স্বভাবশিল্পী থেকে যেভাবে বিখ্যাত আকবর

0

মাসুদ রানা বাবু ॥ ‘এক দিন পাখি উড়ে যাবে যে আকাশে, ফিরবে না সে তো আর কারও আকাশে’ উপমহাদেশের অমর কন্ঠশিল্পী কিশোর কুমারের কালজয়ী গান গেয়ে রিকসাচালক থেকে রাতারাতি সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন যশোরের আকবর আলী গাজী । আর তার এই শিল্পী জীবনে উত্থানের সূচনা হয় দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি থেকে। শিল্পী জীবনের আগে তিনি দৈনন্দিন কঠিন জীবন সংগ্রাম করতেন। শহরের অলিতে-গলিতে রিকসা চালাতেন। সংগীতের ওপর আকবরের প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা ছিল না। তারপরও সঙ্গীতের প্রতি আবেগ, ভালোবাসা ও দুর্বলতার কমতি ছিল না। দুই পায়ে রিকসার প্যাডেল ঘোরাতেন আর মুখে সারাক্ষণ গুনগুন করে গান গাইতেন। সুযোগ পেলেই তিনি ঘরোয়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে দর্শকদের আনন্দ দিতেন। হঠাৎ একদিন সন্ধ্যায় শহরে ওয়াপদা মোড়ে একটি কনসার্টে (তু মেরি জিন্দেগী হে ) হিন্দি গান গেয়ে তিনি উপস্থিত দর্শক স্রোতাদের নজর কাড়েন। এর কিছু দিন পর সরকারি এম এম কলেজের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে বাগেরহাটের বাসিন্দা একই কলেজের শিক্ষার্থী ফুয়াদ হোসেনের বিশেষ অনুরোধে আয়োজক কমিটি তাকে গান পরিবেশেনের সুযোগ দেন। সেখানে তিনি প্রথমে কিশোর কুমারের গাওয়া (বহুদূর থেকে এ কথা দিতে এলাম উপহার) বাংলা গান পরিবেশন করেন। এরপর ওই অনুষ্ঠানে কিশোর কুমারের গাওয়া (মেরে মেহবুব কিয়ামত হো গি)সহ একে একে টানা ৭ থেকে ৮ টি গান গেয়ে একাই দর্শক মাতিয়ে তোলেন। এ অনুষ্ঠানের পর তাকে নিয়ে ইত্যাদিতে চিঠি লেখেন ফুয়াদ হোসেন। পরে ইত্যাদি কর্তৃপক্ষ তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ঢাকায় নিয়ে যায়। ফুয়াদ হোসেন তাকে আসা যাওয়ার খরচ দেন। সেখানে যশোরের কৃতী সন্তান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার রফিকুজ্জামান ও হানিফ সংকেতের সামনে গান গেয়ে তাদের নজর কাড়েন। এরপর আকবরের কণ্ঠে কিশোর কুমারের গাওয়া বিখ্যাত গান (একদিন পাখি উড়ে যাবে আকাশে) পরিবেশিত হয়। সেটি ইত্যাদির অনুষ্ঠান থেকে টেলিভিশনের মাধ্যমে দর্শকদের নজর কাড়ে। এরপর ইত্যাদি নির্মাতা প্রখ্যাত টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেতের অনুরোধে ক্যাসেট প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তাকে নিয়ে একটি ক্যাসেট প্রকাশ করে। যার মধ্যে আকবরের গাওয়া ১০টি মৌলিক গান ছিল। এরপর ২০০৩ সালে ইত্যাদির ঈদের অনুষ্ঠানে রফিকুজ্জামানের লেখা ও রাজেশেরের সুর করা ‘তোমার হাত পাখার বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে আসে’ গানটি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মৌলিক গানে কণ্ঠ দিয়ে দেশব্যাপী সাড়া জাগান আকবর। তার সাথে মডেলিং করেন জনপ্রিয় চিত্র নায়িকা পূর্ণিমা। এরপর ২০০৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত একের পর এক মৌলিক গান গেয়ে সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয় কাড়েন। এরপর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেতে শুরু করেন তিনি। এরপর ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর যশোর কালেক্টরেট চত্বরে অনুষ্ঠিত ইত্যাদি অনুষ্ঠানে গানটি আবার পরিবেশন করেন। আকবরের উল্লেখ যোগ্য মৌলিক গানের মধ্যে রয়েছে বেদনার মেঘ, আমার মরণ হলে, এক পৃথিবী ভালোবাসা, যদি ভালোবাসো,নদী আর মানুষ, এখন আমার চেয়ে, প্রেমের অভিনয়, আমার চোখ, সাক্ষাতে বিস্তারিত, বহু মূল্যের ভালোবাসা। শাকিলা জাফরের সাথে তিনি দ্বৈত কণ্ঠে গান গেয়েছেন। তার গানে চিত্র নায়ক রিয়াজ, মাহফুজ, তৃশার মত জনপ্রিয় তারকা মডেল হয়েছেন। সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যশোর সদরের আরবপুর ইউনিয়নের সুজলপুরে ৮ শতক জমি কেনের আকবর। সেখানে তার প্রথম স্ত্রী, দুই ছেলে, একপুত্র বধু, দুই নাতিনাতনি বাস করেন। তার প্রথম স্ত্রী নাম ফাতেমা বেগম। তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত। দুই ছেলে মধ্যে বড় ছেলের নাম কামরুল ইসলাম ও ছোট ছেলের নাম মহরম আলী। বড় পুত্রবধূ মুক্তা বেগম । তার সাড়ে তিন বছর বয়সী জান্নাতুল এবং ২৮ দিন বয়সী এক পুত্র সন্তান আছে। ২০২১ সালে আকবর সুজলপুর গ্রামে পরিবারের সাথে ঈদ উদযাপন করেন। তার শেষ ইচ্ছা ছিলো কারবালা কবরস্থানে বাবা ওমর আলী ও মা রুব্বান বেগমের কবর জিয়ারত করার। বড় ছেলে কামরুল ইসলাম এক মাস আগে ঢাকায় অসুস্থ পিতাকে দেখতে গেলে একথা জানিয়েছিলেন আকবর। একই সাথে বলেছিলেন, তাকে যেন কারবালায় দাফন করা হয়। মাঝে মধ্যে সময় পেলে তিনি যশোরে এসে টিনের চালার ওই বাড়িতেই থাকতেন। পরিবারের সাথে আনন্দ উদযাপন করতেন। ছেলে কামরুল ইসলাম বলেন, পিতাকে যশোর কারবাল কবরস্থানে দাফন করা হবে। পিতার শেষ ইচ্ছানুযায়ী। রোববার তার মৃৃত্যু সংবাদ যশোরের ছড়িয়ে পড়া মাত্রই ভক্ত স্বজনরা সুজলপুরে বাড়িতে সমবেত হতে থাকেন স্বজনদের সমবেদনা জানানোর জন্য ।

Lab Scan