সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং গণতন্ত্র

ইকতেদার আহমেদ
সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সংসদের মোট আসন সংখ্যার অর্ধেকের অধিক আসন লাভকারী দল সরকার পরিচালনার সুযোগ লাভ করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংসদ সদস্যরা দু’ভাবে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। এর একটি হলো- একটি নির্বাচনী এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মধ্যে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীর বিজয়ী হওয়া; অপরটি হলো আনুপাতিক ভোট পাওয়ার ভিত্তিতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন। আমাদের দেশের নির্বাচন পদ্ধতিতে নির্বাচনী এলাকা থেকে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ও অপরাপর মন্ত্রী সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নিয়োগ লাভ করেন। সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকে। এ ব্যবস্থায় প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী প্রয়োগ করেন।
রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থায় সংসদ ও মন্ত্রিসভা থাকলেও রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি প্রয়োগ করেন। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালনে মন্ত্রিসভার সাহায্য ও পরামর্শ নিয়ে থাকেন এবং মন্ত্রীরা তার সন্তুষ্টি সাপেক্ষে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কোনো কোনো দেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। আবার কোনো কোনো দেশে পরোক্ষভাবে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। তবে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় প্রায় সব দেশে রাষ্ট্রপতি জনগণের পরোক্ষ অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। বিভিন্ন দেশসহ আমাদের দেশে প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার রয়েছে। এ ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি তার চিন্তা, বিবেক ও ব্যক্তিস্বাধীনতায় তাড়িত হন। ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির ওপর বলপ্রয়োগ বা তাকে অন্যায়ভাবে বশীভূত করা দেশের প্রচলিত আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত।
১৯৭২ সালে আমাদের সংবিধান প্রণয়নের সময় রাজনৈতিক দল থেকে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া সম্পর্কিত ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা ছিল- কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি যদি এ দল থেকে পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে, তবে তিনি সে কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন না। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী মাধ্যমে ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যাখ্যা সংযোজন করে পূর্বের অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ব্যাখ্যায় বলা হয়- যদি কোনো সংসদ সদস্য, যে দল তাকে নির্বাচনে প্রার্থীরূপে মনোনীত করেছেন, সে দলের নির্দেশ অমান্য করে সংসদে উপস্থিত থেকে ভোটদানে বিরত থাকেন, অথবা সংসদের কোনো বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন, তিনি ওই দলের বিপক্ষে ভোটদান করেছেন বলে গণ্য হবে। অতঃপর সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর দিয়ে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ ও এর ব্যাখ্যা অক্ষুণ্ন রেখে অনুচ্ছেদটিতে দফা (২) ও (৩) সংযোজন করা হয়।
দফা (২)-এ বলা হয়- যদি কোনো সময় কোনো রাজনৈতিক দলের সংসদীয় দলের নেতৃত্ব সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন ওঠে তাহলে সংসদে সে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতৃত্বের দাবিদার কোনো সদস্য কর্তৃক লিখিতভাবে অবহিত হওয়ার সাত দিনের মধ্যে স্পিকার সংসদের কার্যপ্রণালির বিধি অনুযায়ী ওই দলের সব সংসদ সদস্যের সভা আহ্বান করে বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের দ্বারা উক্ত দলের সংসদীয় নেতৃত্ব নির্ধারণ করবেন এবং সংসদে ভোটদানের ব্যাপারে অনুরূপ নির্ধারিত নেতৃত্বের নির্দেশ যদি কোনো সদস্য অমান্য করেন তাহলে তিনি (১) দফার অধীন ওই দলের বিপক্ষে ভোটদান করেছেন বলে গণ্য হবে এবং সংসদে তার আসন শূন্য হবে। দফা (৩)-এ বলা হয়- যদি কোনো ব্যক্তি নির্দলীয় প্রার্থীরূপে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কোনো রাজনৈতিক দলে যোগদান করেন, তাহলে তিনি এ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে উক্ত দলের মনোনীত প্রার্থীরূপে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বলে গণ্য হবে।
সর্বশেষ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ নম্বর ৭০-এর বিধান ৭২’র সংবিধানে যে রূপ ছিল সে রূপ ফিরিয়ে এনে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ব্যাখ্যা এং দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত দফা (২) ও (৩) বিয়োজন করা হয়। সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদ মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত। তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক আইন বাতিল হবে। অনুচ্ছেদ নম্বর ৭০ অবলোকনে প্রতীয়মান হয় এ অনুচ্ছেদটির মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের মুক্ত চিন্তা, বিবেক ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার হরণ করা হয়েছে যা দৃশ্যত অনুচ্ছেদ নম্বর ৩৯-এর সাথে সাংঘর্ষিক। অনুচ্ছেদ নম্বর ৩৯-এর যতটুকু অনুচ্ছেদ নম্বর ৭০-এর সাথে সাংঘর্ষিক তা হলো- ওই অনুচ্ছেদে বিবৃত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংগঠনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে নাগরিকের চিন্তা, বিবেক, বাক ও ভাব প্রকাশের অধিকারের যে নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে তার হরণ।
অনুচ্ছেদ নম্বর ৭০-এর বর্তমান বিধান অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য নির্বাচন-পরবর্তী যে দল হতে নির্বাচিত হয়েছেন সে দল হতে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোটদান করলে তার সদস্য পদ শূন্য হবে। সদস্য পদ শূন্য হওয়া সংক্রান্ত দু’টি কারণের প্রথমোক্তটি দল থেকে পদত্যাগ করলে সংসদ সদস্য পদ হারানো যৌক্তিক বিবেচনা করা যায় এ কারণে যে, জনগণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভোটাধিকার প্রয়োগের সময় আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে বড় রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে প্রার্থীর চেয়ে দলের প্রতীককে অধিক প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাই দলীয় মনোনয়ন যে বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে সে বিষয়ে কারো মধ্যে কোনো ধরনের সংশয় আছে এমনটি দেখা যায় না। তা ছাড়া বড় দলের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করার জন্য দল থেকে সব সময় সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে এ সহযোগিতা এত বিস্তৃত যে নির্বাচনী সাকুল্য ব্যয় দল বা দলের শুভানুধ্যায়ীরা বহন করে। সে বিবেচনায় দলীয় একজন প্রার্থীকে নির্বাচনে বিজয়ী করার ব্যাপারে দলের যে অনন্য অবদান থাকে তা যদি নির্বাচন-পরবর্তী একজন প্রার্থী অস্বীকার করে দল থেকে পদত্যাগ করে সে পদত্যাগ দলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। এ ক্ষেত্রে সদস্য পদ হারানোর বিধানকে অগণতান্ত্রিক বলার সুযোগ খুবই সীমিত। কিন্তু একজন প্রার্থী নির্বাচন পরবর্তী সংসদীয় দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সদস্য পদ শূন্য হওয়া গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি ও বিধি-বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না সে প্রশ্নটি সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদে এ বিধানটি অন্তর্ভুক্তকরণ পরবর্তী সব সময়ই উত্থাপিত হয়ে আসছে। একজন ব্যক্তি যখন তার ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে একজন প্রার্থীকে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে থাকে, তখন তার এ ভূমিকা তার জন্য ক্ষুদ্র পরিসরে গণতন্ত্রের চর্চা হলেও নির্বাচিত ব্যক্তির জন্য বৃহৎ পরিসরে দায়িত্ব পালনের দুয়ার উন্মুক্ত করে।
সংসদের মূল কাজ আইন প্রণয়ন করা হলেও সে আইন জনমুখী ও মানুষের জন্য কল্যাণকর কি না, তা ভেবে দেখেই একজন সংসদ সদস্যকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় তিনি আইনের পক্ষে না বিপক্ষে ভোট দেবেন। তা ছাড়া একজন সংসদ সদস্য নির্বাচন-পরবর্তী তার সমগ্র নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। এ ক্ষেত্রে কে তাকে ভোট দিয়েছে এবং কে দেয়নি তা অপ্রাসঙ্গিক। সংসদে আইন প্রণয়ন ছাড়াও একটি এলাকার সমস্যা ও দুঃখ-দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়। সমগ্র নির্বাচনী এলাকাবাসীর পক্ষে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এ দায়িত্বটি পালন করে থাকেন। অনেকসময় দেখা যায় এমন দু’-একটি আইন যা চিন্তা, বিবেক ও ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী কিন্তু একজন সংসদ সদস্য তা অনুধাবন করার পরও আইনটি প্রণয়ন বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুকূলে থাকায় সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতার কারণে তার নিজস্ব অবস্থান প্রতিকূলে হলেও সংসদে সদস্য পদ হারানোর ভয়ে সে বিষয়ে তার পক্ষে নিজস্ব চিন্তা, বিবেক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রয়োগের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। অনুরূপভাবে অনেকসময় দেখা যায় এমন অনেক প্রকল্প, যা দেশ ও জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নয় কিন্তু প্রকল্পটি গ্রহণ দলীয় স্বার্থের অনুকূলে হলে একজন সংসদ সদস্যের চিন্তা, বিবেক ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সাথে তা পরিপন্থী হলেও এ ক্ষেত্রে তার করায় কিছু থাকে না।
দেশের সচেতন জনগোষ্ঠী যাদের ভোটাধিকারের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তাদের প্রশ্ন- ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা যেমন নিজস্ব চিন্তা, বিবেক ও ব্যক্তিস্বাধীনতায় তাড়িত হন সে বিবেচনায় তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সংসদে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিজস্ব চিন্তা, বিবেক ও ব্যক্তিস্বাধীনতায় কেন তাড়িত হবেন না? সংসদ সদস্যদের এ অধিকার হরণ মুক্তচিন্তা, বিবেক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা, যা গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত তার সাথে সাংঘর্ষিক। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এ ধরনের সাংঘর্ষিকতা গণতন্ত্র বিকাশে সহায়ক নয়। এ ব্যবস্থা গণতন্ত্রের সাথে শুধু সাংঘর্ষিকই নয় বরং গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে স্বৈরতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রশ্রয় দেয়। তাই গণতন্ত্রের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে হলে চিন্তা, বিবেক ও ব্যক্তিস্বাধীনতার হরণ নয় লালনই কাম্য।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

ভাগ