সংঘাত-সংঘর্ষ : ইসির প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রচারনার শুরুতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সহিংসতায় হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারনায় নামার সঙ্গে সঙ্গে সরকারী দলের কর্র্মীদের হামলার শিকার হচ্ছেন। প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর প্রচারনায় নামার প্রথমদিনে গত সোমবার সারাদেশে বিরোধিদলীয় নেতাকর্মীদের উপর হামলায় অন্তত ৭৭ জন আহত হওয়ার ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও প্রধান নির্বাচন কমিশানার সাফাই গেয়ে বলেছেন কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। গত মঙ্গলবার মির্জা ফখরুল, ব্যারিস্টার মওদুদসহ বিএনপির শীর্ষ নেতা এবং ধানের শীষের প্রার্থীরা সরকারদলীয় ক্যাডারদের হামলার শিকার হয়েছেন। মঙ্গলবার দেশের ১৮ জেলায় নির্বাচনী প্রচারনার মাঠে হামলা-সংঘর্ষে দু’ শতাধিক মানুষ হতাহত হয়েছে বলে জানা যায়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই বিএনপি নেতাকর্মীদের উপর সশস্ত্র হামলা ও পুলিশি ধরপাকড়ের ঘটনা ঘটলেও কোথাও কোথাও বিএনপি কর্মীদের প্রতিরোধেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। নোয়াখালী ও ফরিদপুরে সহিংসতায় নিহত দুইজন যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ কর্মী বলে জানা গেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটে যাওয়া আগ্রাসী ঘটনাগুলোর চিত্র ও তথ্য গণমাধ্যমে উঠে আসার আগেই সংঘাত-সহিংসতার ঘটনার ছবি ও ভিডিও ক্লিপিংস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও সিইসি’র এমন সাফাই গাওয়াকে কী বলা যায়? নির্বাচনে সবার সমান সুযোগ ও প্রার্থী-সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবচে বড় চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্ব। তারা এই দায়িত্ব পালনে শুধু ব্যর্থই হচ্ছে না, উপরন্তু বাস্তব ঘটনাগুলো অস্বীকার করে প্রকারান্তরে পক্ষপাতিত্ব করছে। ইসি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বহীন ও পক্ষপাতদুষ্ট ভ‚মিকার পরিবর্তন না হলে চলমান বাস্তবতায় সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অসম্ভব।
নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রচারনায় নেমে গত তিনদিনে বিএনপি’র বেশ কয়েকজন প্রবীণ নেতা ও হেভিওয়েট প্রার্থী গাড়িবহরে হামলা ও ভাঙ্গচুরের শিকার হয়েছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়ীবহরে হামলার ঘটনায় ইসি বিব্রত বলে জানিয়েছেন সিইসি। প্রথমে কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা, অত:পর বিব্রতবোধ করলেও প্রার্থীদের নিরাপত্তা এবং প্রচার-প্রচারনার সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে ইসির কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহনের শুরুতেই বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের তরফ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দলবাজ কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার দাবী জানানো হয়েছিল। তফসিল ঘোষনার পর গায়েবি মামলায় ধরপাকড় বন্ধ রাখার একটি প্রতিশ্রæতিও সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছিল। বাস্তবে উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে । নতুন নতুন গায়েবি মামলা দেয়ার পাশাপাশি পুরনো মামলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচনী গণসংযোগকালে ঢাকায় মির্জা আব্বাস এবং আফরোজার আব্বাসের নেতাকর্মীরা ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছেন বলে তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। এর আগে মুন্সিগঞ্জে প্রবীন বিএনপি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের গাড়ী বহর আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। দলীয় সরকারের অধীনে পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দলবাজ সদস্যদের বেপরোয়া ভ’মিকার মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচনী মাঠে নামা বিএনপি নেতাকর্মীদের উপর একদিকে সরকারী দলের কর্মীদের বেপরোয়া হামলা অন্যদিকে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়া যায় না। এএফপির মত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও বাংলাদেশে ব্যাপক ধরপাকড়ের মধ্যেও নির্বাচনী প্রচারণার খবর দিয়েছে। বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন একপাক্ষিক ও অংশগ্রহণহীন হওয়ায় দেশে ও সারাবিশ্বে সমালোচনার ঝড় উঠায় এবারের একাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ, অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার প্রত্যাশা সর্ব মহলের। ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীও আর কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন চান না বলে বিভিন্ন সময় বলেছেন। তবে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে সংসদ ভেঙ্গে দেয়াসহ কোনো দাবীই মানা হয়নি। এমনকি বিএনপি নেতাকর্মীদের ধরপাকড় না করার মৌখিক প্রতিশ্রæতিও রক্ষা করা হয়নি। এখন বিএনপি নেতাকর্মীরা নিজেদের বাড়িঘরে থাকতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন এলাকার ধানের শীষের প্রার্থীরা। কোন অভিযোগেই ইসি ও প্রশাসন সাড়া দিচ্ছে না বলেও তারা অভিযোগ করেছেন। নির্বাচনের এই উত্তুঙ্গ সময়ে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে জেলখানা ও আদালতে আসাযাওয়া করেই পার করতে হচ্ছে। এহেন বাস্তবতা কোনভাবেই একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অনুকুল নয়। ক্ষমতাসীন সরকার, সরকারীদল এর দায় এড়াতে পারে না। তবে সবচেয়ে বড় দায়-দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনের জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনকে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভ‚মিকা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। শুরু থেকেই এ ব্যাপারে ইসির ভ‚মিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। দির যত যাচ্ছে ইসির পক্ষপাতিত্ব ততই সকলে নজরে আসছে। বেগম খালেদা জিয়াসহ তিনজন বিএনপি নেতার প্রার্থীতা নিয়ে ইসির আপীল করার ঘটনা এ প্রনঙ্গে উল্লেখ করা যায়। যেনতেন প্রকারে আরেকটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে ভাবতে হবে। দেশের মানুষ তাদের ভোটের অধিকার চায়, ক্ষমতার জোরে একপক্ষকে মাঠ থেকে বিদায় করে দিয়ে কোন বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়। এখনো সময় আছে, নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত ভুমিকা পরিহার করে ন্যায়সঙ্গত ভ‚মিকা পালন করতে হবে।

ভাগ