সুন্দরবনের পাশে কাঠ পুড়িয়ে কয়লার অবৈধ কারখানা

0

এইচএম শফিউল ইসলাম,কপিলমুনি (খুলনা) ॥ খুলনার পাইকগাছায় একটি অঞ্চল জুড়ে বাতাসে পোড়া কাঠের উটকো গন্ধ। বিশাক্ত বাতাসে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বাড়ছে বায়ুবাহী রোগ-জীবানুর সংক্রমণ। নাকে-মুখে কাপড় গুজেও রাস্তা পার হতে পারেন না পথচারীরা। পাইকগাছার চাঁদখালী-কয়রা সড়কের পশ্চিম পাশ দিয়ে কয়রার নাকশা অভিমুখে সারি সারি গড়ে ওঠা কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির শতাধিক অবৈধ চুল্লি থেকে নির্গত অবিরাম ধোঁয়ায় এমন পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। প্রভাব আর প্রতিপত্তির মুখে সরাসরি প্রতিরোধ সম্ভব না হলেও খানিকটা সোচ্চার হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগের পর এসব অবৈধ চুল্লি ধ্বংসে অভিযান শুরু করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসন। প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় ৭ সেপ্টেম্বর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত এমন ৫ টি অবৈধ কয়লা তৈরির কারখানা (চুল্লি) ভেঙ্গে দেয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এর কার্যক্রম। এ সময় আদালত আগামী এক মাসের মধ্যে সকল কারখানাসহ কয়লা তৈরির যাবতীয় সরঞ্জমাদি নিজ দায়িত্বে সরিয়ে নেয়ারও নির্দেশনা দিয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আসিফুর রহমান, জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আবু সাঈদ, পরিদর্শক মারুফ বিল্লাহ, পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগমের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে উপস্থিত ছিলেন, পেশকার ইব্রাহীম হোসেন ও আনসার সদস্যরা।

আদালত সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, অভিযান পরিচালনাকালে চুল্লিগুলো জ্বলন্ত থাকায় বহুলাংশে ব্যাহত হয় এর কার্যক্রম। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে তাৎক্ষণিক পাশের্রী আশাশুনি থেকে ফায়ার সার্ভিসকে ডেকে নিয়ে আগুন নিভিয়ে পরিচালিত হয় উচ্ছেদ কার্যক্রম। এর আগে এসব চুল্লি নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রতিবেদন প্রকাশ হলে দেরিতে হলেও সর্বশেষ সেখানে অভিযান শুরু করল খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরসহ উপজেলা প্রশাসন। তবে অভিযানে স্থানীয়দের মধ্যে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও শঙ্কা কাটেনি। পুরোপুরি সকল চুল্লি উচ্ছেদের আগেই এর মালিকরা ফের স্বরূপে ফিরতে পারেন বলেও আশংকা করছেন কেউ কেউ।

সরেজমিনে দেখা যায়, খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী-কয়রা প্রধান সড়কের পশ্চিম পাশ দিয়ে কয়রার নাকশা পর্যন্ত সারি সারি গড়ে উঠেছে অন্তত ৭০ টিরও বেশি কাঠ তৈরির অবৈধ কারখানা (চুল্লি)। এসব চুল্লিতে প্রতিদিন পুড়ছে হাজার হাজার মণ কাঠ। চুল্লি এলাকা থেকে আশপাশের কয়েক কি.মি. জুড়ে বাতাসে চুল্লি থেকে অবিরাম নির্গত বিশাক্ত কালো ধোঁয়ায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক নি:শ্বাস নিতেও কষ্ট হয় এসব এলাকার বাসিন্দাদের। প্রকাশ্যে গড়ে ওঠা এসব চুল্লির অবাধে নির্গত ধোঁয়ায় পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি রীতিমত স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে সুন্দরবন উপকূলীয় জনপদের লাখ লাখ মানুষ।

অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব চুল্লির কোনটারই নেই বৈধ কোন কাগজপত্র। প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালীকে ম্যানেজ করে পরিচালিত হয় এসব বায়ুদূষণ কারখানা।

সূত্র জানায়, নদীর তীর, প্রধান সড়ক, স্কুল, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা এসব চুল্লিতে প্রতিদিন পুড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য ফলদ ও বনজ বৃক্ষ। চুল্লির কাঁচামাল হিসেবে কাঠের যোগান দিতে একদিকে যেমন বন উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট,কাশিসহ বায়ু বাহিত নানা রোগ-জীবানুর সংক্রমণ ক্রমশ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিটি চুল্লিতে প্রতিবার ২০০ থেকে ৩০০ মণ পর্যন্ত কাঠের যোগান দিতে হয়। সে অনুযায়ী শতাধিক চুল্লিতে প্রতিবার ন্যূনতম ২০ থেকে ৩০ হাজার মণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। এভাবে প্রতিমাসে চুল্লিপ্রতি তিন থেকে চারবার কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করতে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ মণ কাঠের যোগান দিতে হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে নানা সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন শিল্প কারখানায় এসব চুল্লির কাঠের চাহিদা বেড়েছে অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি। মূলত চাহিদা ও লাভের বিষয়টিকে পুঁজি করেই কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরিতে মেতে উঠেছেন কারখানা (চুল্লি) মালিকরা। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে চড়া দামে বিক্রি হওয়া কয়লা বস্তায় ভরে পাঠিয়ে দেয়া হয় চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কল-কারখানায় জ্বালানি হিসেবে।

এর আগে এলাকাবাসীর পক্ষে এসব অবৈধ চুল্লি বন্ধে খুলনা বন ও পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ হয়। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, উপজেলার চককাওয়ালীর মৃত মোহতেজ সরদারের ছেলে আব্দুল হালিম খোকনের মালিকানাধীন ৮ টি, মো. রেয়াজ উদ্দিন ছোট্টুর ছেলে মো. হালিম রেজা মিন্টুর ৫টি, মো. সেলিম রেজা লিটুর ৫টি, মৃত মনির উদ্দীন গাজীর ছেলে মো. মশিউর রহমানের ২টি, মৃত মোনতেজ সরদারের ছেলে মো. ইলিয়াস সরদারের ৩টি, মো. শাহাদাৎ সরদারের ৫টি, মৃত মালেক সরদারের ছেলে আব্দুস সালাম সরদারের ২টি, হাফিজ সরদারের ৩টি, সাঈদ সরদারের ৪টি, গোলাম গাজীর ছেলে জয়নাল আবেদীনের ৩টি, মৃত আবু বক্কার গাজীর ছেলে মো. শাহিদুর গাজীর ১টি, মৃত ছাত্তার সরদারের ছেলে সোবহান সরদারের ২টি, মৃত সরল ইদ্দন গাজীর ছেলে আব্দুর রাজ্জাক গাজীর ৩টি, কানুয়ারডাঙ্গার সামাদ সরদারের ছেলে মে. জিয়া সরদারের ২টি, কালিদাশ পুরের মৃত সুলতান সরদারের ছেলে মো. নজরুল ইসলাম সরদারের ১০টি, মৃত নুর ইসলাম মাওলানার ছেলে ইনামুল হক গাজীর ৮টি ও বারিক সরদারের ছেলে ফেরদাউস সরদারের মালিকানাধীন ১টিসহ নামে বেনামে এলাকাটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রায় একশ কাঠ পুড়িয়ে অবৈধ কয়লা তৈরির চুল্লি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব চুল্লি মালিকদের সমন্বয়ে আবার সংগঠনও রয়েছে। মূলত সংগঠনের ছায়াতলে এক প্রকার সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই পরিচালিত হয় অবৈধ এ বায়ু দূষণ ব্যবসা।

চুল্লি মালিকদের একজন মো. মশিউর রহমান। তিনি পাশাপাশি কাজ করেন, পরিবেশ ও মানবাধিকার আইন সহায়তা সংস্থা এনভায়রনমেন্ট এওয়ারনেস এন্ড হিউম্যানিটি সোসাইটিতে। দায়িত্বে রয়েছেন, জেলার পরিদর্শক ক্রাইম তদন্ত হিসেবে। নিজে চুল্লির মালিক হলেও জনপদে এর অস্তিত্ব চাননা তিনি। তবে তার দাবি দু’একটি লোক দেখানো অভিযান নয়। পুরোপুরি উচ্ছেদ হোক সবগুলো কয়লার কারখানা বা চুল্লি।

তিনি আরো দাবি করেন, পরিবেশ দূষণরোধে চুল্লির বিরোধিতা করায় প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হন তিনি। প্রভাবশারীদের পক্ষে রীতিমত চরম হুমকির মুখে রয়েছেন তিনি। তিনি বলছিলেন, চুল্লি মালিকদের নিয়ে তাদের সংগঠনই মূলত সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

এসব চুল্লি পরিচালনায় বৈধ কোন অনুমোদন বা লাইসেন্স আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মালিক পক্ষের একাধিক ব্যাক্তি জানান, তাদের কোনো লাইসেন্স লাগে না, তাদের কমিটিই বিভিন্ন জায়গায় সার্বিক সমস্যা বা সংকট মোকাবেলা করে থাকে।

বছরের পর বছর ধরে জনপদটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এসব চুল্লির বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন কিংবা বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে কার্যত কোন অভিযান পরিচালনা হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে জনৈক চুল্লি মালিক বলেন, বছরে দু’ একবার খুলনা থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযানে আসলেও আগাম খবরে সাময়িক বন্ধ রাখা হয় কারখানাগুলো।

এ ব্যাপারে উপজেলা নিরাপদ খাদ্য ও সেনেট্যারি কর্মকর্তা উদয় কুমার মন্ডল জানান, কাঠ পোড়ানোর ফলে কার্বন ও সীসা উৎপন্ন হয়ে তা বাতাসে মিশে যায়। যে এলাকায় কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদন করা হয়, ওই এলাকায় চুল্লির ধোঁয়ায় মানবশরীরে শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, অ্যালার্জি, চর্মরোগ, চোখের সমস্যাসহ নানা ধরনের রোগ দেখা দিতে পারে।

পাইকগাছা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগম বলেন, কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির কোনো অনুমতি কাউকে দেয়া হয়নি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে। যা অব্যাহত থাকবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার উপপরিচালক আসিফুর রহমান জানান, অভিযান শুরু হয়েছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের অনুরোধে কিছুদিন সময় দেয়া হয়েছে। আগামী দিন সকল অবৈধ চুল্লি উচ্ছেদ বাস্তবায়ন করা হবে।

 

 

 

Lab Scan