সক্ষমতা বাড়াতে মোংলা বন্দরে ৬ হাজার কোটি টাকার আধুনিকায়ন প্রকল্প

মোংলা সংবাদদাতা ॥ আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা দ্বিগুণ করতে চায় সরকার। এ জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এতে বছরে ১২ কোটি টাকা আয় বাড়বে। জার্মানি থেকে এরই মধ্যে অত্যাধুনিক মোবাইল হারবার ক্রেন এনে চালু করা হয়েছে। এছাড়া বন্দরের জেটি সম্প্রসারণসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সক্ষমতা বাড়াতে ছয় হাজার কোটি টাকার সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্প’ হাতে নেওয়া হয়েছে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মোজাম্মেল হক এসব তথ্য জানিয়েছেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন সূত্র জানায়, ১৯৫০ সালে চালু হওয়া আন্তর্জাতিক এ সমুদ্র বন্দরটি ২০০১ সাল থেকে লোকসানে পড়ে মৃতপ্রায় বন্দরে পরিণত হয়েছিল। দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীরাও তখন এ বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ২০০৭ সাল পর্যন্ত চলে এ অবস্থা। গোড়ার দিকে বেশ কর্মচঞ্চল ছিল বন্দরটি। সে সময় নোঙর করা সারি সারি জাহাজের আলোর ঝলকানিতে রাতের পশুর নদীর দৃশ্য হয়ে ওঠে নয়নাভিরাম। পরে সেখানে নেমে আসে অন্ধকার। সেই অন্ধকার থেকে আবার আলোর জগতে ফিরেছে এ বন্দর। দিনের পর দিন জাহাজশূন্য থাকা পশুর নদীতে এখন ৭০ থেকে ৮০টি জাহাজের অবস্থান।
এ বিষয়ে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালু হলে মোংলা হবে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র। তাই এর আগেই নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে নিতে চাই আমরা। বন্দরের নাব্য ঠিক রাখতে আমরা আউটারবারে ড্রেজিং করবো। সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এই মুহূর্তে অনেকগুলো প্রকল্প চলমান রয়েছে। সমুদ্র থেকে বন্দর পর্যন্ত ১৪৫ কিলোমিটার পশুর নদীতে ড্রেজিং প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ড্রেজিং সম্পন্ন হলে নয় থেকে ১০ মিটার গভীরতার জাহাজ এ বন্দরে অনায়াসেই ঢুকতে পারবে। আউটারবারের ড্রেজিং প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।’ অনুমোদন হওয়ামাত্র আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে এর কাজ শুরু হবে বলেও জানান তিনি। বন্দরের চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘শুধু ড্রেজিং করলেই হবে না। বন্দরের ভেতরের অবকাঠামো আরও উন্নত করতে হবে। বন্দরের জেটি, ক্রেন, জেটি ইয়ার্ড ও রাস্তাঘাটের বেশ কিছু দুর্বলতা আছে। সেগুলো ঠিক করতে বড় বড় প্রকল্পের অনুমোদন হয়ে আছে। মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পসহ চারটি বড় প্রকল্প এ বছরের ডিসেম্বরে অনুমোদন পাবে। এর মধ্যে আছে দুটি জেটি, গ্যান্টি ক্রেন, ইয়ার্ড, মাল্টি পারপাস গাড়ির ইয়ার্ড, বন্দর ভবন সম্প্রসারণ, অফিসার স্টাফদের জন্য বাসভবন, মাল্টি কমপ্লেক্স, শিপইয়ার্ড ও ফ্লাইওভারসহ বেশ কিছু প্রকল্প। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এ বন্দর চার কিলোমিটার সম্প্রসারিত হবে। যা বর্তমানে আছে এক কিলোমিটার।’ আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে বলে বন্দরের চেয়ারম্যান জানান।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) মো. মোস্তফা কামাল জানান, গত অর্থবছরে এ বন্দরে সব মিলে ৯১২টি জাহাজ ভিড়েছে। কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে এক কোটি ১৩ লাখ মেট্রিক টনের মতো। আর কন্টেইনার আনা-নেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৮ হাজার টিউজ (২০ ফিট সমকক্ষ কন্টেইনার)। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি এসেছে পাথর, সার ও কয়লা পণ্য। এ ছাড়া গাড়ি, মেশিনারিজ ও ক্লিংকারও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। মোংলা বন্দরের ব্যবসায়ী এবং বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন মো. রফিকুল ইসলাম বলেন,‘জার্মান থেকে আনা মোবাইল হারবার ক্রেনের কারণে তারা উপকৃত হচ্ছেন। এখন কন্টেইনার ভ্যাসেল থেকে পণ্য আনলোড করতে পারছেন তারা। কিন্তু তার সঙ্গে প্রাইম ওভার, মুভমেন্ট করার জন্য ফরক্লিব না থাকার কারণে একটু অসুবিধা হচ্ছে। বিদেশ থেকে যে কন্টেইনারগুলো আসছে তা চাহিদা অনুযায়ী শিপমেন্ট করার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। কন্টেইনার ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থাও বাড়ানো দরকার। বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে এই মুহূর্তে আউটারবারের ড্রেজিং করানো দরকার। দীর্ঘদিন ধরে এই ড্রেজিং ঝুলে আছে।’ সাত কিলোমিটার নটিক্যাল মাইল আউটারবারে ড্রেজিং না হওয়ায় ১০ মিটার গভীরের জাহাজ এ বন্দরে প্রবেশ করাতে পারছেন না বলেও ক্যাপ্টেন রফিক জানান। এ বন্দরের ব্যবসায়ী হোসাইন মোহাম্মদ দুলাল ও বদিউজ্জামান টিটু জানান, ড্রেজিং এ বন্দরের বড় সমস্যা। ড্রেজিং না হওয়ায় বড় কোনও জাহাজই এ বন্দরে ঢুকাতে পারছেন না তারা। বন্দরের বহির্নোঙরে (আউটারবার) বিদেশি বড় জাহাজ অবস্থান করিয়ে সেখান থেকে ছোট লাইটারেজে করে পণ্য খালাস করতে হয়। এটি মারাত্মক ঝুঁকি ও ঝামেলার কাজ। ড্রেজিং না হওয়ায় নাব্য সংকটের কারণে জাহাজগুলো ওপরে আসতে পারে না।

ভাগ