শ্রীশ্রী সরস্বতী পূজা আজ

0

স্টাফ রিপোর্টার॥ আজ শনিবার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জ্ঞানালোকের প্রতীক শ্রীশ্রী সরস্বতী পূজা। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথি; যা বসন্ত পঞ্চমী বা শ্রী পঞ্চমী নামে পরিচিত। পুণ্য এ তিথিতে আজ ‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমল লোচনে/বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যংদেহী নমোহস্তুতে’- এ মন্ত্র উচ্চারণ করে বিদ্যা ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্রীশ্রী সরস্বতীকে আরাধনা করবে বাঙালি সনাতন ধর্ম বিশ্বাসী; বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা। বাঙালি সনাতন ধর্মবিশ্বাসীদের মতে, দেবী সরস্বতী সত্য, ন্যায় ও জ্ঞানালোকের প্রতীক। বিদ্যা, বাণী ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী। অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে শ্রদ্ধা, ঋদ্ধি, কলা, মেধা, তুষ্টি, পুষ্টি, প্রভা ও স্মৃতির সফলতার জন্য দেবী চরণে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করবেন ভক্তরা। কল্যাণময়ী দেবীর চরণে বিদ্যা ও জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রণতি জানাবেন তারা।
পঞ্জিকা অনুসারে এবছর পঞ্চমী শুরু হচ্ছে শনিবার সকাল সাতটা ৩৭ মিনিট থেকে রোববার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাতটা ৩৯ মিনিট পর্যন্ত। তবে পুজোর অমৃতযোগ সকাল ১০টা ২৪ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ২৮ পর্যন্ত। শাস্ত্রীয় রিতি মেনে এ সময়ের মধ্যেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন হবে। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন হয়। সরস্বতী পূজা সাধারণ পূজার নিয়মানুসারেই হয়। তবে এই পূজায় আলাদা কিছু সামগ্রী যেমন, অভ্র-আবির, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ ছাড়াও লাগে বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল। এ দিনেই অনেকের শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি দেয়া হয়। সনাতন ধর্মবিশ্বাসীদের বাড়িসহ সারাদেশের সাথে যশোরের বিভিন্ন মন্দিরে এ পূজা অনুষ্ঠিত হবে। করোনাকাল বিবেচনায় বন্ধ থাকায় অন্যান্য বছরের মত এবারও বর্ণাঢ্য আয়োজনে ঢালাওভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, সরকারি সিটি কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, ডা. আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, সরস্বতী মূলত বৈদিক দেবী। বেদে সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সরস শব্দের অর্থ জল। অতএব সরস্বতী শব্দের আদি অর্থ হলো জলবতী অর্থাৎ নদী। সরস্বতী শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থে সরস+বতু আর স্ত্রী লিঙ্গে ‘ঈ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে সরস্বতী। তিনি বিদ্যাদেবী, জ্ঞানদায়িনী, বীণাপাণি, কুলপ্রিয়া, পলাশপ্রিয়া প্রভৃতি নামে অভিহিতা। তার এক হাতে বীণা অন্য হাতে পুস্তক। পুরান মতে, বৃহস্পতি হচ্ছেন জ্ঞানের দেবতা, বৃহস্পতি পতœী সরস্বতীও জ্ঞানের দেবী। সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞের আগুন জ্বেলে সেখানেই ঋষি লাভ করেছিলেন বেদ বা ঋগমন্ত্র। সুতরাং সরস্বতী জ্ঞানের দেবী হিসেবেই পরিচিত হয়েছিলেন এ ধরাতে। কালের বিবর্তনে সরস্বতী তার অন্য বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে কেবল বিদ্যাদেবী অর্থাৎ জ্ঞান ও ললিতকলার দেবীতে পরিণত হলেন। সরস্বতী জ্ঞান, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী। ঋগবেদে তিনি বৈদিক সরস্বতী নদীর অভিন্ন এক রূপ। বর্তমানে দেবী সরস্বতীর বাহন হাঁস। বেদে এবং উপনিষদে হংস শব্দের অর্থ সূর্য। সূর্যে সৃজনী শক্তির বিগ্রহাম্বিতরূপ ব্রহ্মা এবং সূর্যাগ্নির গতিশীল কিরণরূপা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব শক্তি সরস্বতী দেবীর বাহন হয়েছেন হংস বা সূর্য একেবারেই যুক্তিসঙ্গত কারণে। সরস্বতীর এ বাহন সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয় জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে সর্বত্রই তার সমান গতি ঠিক যেমনভাবে জ্ঞানময় পরমাত্মা সব জায়গায় বিদ্যমান। মজার ব্যাপার হলো হংস জল ও দুধের পার্থক্য করতে সক্ষম। জল ও দুধ মিশ্রিত থাকলে হাঁস শুধু সারবস্তু দুধ বা ক্ষীরটুকু গ্রহণ করে আর জল পড়ে থাকে। জ্ঞান সাধনায় হাঁসের এ স্বভাব যথেষ্ঠ তাৎপর্য বহন করে। হাতে বীণা ধারণ করেছেন বলেই সরস্বতীর অপর নাম বীণাপাণি। বীণার সুর মধুর। পূজার্থী বা বিদ্যার্থীর মুখ নিঃসৃত বাক্যও যেন মধুর হয় এবং জীবনও মধুর সংগীতময় হয় এ কারণেই মায়ের হাতে বীণা। লোকাচার অনুসারে ছাত্রছাত্রীরা পূজার আগ পর্যন্ত কুল ফল খেতে পারে না। দেবীকে অঞ্জলি দিয়ে তবেই কুল খায় শিক্ষার্থীরা। পূজার আগের দিন সংযম পালন অর্থাৎ সংযমের দিন মাছ-মাংস পরিহার করে নিরামিষ খাওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে সব মিলে এসব আচার-অনুষ্ঠানেও রয়েছে আনন্দ।

Lab Scan