সুবর্ণচর ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ

আমীন আল রশীদ
নোয়াখালী সদর উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে ২০০৫ সালের ২ এপ্রিল গঠিত হয় সুবর্ণচর উপজেলা। আয়তন ৫৭৬.১৪ বর্গকিলোমিটার। ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলার মোট জনসংখ্যা ২ লাখ ৮৯ হাজার। ১৯৫৯ সালে স্থানীয়রা এই চরটি আবিষ্কার করে। শুরু হয় অথৈ সাগরের বুকে জেগে ওঠা মাটির বুকে মানুষের বসতি স্থাপন। বিশেষ করে সহায় সম্বলহীন নদীভাঙা দরিদ্র মানুষেরা আশ্রয়ের নতুন ঠিকানা খুঁজে পায় এই সুবর্ণচরে। প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার সংগ্রাম শুরু করে গৃহহীন মানুষ। যদিও দেশের অন্যান্য চরের মতো এখানেও জমি নিয়ে শুরু হয় বিরোধ। ১৯৭৮ সালে সংঘর্ষ বাধে বহিরাগত ভূমিগ্রাসী শক্তির সঙ্গে। নিহত হয় শত শত মানুষ। ধ্বংস করা হয় হাজার হাজার ঘরবাড়ি। অর্থাৎ এই উপজেলার ইতিহাস নদীভাঙনের শিকার গৃহহীন অতি সাধারণ মানুষের নিরন্তন সংগ্রাম ও রক্তের ইতিহাস। সুবর্ণচরের উত্তরে নোয়াখালী সদর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা, পূর্বে কোম্পানীগঞ্জ ও চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলা, দক্ষিণে নোয়াখালীর হাতিয়া এবং পশ্চিমে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলা। নোয়াখালী জেলা শহর থেকে সুবর্ণচরের দূরত্ব প্রায় ২৩ কিলোমিটার।
সাম্প্রতিক ইতিহাসে সুবর্ণচর আলোচনায় আসে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাতে ৫ সন্তানের এক জননীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায়। তিন মাসের মাথায় সেই একইরকম এবং একই কারণে একই উপজেলায় আরেক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হলো। এবারের পাশবিকতার শিকার ৬ সন্তানের মা। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, এখন ‘গ্যাং রেপ’ বা ‘সংঘবদ্ধ ধর্ষণ’ শব্দটি কানে এলেই যেন চোখে ভাসে সুবর্ণচর। ৩০ ডিসেম্বর রাতে ধর্ষণের শিকার নারীর অপরাধ ছিল একটি বিশেষ প্রতীকে ভোট দেওয়া এবং এবারও যে নারী ধর্ষণের শিকার হলেন তিনিও চতুর্থ ধাপে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে একজন ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থক ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের অভিযোগ, প্রতিপক্ষ প্রার্থীর লোকজন তাকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছে। ৩১ মার্চ ভোটের দিন সন্ধ্যায় তারা স্বামী-স্ত্রী একসাথে বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে তাদের ওপর হামলা হয় এবং একটি মাছের ঘেরে নিয়ে ওই নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। এই দুটি ঘটনার মাঝখানে গত ৩১ জানুয়ারি সুবর্ণচরেই এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়। এর আগে ১৮ জানুয়ারি পার্শ্ববর্তী কবিরহাট উপজেলায় আরও একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ভয়াবহ তথ্য হলো, সুবর্ণচর উপজেলার চর জুবলি ও চর জব্বারের সীমান্তবর্তী এলাকার নারীরা বেশ কিছুদিন ধরেই আতঙ্কে আছেন। অনেকে রাত জেগে থাকেন বলেও শোনা যায়। কারণ একটি দল মাঝেমধ্যেই ‘চোর চোর’ বলে বিভিন্ন বাড়িতে যায় এবং চোরের খবর শুনে অনেকে দরজা খুলে বাইরে আসেন। সেই সুযোগে দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকে ধর্ষণ করে এবং সুযোগ পেলে মালামালও লুট করে নিয়ে যায়। এটি অপরাধের একটি নতুন কৌশল বলে মনে করছেন নোয়াখালীর স্থানীয়রা।
২.
নির্বাচনি বিরোধ, ভোটের রাজনীতি ইত্যাদি সারা দেশেই রয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয়, প্রতিপক্ষ প্রার্থীর নারী সমর্থকের ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো নৃশংসতা চালানো হবে। দেশের অন্য এলাকাগুলোর সঙ্গে এই একটি কারণে সুবর্ণচর আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্নটা খুবই সহজ, কেন সুবর্ণচরেই বারবার এমন ঘটনা ঘটছে। নোয়াখালীর একাধিক সাংবাদিক ও সুবর্ণচরের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু জানা গেছে তা হলো, ২০০৪ সালের আগ পর্যন্ত সুবর্ণচরে ছিল বনদস্যুদের উৎপাত। দীর্ঘ এলাকাজুড়ে সবুজবেষ্টনীর সুযোগ নিয়ে বনদস্যুরা এখানে আস্তানা গাড়ে। কিন্তু ২০০৪ সালের পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিপুলসংখ্যক দস্যু নিহত হয়। অনেকে ভয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। কিন্তু ফিরে এলেও তারা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। বাহ্যিকভাবে অনেকেই ছোটখাট ব্যবসা করলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে নানারকম গোপন তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত থাকে। বিশেষ করে যারা একসময় বনদস্যু বা তাদের সহায়ক ছিল। আবার রাজনৈতিক নেতারাও স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার ও প্রতিপক্ষের লোকজনকে দমনের জন্য এই সাবেক দস্যু ও অপরাধীদের নিজেদের দলে যুক্ত করে, প্রশ্রয় দেয়। অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, অপরাধীরা মনেই করে তাদের কিছুতেই কিছু হবে না। বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে যারা চেয়ারম্যান ও মেম্বার হচ্ছেন তাদের সবার কোনও না কোনও রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও বস্তুত তাদের অধিকাংশই রাজনীতির লোক নন। ব্যক্তিজীবনে খারাপ লোক হিসেবেই পরিচিত। স্থানীয় এমপি ও বড় রাজনীতিকদের ছত্রছায়ায় তারা নানারকম অপরাধ করেন এবং অপরাধীদের আশ্রয় দেন।
বস্তুত প্রতিপক্ষের ওপর এরকম ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পেছনে থাকে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের লোকেরাই ধর্ষণের মতো ঘটনার সাহস পায়– এমন অভিযোগ পুরনো। কারণ তারা জানে, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন তাদের কিছু বলবে না। আবার রাজনৈতিক প্রশ্রয়ও মিলবে। এসব ধর্ষণের মূল উদ্দেশ্য থাকে ধর্ষণের শিকার নারী ও তার পরিবারের মনে স্থায়ী ভীতি ঢুকিয়ে দেওয়া, যাতে তারা সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে শেষমেশ এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় কিংবা ভবিষ্যতে যাতে কখনও ‘ক্ষমতাবানদের’ প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ানোর সাহস না করে কিংবা ‘ক্ষমতাবানরা’ যা বলবেন তার বাইরে ভিন্ন কিছু না ভাবেন। যদিও সুবর্ণচরে ৩০ ডিসেম্বর রাতের ঘটনা নিয়ে পরবর্তী সময়ে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের বেশ ইতিবাচক পদক্ষেপ লক্ষ করা গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ওই ঘটনায় অভিযুক্ত রুহুল আমিনকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই ঘটনার ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে এটা ঠিক, ওই ঘটনা নিয়ে সারা দেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তোলপাড় শুরু হওয়ার ফলে ক্ষমতাসীনদের ওপর নৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়। যে কারণে তারা রুহুল আমিনকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বলে আমি ধারণা করি। ২০০১ সালের নির্বাচনের পরে ভোলায় নির্যাতিতদের পাশে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার বা দলের কেউ দাঁড়িয়েছিলেন বলে শোনা যায়নি। এর একটি বড় কারণ সোশ্যাল মিডিয়া। ১৫ বছর আগেও যেসব ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব হতো, এখন সেটি অনেক কঠিন। কারণ মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকার ফলে যেকোনও ঘটনাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে সারা দেশের মানুষ জেনে যাচ্ছে। ফলে মূলধারার গণমাধ্যম যদি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা অন্য কোনও চাপে কোনও সংবাদ চেপে যায় বা ব্ল্যাকআউট করে দেয়, সামাজিক যোগযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে সেটি আর গোপন থাকে না। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের এই সক্রিয়তা খোদ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্যও এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর ভুলভাল তথ্য ও গুজবও ছড়ায়।
৩.
৩০ ডিসেম্বর রাতে সুবর্ণচরের ৫ সন্তানের জননীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের অভিযোগে একাধিক আসামিকে গ্রেফতারের পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ফেনী শহরে চার তরুণীকে গণধর্ষণ, চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর এক গ্রামে ১০ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ, সীতাকুণ্ডের একটি গ্রামে এক কিশোরীকে ধর্ষণচেষ্টা, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় যৌন হয়রানির ভয়ে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর স্কুলে যাওয়া বন্ধ, রাজধানীর ডেমরায় ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে দুই শিশুকে হত্যার মতো ভয়াবহ নৃশংস লোমহর্ষক খবরগুলো গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। তার মানে প্রতিটি ধর্ষণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যেহেতু আলাদা মানুষ এবং তাদের আলাদা পরিচয়, ফলে একটি ঘটনায় অভিযুক্তরা গ্রেফতার হলেও বাকিরা এর থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না বা ভীত হচ্ছে না। অথবা তারা যখন ধর্ষণের মতো অপরাধে যুক্ত হচ্ছে তখন তাদের বিবেচনাতেই এটি থাকছে না যে এটি একটি ভয়াবহ অপরাধ কিংবা তারা হয়তো ভাবে এই ঘটনায় তারা পার পেয়ে যাবে কিংবা ওই সময়ে হয়তো তাদের হিতাহিত জ্ঞানও থাকে না। আসলে কী হয়, সেটি প্রতিটি ধর্ষণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভিন্ন ভিন্ন মেডিক্যাল ও সাইকোলজিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে হয়তো জানা সম্ভব। কিন্তু কখনও ধর্ষণের এই মনস্তত্ত্ব জানার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। একটি সমাজ ও রাষ্ট্রে ধর্ষণ বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাষ্ট্র যখন সামগ্রিকভাবে সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন অপরাধীদের মনে এই বিশ্বাস জন্মায় যে তারা পার পেয়ে যাবে কিংবা তাদের পেছনে বড় কোনও ছায়া আছে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি নাগরিকের মনে এই বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন করতে পারে, অপরাধ যেই করুক, তার রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ তদন্ত করে আদালতে সঠিক রিপোর্ট দেবে, আদালতে আইনজীবীরা অপরাধীকে বাঁচাতে মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না এবং ঘটনাটিকে রাজনৈতিক রঙ দিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে বিষয়টিকে হাল্কা করে দেবেন না; রাষ্ট্র যদি এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারে, বিচারকরা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে বিচার করবেন, তখন যেকোনও মানুষ, যেকোনও পরিচয়ের লোক, সে যত শক্তিশালীই হোক, ধর্ষণ বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো অপরাধে যুক্ত হওয়ার আগে একশবার ভাববে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমাদের রাষ্ট্র এখনও দলমত নির্বিশেষে সবার জন্য ন্যায়বিচার সুনিশ্চিতের নিশ্চয়তা এখনও দিতে পারেনি। যদিও সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’
লেখক: সাংবাদিক।

ভাগ