সম্রাটের গুরু ও সহযোগী এমপিদের সিঙ্গাপুর মিশন নিয়ে অনুসন্ধান

লোকসমাজ ডেস্ক ॥ সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনো কিং ইসমাঈল হোসেন সম্রাটের ‘গুরু’ ও ‘সহযোগী’ খ্যাত বাংলাদেশি এমপিদের সিক্রেট মিশনের বিষয়ে তথ্যানুসন্ধান শুরু করেছে সরকারের একাধিক টিম ও সংস্থা। বিশেষ করে তারা কে কোথায় থাকতেন? কি করতেন? কীভাবে তাদের কাছে ডলার পৌঁছাতো? ক্যাসিনো, লটারি- কে কী খেলতেন? কাদের বাসায় যাতায়াত ছিল বিতর্কিত এমপিদের? এমন নানা তথ্য পেতে সরেজমিন সিঙ্গাপুর চষে বেড়াচ্ছেন সরকারের একাধিক বিভাগ, সংস্থা ও ইউনিটের প্রতিনিধিরা। তারা ঢাকায় রিপোর্টও পাঠানো শুরু করেছেন। বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুর ছেড়ে আসার আগে তথ্যানুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সরকারের দায়িত্বশীল এক প্রতিনিধি মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে লাখ-কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে সিঙ্গাপুরে। অবৈধ পথে আয় করা বিপুল পরিমাণ ওই অর্থ কতিপয় ব্যক্তির মনোরঞ্জন আর ব্যক্তিগত ভোগবিলাসের জন্য বিদেশে পাচার করেছেন। এর একটি অংশ গেছে জুয়া, লটারি, ক্যাসিনোতে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, পাচারকারীদের তালিকা বেশ দীর্ঘ। প্রতিনিয়ত তালিকায় নতুন নতুন নামের সংযোজন ঘটছে।
সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, কানাডা, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিদেশ থেকে প্রাপ্ত তথ্য, দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী, আমলা এবং তাদের সহযোগী ‘সম্রাট’দের চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপসহ নানা পদেক্ষপ নেয়া হচ্ছে। সূত্র মতে, ক্যাসিনো-জুয়া খেলতে নিয়মিত সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় যাতায়াতকারী বিতর্কিত যুব নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাটের ঘনিষ্ঠ ৫ এমপি, ১০ ব্যবসায়ী, ৯ যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা এবং সম্রাটের ৩ জন আত্মীয়ের বিদেশে থাকা অর্থ সম্পদ, বাড়ি-গাড়ির খোঁজে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন সরকারের বিভিন্ন ইউনিটের গোয়েন্দারা। চালু আছে- ঢাকায় সম্রাটের আগে যুবলীগের দায়িত্ব পালনকারী বর্তমানে বৃহত্তর বরিশালের এক এমপি সিঙ্গাপুরেও সম্রাটদের পথপ্রদর্শক! কিন্তু আজ কর্মগুণে এমপি ‘গুরু’কেও টপকে গেছেন শিষ্য ইসমাইল সম্রাট। ওই এমপির জগত কেবল সিঙ্গাপুর হলেও ‘শিষ্য’ সম্রাটের নেটওয়ার্ক মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া হয়ে সুইজারল্যান্ড অবধি বিস্তৃত! ওইসব দেশেও তার বিপুল সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি অনুসন্ধানকারী সূত্রের। তাদের দাবি মতে, সিঙ্গাপুর কানেকশন রয়েছে- এমন ৫ এমপির মধ্যে ক্যাসিনোতে অর্থ উড়ানো ফেনীর একজন, কিশোরগঞ্জের একজন এবং বরিশালের দু’জন প্রভাবশালী তরুণ এমপির বিষয়ে তারা নিশ্চিত!
তবে সুনামগঞ্জের একজন এমপির নামও তারা পেয়েছেন, যিনি এক সময় শেরাটনে সাপ্লাইয়ের ‘ব্যবসা’ করতেন। সিঙ্গাপুরে তিনি অর্থকড়ি সরিয়েছেন, নানা আড্ডায় সময় কাটিয়েছেন এটা প্রায় নিশ্চিত। তবে তার জুয়া বা ক্যাসিনো কানেকশনের প্রমাণাদি এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। দায়িত্বশীল সূত্র মতে, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে থাকা তথ্য মিলিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা পেয়েছেন কর্মকর্তারা। এতে রাগববোয়ালদের নাম এলেও তাদের কাউকে ছাড় না দিতে সরকারপ্রধানের তরফে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে বলে জানাচ্ছে সূত্রগুলো। সূত্র মতে, সবার বেলায় অ্যাকশন সমান হলেও ধরার পদ্ধতি-প্রক্রিয়া ভিন্ন হবে!
টাঙ্গাইলের শিল্পপতি আর আমেরিকা প্রবাসী নারী জুয়াড়ির খোঁজে: এদিকে টাঙ্গাইলের এক শিল্পপতি আর আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশি নারী জুয়াড়ির বিস্তারিত তথ্যানুসন্ধান শুরু করেছেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। দু’জনই ভালো জুয়াড়ি, ভিআইপি। নারী জুয়াড়ি আসেন আমেরিকা থেকে সরাসরি। লাসভ্যাগাস ও এমজিএমএ-এ খেলেন তিনি। সিঙ্গাপুরে খেলেন আমেরিকান ক্যাসিনো মেরিনা বে সেন্ডস বা এমবিএস এর পাইজা রুমে। পাইজা ডায়মন্ড মেম্বার তিনি। আর টাঙ্গাইলের শিল্পপতি বেশিরভাগ সময় নিচতলার মেইন ফ্লোরে খেলেন। তিনি গোল্ড কার্ডধারী। এমবিএস-এর তৃতীয় তলায় পাইজা রুমসংলগ্ন বিশেষায়িত রুবি রুমেও তার প্রবেশাধিকার রয়েছে। কিন্তু দলবল নিয়ে নিচতলায় সাধারণ জুয়াড়িদের সঙ্গে হৈ-হুল্লুড় করে খেলতে বেশি পছন্দ তার। রুলেট, ব্যাংকার প্লেয়ার আর রয়েল ফ্লাশ খেলেন তিনি। এমবিএস ক্যসিনোতে নিয়মিত যাতায়াতকারী বাংলাদেশি শ্রমিক এবং সাধারণ জুয়াড়িদের কাছে ঢাকা থেকে যাওয়া ওই শিল্পপতি জুয়াড়ি বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার পাত্র। কারণ শ্রমিক বা সাধারণ জুয়াড়িরা খেলেন শ’ শ’ টাকা, আর বাংলাদেশি ওই ব্যবসায়ী জুয়াড়ির খেলা শুরুই করেন হাজার ডলার দিয়ে। জিতেন বা হারেন রাত অবধি খেলেন। বড় জয় পেলে বাংলাদেশি শ্রমিক এবং সাধারণ জুয়াড়িদের নিয়ে সেটি উদযাপন করেন। বড় দান জিতলে অর্থ বিলান সাধারণের মাঝে। এমবিএস- এ বাংলাদেশি সাধারণ শ্রমিক জুয়াড়ির সংখ্যা হবে ৭-৮ শতাংশ। এর মধ্যে বড় অংশ সূচনাতেই আউট হয়ে যায়। তখন তারা ভালো খেলোয়াড়দের খেলা দেখতে টেবিল টু টেবিল ঘোরে। সেই সুবাধে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বড় জুয়াড়ি যারা নিচতলার মেইন ফ্লোর এবং নন স্মোকিং জোনের জুয়াড়িদের টেবিলগুলোতে খেলেন তাদের খেলা দেখেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানিতে উঠে আসে পরিচিত বাংলাদেশি ক্যাসিনো ডন এবং এখনো নাম প্রকাশ না হওয়া বাংলাদেশি রাজনীতিবিদদের যারা এমবিএস-এ নিয়মিত খেলেন, তাদের আচার-আচরণ এবং মুড দেখানো কিংবা সাধারণের সঙ্গে জয় উদযাপনের নানা ঘটনা।
হেরে ক্যাসিনোতেই অসুস্থ হয়ে পড়া এক তরুণ রাজনীতিককে এখনো স্মরণ করেন সাধারণ জুয়াড়িরা। ওই রাজনীতিক কাম এমপি অসুস্থ হওয়ার আগে নিয়মিত বে-এলাকার প্যান-প্যাসিফিকে থাকতেন। পাঁচ তারকা মানের ওই হোটেলে এখনো ওঠেন তিনি। মাঝেমধ্যে ঢুঁ মারেন মেরিনায়। বাংলাদেশি যারা তার চিকিৎসাকালে খবর নিয়েছিলেন তাদের খোঁজ নেন। সাধারণ জুয়াড়িদের কাছে তার আচরণেরও প্রশংসা শোনা যায়। সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশ মিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ওই এমপির অসুস্থতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা চিকিৎসার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও তারা বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। প্রটোকল জনিত কারণে কর্মকর্তারাও জুয়াড়ি এমপিদের নানা ঘটনার নীরব সাক্ষী। তবে তাদের মুখ খোলা বারণ।

ভাগ