জন্য কোমরে গামছা বেঁধে মাঠে নেমে পড়ত, তেমন কোনো উদ্যোগ এবার চোখে পড়ছে না। অন্যান্য বছর রাষ্ট্র যেভাবে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা করত, এবারের বন্যায় সে রকম কোনো রাষ্ট্রীয় তৎপরতা চোখে পড়ছে না। বন্যার মতো মহামারী প্রাকৃতিক দুর্যোগ যখন জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে, ঠিক তখন ছেলেধরা এবং গলাকাটা গুজব পুরো দেশকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। সারা দেশে এই গুজব কে বা কারা যেন ছড়িয়ে দেয় যে, পদ্মা সেতু নির্মাণে অনেকগুলো মানুষের মাথা প্রয়োজন, যা জোগাড় করার জন্য অসংখ্য ছেলেধরা নারী-পুরুষ-আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব ছেলেধরা নাকি ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ধরে নিয়ে যায় অথবা সুযোগমতো ছেলেমেয়েদেরকে একা পেলে হত্যা করে তাদের দেহ থেকে ঘাড় বিচ্ছিন্ন করে পদ্মা সেতুর বিদেশী কন্ট্রাক্টরদের কাছে হস্তান্তর করে। এসব গুজবের কবলে পড়ে সারা দেশ অস্থির হয়ে পড়ে। ছেলেধরা সন্দেহে সারা দেশে প্রায় ২০ জন নারী-পুরুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় এবং আহত করা হয় আরো কয়েক শ’ জনকে।
ছেলেধরা আতঙ্কে সারা দেশ স্থবির হয়ে পড়ে। গ্রামাঞ্চলে সন্ধ্যার পর রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। নগর-মহানগর এবং রাজধানীতেও সন্ধ্যার পর চলাফেরায় মানুষজন সেলফ সেন্সরশিপ শুরু করে দেয়। গণপিটুনির ভয়ে অনেক ভদ্রলোক ও ভদ্র মহিলা প্রাতঃভ্রমণ কিংবা বৈকালিক শরীরচর্চার জন্য পার্কে যাওয়া বন্ধ করে দেন। অনেক পিতামাতা তাদের ছেলেমেয়েদেরকে স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দেন। ফলে হাটবাজার, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দিরের মতো জনবহুল এলাকাগুলোতে ছেলেধরা আতঙ্ক এবং গণপিটুনির ভয় যুগপৎভাবে মানুষের দেহ-মন ও মস্তিষ্ককে অবশ করে তোলে। মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়ে আরো নিত্যনতুন গুজবে বাতাস দিতে থাকে। ফলে পুরো দেশ যেন এক রহস্যময় ভয়ঙ্কর জঙ্গলে পরিণত হয়, যা ২০১৯ সালের পুরো জুলাই মাসকে অন্ধকারের চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়। বন্যা-ছেলেধরা গুজবের সূত্রে গণপিটুনির আতঙ্ক যখন তুঙ্গে তখন খবর বের হলো- মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দেশের শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা নাই হয়ে গেছে। চলতি বছরের জুলাই মাসের এত সব ভয়ঙ্কর জাতীয় দুর্যোগ এবং তেলেসমাতির গজব গুজবের সাথে নতুন করে যুক্ত হয় কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড, যা ইতঃপূর্বে বাংলাদেশে ঘটেনি। হত্যাকাণ্ডগুলোর নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার দৃশ্য পুরো দেশবাসীকে স্তব্ধ করে দিলো। প্রতিটি বিবেকবান মানুষ মারাত্মকভাবে মানসিক আঘাতে জর্জরিত হলেন। এরই মধ্যে গণধর্ষণ ও শিশু ধর্ষণের অতীত ইতিহাস জুলাই মাসে এসে রেকর্ড ব্রেক করল। ফলে মানুষের হতাশা চরমে গিয়ে পৌঁছল।
জুলাই মাসের বহুমুখী মহামারীর সাথে নতুন করে যুক্ত হলো ডেঙ্গু মশার মারাত্মক প্রকোপ। প্রতি বছর বর্ষা মওসুমে আমাদের রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু মশার প্রকোপ বাড়ে। কিন্তু এবারের ডেঙ্গুর প্রকোপ জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়। ডেঙ্গু মশার কামড়ে অসংখ্য লোক মরতে থাকে এবং হাজার হাজার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী দিয়ে হাসপাতাল ভরে যায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা যখন চরমে পৌঁছে তখন দেখা যায়, ডেঙ্গু মারার জন্য কোনো কার্যকর কীটনাশক বাংলাদেশে নেই। ইতঃপূর্বে সিটি করপোরেশনগুলো মশা মারার জন্য যে ওষুধ ছিটাত তা ডেঙ্গু তো দূরের কথা- সাধারণ মশা মারার জন্যও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ অবস্থায় রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিরা দায়িত্ব এড়ানোর জন্য আবোল-তাবোল বলতে আরম্ভ করেন। পরিস্থিতি আরো জটিল হলে কর্তাদের কানে পানি ঢোকে এবং তারা অনেকটা অসহায়ের মতো এলোমেলো কথা এবং অপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম দ্বারা জনগণকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তুলতে থাকেন। দেশের সার্বিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ-মহামারী এবং নানামুখী গুজবের কবলে পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। হাটবাজারগুলোতে বেচাকেনা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব ঈদুল আজহা-কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন এবং যোগাযোগ বিগত বছরগুলোর তুলনায় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতের ব্যবসা-বাণিজ্য, লোকজনের কেনাকাটা এবং প্রতিবারের মতো শহরবাসী লোকজনের গ্রামমুখী ঈদযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অর্থাভাবে অনেকে যেমন গ্রামে যাবে না- তেমনি পশু কোরবানির ক্ষেত্রেও অনেকে নতুন করে হিসাবপত্র করবে। দেশের এক কোটি বন্যা আক্রান্ত মানুষ, ডেঙ্গুর কবলে পড়া পরিবারগুলো, ব্যবসায় মন্দার শিকার লোকজন এবং শেয়ার মার্কেটে পুঁজিহারা উদ্যোক্তাদের হাহাকার এবং অভিশাপের সাথে গুজবের রসায়ন ঘটে পুরো বাংলাদেশকে কেন যেন রহস্যপুরীর মতো মনে হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিরাজমান সাম্প্রতিক সমস্যার সাথে গণতন্ত্রহীনতা, রাজনীতির স্থবিরতা, বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর সীমাহীন দমন-পীড়ন এবং ক্ষমতাসীনদের অতিরিক্ত হইচই, বাগাড়ম্বর, তুচ্ছতাচ্ছিল্যমূলক কথাবার্তা ইত্যাদির কারণে পুরো দেশ-কাল-সমাজে এক ভারসাম্যহীন অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে মানুষ জন্তু-জানোয়ার, কীটপতঙ্গ এবং জড় পদার্থের আকার-আয়তন ও ওজন অনুযায়ী যে কার্যকারণ হওয়া দরকার তা হচ্ছে না। বড় মালগুলো ক্ষুদ্রকায় পদার্থের মতো আচরণ করছে- অন্য দিকে ক্ষুদ্রকায় কীটপতঙ্গ বিশালাকার দানবের তাণ্ডব ঘটিয়ে সমাজ-সংসারকে যমদূতের মতো ভয় দেখিয়ে চলছে। চোখ যা দেখছে তা যেমন সত্য নয়- তেমনি কান যা শুনছে তা-ও সত্য নয়। ঘটনার আড়ালে অন্য ঘটনা নড়াচড়া করছে এবং হাসির আড়ালে কান্না অথবা কান্নার আড়ালে হাসির দোলাচলে নিত্যনতুন হীরক রাজা অথবা পুতুল নাচের ইতিকথা রচিত হয়ে চলেছে। উপরিউল্লিখিত ঘটনা-অনুঘটনার কারণে ২০১৯ সালের প্রথম দিন থেকে আজ অবধি দেশের সব মানুষের সাথে পাল্লা দিয়ে আমার মনের ওপর ক্রমাগত চাপ বেড়ে যাচ্ছে। পুরো শহরকে আমার কাছে মনে হচ্ছে অচেনা-অজানা। চার দিকে তাকিয়ে কোনো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না, যেখানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এতটুকু শান্তি পেতে পারি। শহরের লোকজনকে দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে। যানবাহনগুলোকে মনে হচ্ছে যমদূত এবং কীটপতঙ্গ ও মশা মাছি কালনাগিনীর মতো ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। বিগত কয়েক মাসের নিত্যদিনের মতো একধরনের অনিশ্চয়তা নিয়ে ঘর থেকে বের হলাম এবং ঢাকা কলেজ-নিউ মার্কেট পার হয়ে গাউসিয়া হয়ে এলিফ্যান্ট রোডের বাটার সিগন্যালে এলাম। তারপর সেখান থেকে শাহবাগ মোড় পার হয়ে সোজা মৎস্য ভবনের সামনে দিয়ে সেগুনবাগিচা ঢুকে গেলাম। এরপর ডায়াবেটিক হাসপাতাল পার হয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে তোপখানা রোডে অবস্থিত আমার অফিসে পৌঁছলাম। সারা রাস্তায় একজন মানুষকে দেখলাম না যে কিনা মুজিব কোট পরে ঘুরছে অথবা বুকে শোকের মাসের কালো ব্যাজ ধারণ করেছে। পুরো রাস্তার কোথাও একটি মাইকের শব্দ শুনলাম না যেখান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানো হচ্ছে।
পুরো শহরের হাঁকডাক-কোলাহলেও কেমন যেন নীরবতা নেমে এসেছে। পাবলিক বাসের কন্ডাক্টররা আগের মতো গালাগাল করছে না। রিকশাওয়ালারা কেমন যেন ঝিমিয়ে গেছে। পথের ধারের হকার-মোটরসাইকেল আরোহী এবং রিকশার যাত্রীরা কি ডেঙ্গুর ভয়ে চুপ হয়ে গেছে নাকি অন্য কোনো বেদনা-হতাশা কিংবা অতিরিক্ত ক্ষোভের কারণে মুখে তালা মেরেছে তা বুঝতে পারলাম না। এই সময়ে বিগত বছরে যেসব কাক অথবা রাস্তার নেড়ি কুকুরগুলো সচরাচর ডাকাডাকি করত তারাও প্রকৃতির ইশারায় নিশ্চুপ হয়ে গেছে। শহরের কিছু কিছু স্থানে হঠাৎ অভাবিত যানজট লেগে যাচ্ছে, আবার কোনো কোনো সড়ক অপ্রত্যাশিতভাবে বেজায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় দায়িত্বরত ট্রাফিক কনস্টেবল-আনসার অথবা তাদের দালালদের নড়াচড়া আগের মতো দৃষ্টিগোচর হলো না। মনে হচ্ছে, সবাই কেমন যেন উদাসীন হয়ে পড়েছে এবং জীবনের হাল ছেড়ে দিয়ে মনমাঝির হাতে বৈঠা সমর্পণ করে কিসের জন্য যেন অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশের নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা ও আবেগ-অনুভূতির অপমানের সাথে আজকের দিনটিতে ভারতের নীতিগর্হিত অপরাধমূলক কর্মটি আমার মনে বিষাদ বেদনা ও আতঙ্কের ওপর নতুন মাত্রা যোগ করল। কাশ্মির উত্তপ্ত হলে পুরো পাক-ভারত উত্তপ্ত হবে, যা বাংলাদেশের নাজুক অর্থনীতি, ভঙ্গুর পাবলিক সেন্টিমেন্ট এবং রাজনৈতিক অনৈক্য কিছুতেই ধারণ করতে পারবে না। কারণ, পুরো এশিয়া তো বটেই, আমার মনে হয় তামাম দুনিয়ার মধ্যে কোনো দেশেই বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে না। আমাদের জনগণ এখন কারো ডাকে সমবেত হবে- কোনো নেতানেত্রীর জন্য সমস্বরে শ্রদ্ধামিশ্রিত সহানুভূতি ও ভাবাবেগ প্রকাশ করবে, এমন অবস্থা নেই। মানুষের মধ্যে ঘৃণা-প্রতিহিংসা এবং প্রতিশোধস্পৃহা যেভাবে ধূমায়িত হচ্ছে, সামান্য সুযোগ পেলে যেভাবে বিস্ফোরিত হবে তা কল্পনা করতেই হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এ অবস্থায় কাশ্মিরি মুসলমান ভাইবোনদের ওপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর অত্যাচারের যেকোনো খবর অথবা গুজব আমাদের দেশে যদি বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে তবে তা আমরা সামাল দিতে পারব না। কারণ, পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো যেসব উপকরণ রয়েছে তার সব কিছুই আজ ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

ভাগ