সংকটে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন

খুলনা অঞ্চলের ২৫ উপজেলায় চলতি মৌসুমে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে এপ্রিল ও মে মাসে অনাবৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা বেশি থাকায় বাগদা চিংড়িতে মোড়ক দেখা দেয়ায় এ অবস্থার সৃস্টি হয়েছে। পাশাপাশি হিমায়িত খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সিন্ডিকেট করায় চাষী ও ডিপো মালিকরা গত মৌসুমের চেয়ে এবার দামও কম পাচ্ছে। জেলার অধিকাংশ খামারীদের বাগদা আবাদে লোকসান গুণতে হচ্ছে। উপকূলবর্তী এলাকায় মার্চ মাস থেকে খামারগুলোতে চিংড়ি পোনা সরবরাহ করা হয়। গ্রীষ্ম মৌসুমে এ অঞ্চলে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। অতিরিক্ত তাপের কারণে প্রথম দিকে খামারে রোগবালাই দেখা দেয়। চিংড়ি চাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত ও ঋণী হয়ে পড়েন।
খুলনার দাকোপ উপজেলার পাঠচালনা গ্রামের চিংড়ি চাষী আসলাম শেখ জানান, কাঙ্ক্ষিত লোনাপানি না পাওয়ায় চিংড়ি চাষে বিলম্ব হয়েছে। মৌসুমের শুরুতেই দাকোপের তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের চিংড়ি চাষীরা কাঙ্ক্ষিত নোনা পানি পায়নি। তাছাড়া চিংড়ির পোনার মূল্য গতবারের থেকে এবার বেশি। কক্সবাজারের বিভিন্ন হ্যাচারীর উৎপাদিত পোনা প্রকারভেদে প্রতি হাজার সাড়ে ৩০০-৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। স্থানীয় শিবসা ও পশুর নদীতে উৎপাদিত পোনা প্রতি হাজার ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। গেল মৌসুমের তুলনায় এবারে প্রতি হাজার পোনার মূল্য ২০০ টাকা করে বেশি ছিল বলেও জানান তিনি। বাগেরহাট জেলার ফয়লা বাজার ডিপো মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মল্লিক জানান, এখানকার আড়তের ১৫টি দোকানে গেল মৌসুমে প্রতিদিন ৩০ মণ করে চিংড়ি আসত। এবারে আড়তে প্রতিদিন চিংড়ি আসার পরিমাণ গড়ে ২০ মণ। তিনি জানান, ৩০-৩৮ সাইজের প্রতি কেজি চিংড়ি ৪৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গেল মৌসুমে এ সাইজের প্রতি কেজির মূল্য ছিল ৫৫০ টাকা। ১৬-১৮ সাইজের প্রতি কেজির মূল্য এবারে ৯৫০ টাকা। গেল মৌসুমে এ সাইজের চিংড়ির মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা ছিল। তার দেওয়া তথ্য মতে, হিমায়িত খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সিন্ডিকেট করে জুলাই ও আগস্টে কম দামে চিংড়ি কেনে। ফলে চাষী ও ডিপো মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার শ্রীফলতলা গ্রামের চিংড়ি চাষী রুহুল আমিন জানান, সারা মৌসুমই চিংড়ির দাম স্থীতিশীল ছিল না। ২০/২২ সাইজের প্রতি কেজি চিংড়ির মূল্য ৯৫০ টাকা। গতবার এর দাম বেশি ছিল। সেপ্টেম্বর মাসে বৃষ্টির পর খামারের পরিবেশ এখন চিংড়ি চাষের উপযোগী। মৌসুমের শুরুতে রামপাল উপজেলার বাঁশতলি, পেড়িখালী, হুড়কা গ্রামের চিংড়ির খামারে ভাইরাস দেখা দেয় বলেও জানান তিনি। অপরদিকে, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পোড়াকাঠলা, গোয়ারসিং, যতিন্দ্রনগর, পালবাড়িয়া, দুর্গকাঠি গ্রামে সারা মৌসুম ধরে চিংড়ি খামারে তাপমাত্রার হেরফের ঘটে। কখনও অনাবৃষ্টি আবার কখনও অতিবৃষ্টি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চিংড়ি চাষী শ্যামল কুমার বৈরাগী, প্রকাশ চন্দ্র মন্ডল, আবু সাইদ ও প্রভাষ চন্দ্র মন্ডল।
শ্যামনগর উপজেলার হেঞ্চী গ্রামের চিংড়ি চাষী হেমন্ত কুমার মন্ডল জানান, ৯০ বিঘা জমিতে চিংড়ির খামারে উৎপাদন খরচ এবার ১০ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ৮ লাখ টাকা মূল্যের চিংড়ি বিক্রি হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে খরার ত্রাণে পরবর্তিতে জুলাই মাসে অতিবৃষ্টির কারণে প্রথম চালানের দেড় লাখ চিংড়ির পোনা মারা যায়। খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবু ছাইদ জানান, অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির কারণে তাপমাত্রার তারতম্য ঘটায় দাকোপ, বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলায় চিংড়ি খামারে রোগবালাই দেখা দেয়। বটিয়াঘাটা উপজেলার ৬৫টি আধা নিবিড় খামারের মধ্যে ৫টি খামারের চিংড়ি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

ভাগ