হিন্দুস্তান টাইমসের নিবন্ধ নির্বাচন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি, ভারতের যা করা উচিত…

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ ঢাকায় সরকার এবং বিরোধী দলের ‘স্ট্যান্ড অফ’ নির্বাচনী গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে যে পরিণতি ডেকে আনবে, তা সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। যদি ঢাকায় তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট না থাকতো, তাহলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় উদযাপনের সুযোগ থাকতো। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগ, খুলনা-মংলা বন্দর সংযোগ এবং মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট ইউনিট-২ এর যৌথ উদ্বোধন সেই সাফল্যের চিহ্ন বহন করে। অবকাঠামোগত সংযোগের এই ধরনের গভীরতা অনিবার্যভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের অংশীদারিত্ব বাড়ায়। ক্রমবর্ধমান সহিংসতার পটভূমিতে একইসঙ্গে এই প্রশ্নও আসে, জানুয়ারিতে সম্ভাব্য সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে কোন দিকে যাচ্ছে?
এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ‘এসওএএস ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন’ এর শিক্ষক অভিনাষ পালিওয়াল ভারতীয় পত্রিকা হিন্দুস্তান টাইমসে (০৪ নভেম্বর) লিখেছেনঃ আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর সাথে হাসিনার সংলাপ প্রত্যাখ্যান, রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন দমন-পীড়ন সত্ত্বেও প্রাক-নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজপথে বিরোধীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া – সবমিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রত্যাশিত পথ ধরেই এগিয়ে চলেছে। ২৮ অক্টোবর বিরোধী দলের সমাবেশের দিন সংঘর্ষে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু দুর্ভাগ্যজনক হলেও এই ট্রেন্ড পরিচিত। কিন্তু, এই দৃশ্যমান অচলাবস্থার বাইরে এমন এক আন্দোলন হয়েছে যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর ও প্রসারিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
প্রথমটি বেসামরিক-সামরিক ক্ষেত্রে; দ্বিতীয়টি শুধু বেসামরিক ক্ষেত্রে। দ্বিতীয় পয়েন্ট দিয়েই শুরু করা যাক। গত ১২ মাসে, বিএনপি ক্রমাগতভাবে দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভ সংগঠিত করে, পুলিশি দমন-পীড়ন সহ্য করে, হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে পুঁজি করে অন্তত প্রকাশ্যে জামায়াত-ই-ইসলামী থেকে আলাদা হয়ে এবং পশ্চিমাদের কাছ থেকে যথেষ্ট কূটনৈতিক সমর্থন জোগাড় করে নিজেকে সেক্যুলার-লিবারেল হিসেবে প্রজেক্ট করতে শুরু করেছে। এমনকি আওয়ামী লীগের ইচ্ছাকৃত উস্কানি এবং রাস্তায় ছাত্রলীগের অভিযান সত্ত্বেও সহিংসতার পথে না হেঁটে যথেষ্ট শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিল বিএনপি।
বিএনপির প্রতিবাদের কৌশল বদলাতে শুরু করেছে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষ যদি কোনো কিছুর ইঙ্গিত দেয়, তাহলে সেটা হলো বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালিত সহিংসতার জবাব দিতে পারে এবং তারা তা করবে। বিরোধী দল সহিংসতা কিংবা সংহতিনাশ করছে বলে তাদের টার্গেট করা বাস্তব হয়ে উঠছে।
আন্তঃদলীয় সংলাপ ভেস্তে (যা কিনা উপেক্ষা করা যেতো) যাওয়া এবং অবিরাম সরকারি চাপ মিলিয়ে বিএনপি যে কেবল রাস্তায় শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করছে তা-ই নয়, বরং পরিবহন অবরোধ সংঘটিত করে দেশের কিছু অংশে জনজীবন স্থবির করে দিচ্ছে। শুধু এই ধরনের সহিংসতায় ‘গেইম চেইঞ্জ’ হয় না। কিন্তু এটি যে ‘ইমেজ ট্র্যাপ’ তৈরি করে তা দুর্বল করে দিতে পারে।
উভয় পক্ষই ভাবে যে তারা একে অন্যকে হারিয়ে বিজয়ী হতে পারে। আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে, বিরোধী শিবিরে বলপ্রয়োগ এবং ক্রমবর্ধমান হতাহতের ঘটনা বিএনপির ওপর দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেবে। এই ধরনের পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য তারেককে ঢাকায় ফিরে যেতে এবং কারাভোগের সম্মুখীন হতে প্রভাবিত করতে পারে অথবা চিরকালের জন্য নির্বাসনের অবজ্ঞার জন্য নিন্দিত হতে। এসবকিছু মিলিয়ে, বলপ্রয়োগ নিয়ে বিএনপির পরীক্ষা চালানোটা হাসিনার তৈরি ফাঁদে পড়ার মতো।
ঠিক উল্টোটাও সমানভাবে সত্য। বিএনপি মনে করে হাসিনাই বরং বিরোধী দলের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। জীবনযাত্রার ব্যয়জনিত সংকটে জর্জরিত জনসাধারণের অসন্তোষের মুখোমুখি হওয়া, ২০২২ সালের জুলাই মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২১ বিলিয়নে পৌঁছে যাওয়া এবং গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণে ওয়াশিংটন ডিসি এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর অনবরত চাপের মধ্যে অর্থনৈতিক পতনকে আটকাতে অক্ষম হাসিনাকে শক্তি প্রয়োগ করে ভিন্নমতকে নিশ্চিহ্ন করতে হয়েছে। এভাবে কঠোর হস্তে দমন একটি সুশৃঙ্খল দল হিসেবে বিএনপির ভাবমূর্তিকে তুলে ধরতে সাহায্য করে, যে দল আ.লীগ ও পুলিশের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করে চলেছে।
তারেকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, হাসিনা হয় পদত্যাগ করতে বা বৃহত্তর গৃহযুদ্ধের সূত্রপাতকারী সহিংসতায় জড়িত হওয়ার জন্য যথেষ্ট কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। প্রথমটি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে সহায়ক হতে পারে, তবে পরেরটি সামরিক হস্তক্ষেপকে আমন্ত্রণ জানাতে পারে। রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর পুনঃপ্রবেশ ঘটলে তাতে বিএনপির উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে তাতে তারেকের জন্য খেলার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
এটি আমাদের বেসামরিক-সামরিক গতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে যায়। বেশ কয়েকটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে যা ইঙ্গিত দেয় যে গ্যারিসন (শহরে বা দুর্গে অবস্থিত সৈন্যদল) অস্থির হয়ে উঠছে। প্রথমটি ছিল চট্টগ্রামের অন-ডিউটি এবং অফ-ডিউটির সকল সামরিক সদস্যদের ২৮ অক্টোবর সকাল ৬ টার মধ্যে নিজেদের আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ। এটা সেই সময়ে ঘটে যখন বিরোধীরা বিক্ষোভের পরিকল্পনা করেছিল এবং হাসিনা চট্টগ্রাম সফর করছিলেন। হাসিনা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চট্টগ্রামসহ বিএনপির শক্ত ঘাঁটিগুলো পরিদর্শন করেছিলেন, কিন্তু তখন এ ধরনের কোনো নির্দেশ জারি করেননি। এই ধরনের অস্বাভাবিক আদেশের আসল কারণ যাই হোক না কেন, একটি বিষয় পরিষ্কার যে, গত কয়েক সপ্তাহে কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে।
দ্বিতীয়টি হল লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) হাসান সারওয়ার্দীকে বিএনপির অফিসে একটি প্রেস কনফারেন্স আয়োজনে সহায়তা করার জন্য গ্রেফতার করার ঘটনা। সেখানে একজন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ‘উপদেষ্টা’ রূপে হাজির হয়েছিলেন।
রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ বিরোধীদের আটক করা বাংলাদেশে অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু চট্টগ্রামের আদেশের পরপরই একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার (যিনি একসময় সেনাপ্রধান হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন) বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনাটা অশুভ কিছুর ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় পদস্থদের সাম্প্রতিক রদবদল এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অনুগতদের ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গও আছে। হাসিনা নিয়ন্ত্রণ করছেন নাকি নিজেই আক্রান্ত হচ্ছেন তা আগে বা পরে পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে এটা নিশ্চিতভাবে বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এতোটাই উত্তপ্ত যে একটি ছোট ট্রিগার চাপলেই বাকিটা সামনে চলে আসবে।
হাসিনার শাসনামলে ভারত বাংলাদেশের সাথে যেসব অবকাঠামোগত প্রকল্প গড়ে তুলেছে, সেগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিতে নয়াদিল্লিকে ঢাকার ভাঙাচোরা রাজনীতিতে চৌকসভাবে ‘নেভিগেট’ করতে হবে। ঐতিহাসিক কারণের জন্য হলেও, ভারতের হাসিনাপন্থী পক্ষপাতিত্ব সর্বোত্তম। কিন্তু এখন ঝুঁকি হল ঢাকা এমন একটি ক্ষেত্রের মধ্যে পুনঃপ্রবেশ করছে যেখানে বিরোধীদের সাথে সম্পর্ক কিছুটা দেরিতে হলেও বৈচিত্র্যপূর্ণ হতে পারে।
ভারত যদি কিছু ‘পজিটিভ ইক্যুইটি’ রাখতে চায় এবং উচ্চ-মূল্য দিতে হতে পারে এমন দমনমূলক বিকল্পগুলো অন্বেষণ করতে বাধ্য হতে না চায়, তাহলে সেটা নিশ্চিত করার সর্বোত্তম উপায় হল একটা নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করা যা ঝড় থেমে যাওয়ার পর বাংলাদেশের অসংখ্য ভারতীয় সমালোচকদের সাথে সমঝোতার দরজা খুলে দিতে পারে।

Lab Scan