শেখ জাররাহ এখন দুর্দশার উপত্যকা

0

মো: বজলুর রশীদ
অধিকৃত ফিলিস্তিনের পূর্ব বায়তুল মুকাদ্দাস শহরের শেখ জাররাহ শরণার্থী শিবির এবং অন্যান্য স্থান থেকে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা নিয়ে নির্মমতা চালাচ্ছে ইসরাইল। এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু শেখ জাররাহর কাহিনী খুব কমই প্রচারিত হয়েছে। রাতের আঁধারে শেখ জাররায় ইসরাইলি পুলিশ ও শত শত ইসরাইলি উগ্রবাদী সেটেলার ফিলিস্তিনিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এদের সহায়তা করে বিভিন্ন ইহুদি মৌলবাদী দল যেমন ওজমা ইহুদ পার্টি ও লেহাবা মুভমেন্ট। তারা সেøাগান দেয় ‘আরবরা নিপাত যাক’। এদের আবার উসকে দিচ্ছে ইসরাইলি নেসেট সদস্য ইতামার বেন গুর ও জেরুসালেমের ডেপুটি মেয়র আরিয়া কিং। ইউনাইটেড ইসরাইলি ফ্রন্ট চায়, জেরুসালেম বিশেষ করে পূর্ব জেরুসালেম থেকে ফিলিস্তিনিরা উচ্ছেদ হোক, তাহলে ইহুদিরা সেখানে সংখ্যাগুরু হবে এবং রাজনৈতিক ইস্যুতে পাল্লা ভারী করবে। মগের মুল্লুকের মতো ইসরাইলেও ফিলিস্তিনবিরোধী আইন আছে, যেমন, ‘লিগাল অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যাটারস ল’ যা ১৯৭০ সালে প্রণীত। এই আইনের বলে ইহুদিরা প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনিদের সম্পদ ও জমি লুটে নিচ্ছে। কোনো ইহুদি ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগে অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের আগের কোনো জমি দাবি করে, এই আইনের আওতায় আদালতে মামলা করতে পারে। এই আইনে কোনো ফিলিস্তিনির মামলা করার অধিকার নেই। এভাবে শেখ জাররাহ ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো পর্যায়ক্রমে ইহুদি সেটেলারদের হাতে পড়ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট ইহুদি সেটেলারদের সংগঠনকে শেখ জাররায় ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরের মালিক হওয়ার সুযোগ করে দেয়। আগে যা গায়ের জোরে করা হতো এখন সেখানে আদালতের তকমা লাগিয়ে ‘নির্ভেজাল’ করা হয়েছে। এসব দখলদারিত্বের দায় শুধু ইসরাইলি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর নয়। ফিলিস্তিন নির্মূলের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্লু-প্রিন্ট এর হোতা। ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুসালেম, পশ্চিম তীর ও গাজার অংশ দখল এক মহাপরিকল্পনার অংশ। মানবতাবিরোধী এই অপরাধে ইসরাইলি সরকার জড়িত। নেতানিয়াহু তার ভোট ব্যাঙ্ক কমতির জন্য শেখ জাররার অধিবাসীদের চিহ্নিত করেছেন, তাই ফিলিস্তিনিদের সেখান থেকে তাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি মিডিয়ায় আসছে না। মিডিয়ায় এখন ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে হামাসের রকেট বৃষ্টি থেকে নিরাপত্তার জন্য ইসরাইলি বাহিনী বোমা হামলা চলাচ্ছে। হামাস কেন এত মিসাইল হামলা করছে তার কারণ প্রচার করা হচ্ছে না। বাইডেন বলছেন, ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে।
ইসরাইল সন্ত্রাস করেই বেঁচে রয়েছে। ১৯৪১ থেকে ’৪৮ সাল পর্যন্ত আট বছরে ২৫৯টি সন্ত্রাসী আক্রমণ চালায় ইহুদি সন্ত্রাসীরা। ইরগুন, হাগানা, ইস্টার্ন গ্যাঙ অনবরত আতঙ্ক ছড়ায়। ইরগুন কিং ডেভিডে বিস্ফোরণ ঘটায় ১৯৪৬ সালের ২২ জুলাই। এতে ৯১ জন নিরীহ মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে সাতজন ইহুদিও ছিল। ইরগুনের সদস্যরা আরবদের মতো পোশাক পরে ঘটনা ঘটায়। প্রচারিত হয় যে মৌলবাদী আরবরাই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। মূলত ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে এই আক্রমণ করে ইরগুন। বেগান ওই ঘটনার নেতৃত্ব দেয়, খোদ ব্রিটিশ সরকার তাকে সন্ত্রাসী আখ্যা দেয়, আর তিনি পরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হন, আরো পরে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও পান। আইজ্যাক রবিন, এরিয়েল শ্যারন এরাও এসব সন্ত্রাসী দলের নেতৃত্ব দেয় এবং পরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হন। ফিলিস্তিনিরা একসময় ইসরাইলিদের স্বাগতম জানায়, খাবার দেয়, পানী ও আশ্রয় দেয়। আজ তারাই ইসরাইলিদের গাজায় সুপেয় পানির আধার নষ্ট করেছে, জাতিসঙ্ঘের হিসাব মতে, মাত্র ৪ শতাংশ ফিলিস্তিনি সুপেয় পানি পায়, তারা আশ্রয়হীন, এখন শেখ জাররাহ থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। রমজানের শেষের দিকে আল-আকসা মসজিদে ইসরাইলি সেনারা ঢুকে রাবার বুলেট, স্ট্যান গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাস দিয়ে মুসলমানদের আহত করেছে। তাদের মসজিদ ছেড়ে চলে যেতে আদেশ দিয়েছে, তবুও প্রতি রাতেই মুসলমানরা এসেছে তারাবিহ পড়তে। গত বছর রমজান ও ঈদুল ফিতরের সময়ও মুসল্লিদের ওপর হামলা করা হয়। মসজিদের ভেতর মুসল্লিদের গুলি করে হত্যা করা কোনো নতুন ঘটনা নয়। এবারের আল-আকসার ঘটনায় পাঁচ শতাধিক মুসলমান আহত, ত্রিশের অধিক নিহত, অগণিত গ্রেফতার হয়েছে। এবার রমজানে নামাজ পড়তে না দেয়া ও শেখ জাররা থেকে বিতাড়ন করতে ইসরাইলি পুলিশ নির্মম অভিযান চালায়। ফলে হামাস, ইসলামী জিহাদ প্রতিরোধ গড়ে তোলে ও হামলা করে। এদের সাথে যুক্ত হয় কাসসাম ব্রিগেড ও হিজবুল্লাহ। তুরস্ক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনাই ইসরাইলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। মাহাথির বলেছেন, ‘আজ মুসলমানদের কোনো সালাহউদ্দিন আইয়ুবি নেই’। ফ্রান্স সে দেশে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সমাবেশ বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। জম্মু-কাশ্মিরে বিক্ষোভ মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মিসরের সাথে গাজার ১১ কিলোমিটার এবং ইসরাইলের সাথে ৫১ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ইসরাইল সমস্ত গাজা দাবি করে। এখন যে মরণপণ যুদ্ধ হচ্ছে মিসরের কোনো ভাষ্য নেই। ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বে ইসরাইলের বিপক্ষে বিক্ষোভ হলেও আরব বিশ্ব এখনো সোচ্চার হয়নি।
বর্তমান সামগ্রিক যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধে উগ্রপন্থী ইহুদি জনতা ইসরাইলে ফিলিস্তিনি আরবদের লক্ষ্য করে হামলা করে বাড়িঘর, দোকানপাট ও সম্পত্তি ভাঙচুর ও লুটপাট করছে। পাথর মেরে এক ফিলিস্তিনিকে মেরে ফেলার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অধিকৃত ভূমিতে ইহুদি ও আরবদের মধ্যে পুরো সপ্তাহ ধরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। অধিকৃত বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২০০ স্পটে বিক্ষোভ করছে ফিলিস্তিনিরা, যা ইতঃপূর্বে দেখা যায়নি। প্রায় স্থানে সেটেলার-ফিলিস্তিনি মারপিট হচ্ছে, উভয় দিকে হতাহত হচ্ছে। এখানকার সংঘর্ষকে অনেকে ‘গৃহযুদ্ধ’ বলছে। এমনকি ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট রিভলিন ও লুদের মেয়র ইয়ার রেভিবো বলেছেন, ‘লুদে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে’।
মকামে লুদে রয়েছে খিজির আ: অবস্থানের স্থান, অনেকে বলেন কবর, মসজিদ, গির্জা ও সিন্যাগগ। এখানে প্রধান ফটকে হজরত ঈসা আ: দাজ্জালকে বধ করবেন বলে মুসলমানরা বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বাসের বলে মুসলমানরা বলীয়ান আবার ইহুদিরাও মুসলমানদের এই ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে অবগত ও সজাগ। সালাউদ্দিন আইয়ুবিও লুদে এসেছিলেন, বড় এক মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদ দেখার জন্য সব ধর্মের লোক এখানে আসে। আগে নিয়মিত জামাতে নামাজ পড়া হলেও এখন নামাজ পড়তে দেয়া হয় না। হামাস অনবরত গাজা থেকে মিসাইল হামলা চালিয়েছে। সিরিয়া ও লেবানন থেকেও মিসাইল হামলা চালানো হয়েছে। ইসরাইলি সাবমেরিন ধ্বংস করা হয়েছে। মিসাইল বৃষ্টির কারণে ইসরাইলের হাইফা ও গুরেন বিমানবন্দরে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে এবং ইসরাইলের বাণিজ্য ও পর্যটন খাত প্রায় বন্ধ, বিকল্প রুট খুঁজছে ইসরাইল। হামাস বলেছে, তারা পানি ও তেলের লাইন বিছিন্ন করে দেবে। ইসরাইল গাজা সীমান্তে ট্যাঙ্ক, সাজোয়া যান, ভারী কামান ও স্থলবাহিনী মোতায়েন করেছে। নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন গাজায় বোমাবর্ষণের দূরত্বে আনা হয়েছে। এমন সেনা সমাবেশ ইতঃপূর্বে কখনো হয়নি। মনে করা হচ্ছে, এবার গাজাও দখল করে নেবে ইসরাইল। গত ৩ মে থেকে গাজায় বোমাবর্ষণ শুরু হয়েছে। নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ফুল স্কেল ওয়্যার’ যাকে টোটাল ওয়্যার বলা হয় তাই শুরু করা হয়েছে। বাইডেন প্রশাসন ইসরাইলের কাছে ৭৩৫ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি অনুমোদন দিয়েছে, গত বছরও ইসরাইলকে ৫.৪ বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্র হস্তান্তর করা হয়। ১৫ মে নেতানিয়াহু কোনো মধ্যস্থতা মানবেন না বলার পর বাইডেন অস্ত্রবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। বাইডেন ইসরাইলের নিরাপত্তা রক্ষার কথা বলেছেন। ২০০৪ সালের মার্চে বুশ বলেছিলেন, ‘Israel has right to defend itself.’ ২০১৪ সালের জুলাই ওবামা বলেছিলেন, ‘Israel has a right to defend itself’ ২০১৯ সালের মার্চে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘Israel has right to defend itself.’ সবার এক ‘রা’।
মূলত গাজা ভেঙে পড়ার অবস্থায়। অনেক বছর ধরে নানা কৌশল প্রয়োগ করে গাজা ও গাজার অধিবাসীদের নির্জীব করার চেষ্টা করেছে জায়নবাদীরা। ২০১৮ সাল থেকেই সেখানে ইমার্জেন্সি চলছে। হামাসকে কাতার ছাড়া আর কেউ নগদ অর্থ দিচ্ছে না। ইরান অস্ত্র দেয় বলে সর্বমহলে বলা হয়। পরিবার-পরিজনসহ বেঁচে থাকার জন্য অর্থের দরকার। গাজায় ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে অনেক আগে। অনেক সময় ইসরাইলিদের হাত হয়ে বিদেশী অর্থ গাজায় পৌঁছে। স্বাধীনভাবে কোনো দেশের ত্রাণ, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা কোনো টিম সেখানে যেতে পারে না। ওই সময় আরব লিগ, ওআইসি বা মুসলিম দেশগুলোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল। বোমার আঘাতে ইমারত যেভাবে ধসে পড়ে, গাজাও তেমনি ধসে পড়বে যেকোনো সময়। তখন শেখ জাররার মতো গাজা ভূখণ্ডেও ঘরবাড়ি ইহুদিরা দখল করে নেবে। গাজাবাসীর হয়তো ভিক্ষাবৃত্তি করে দিন কাটবে। ইসরাইল দুই বছর ধরে আরেকটি বড় যুদ্ধ বাধানোর ‘ছল’ খুঁজে বেড়াচ্ছে। এখন সেই পরিকল্পনা কাজ করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। গাজা এমনিতেই এক মৃত্যুপুরী। ২০১৯ সালে গাজায় ইসরাইল ৮৬৫ বার বোমা হামলা চালায়। ২০১৮ ও ২০২০ সালও এমন আক্রমণ হয়েছে। পরিবেশগত সমস্যা প্রকট। মরুকরণ, মিঠা পানির লবণাক্ততা, পয়ঃসমস্যার অব্যবস্থাপনা, পানিবাহিত রোগের বিস্তার, ভূমধ্যস্থ পানি দূষিত হওয়া, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, চিকিৎসার অভাব ইত্যাদি এক বিরাট তালিকা। ৩০ শতাংশ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। ৫৩ শতাংশ মহিলা ও ৪৪ শতাংশ শিশু রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। অভুক্ত মানুষগুলো স্বাধিকারের জন্য বিক্ষোভ করছে। আর ইসরাইলি সেনারা তাদের ডাণ্ডাপেটা করছে বছরের পর বছর। এখন গাজাকে নিয়ে কেন এত হইচই, গাজা তো এখন ‘ডেথ বেডে’ শুয়ে আছে। এসব সমস্যা কি আরব লিগ বা ওআইসির বিবৃতি ও দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে সুরাহা হবে? এখন ইসলামী বিশ্ব বলে কিছু নেই। সবাই বিভিন্ন ব্লকে ঢুকে নিজেদের স্বার্থ দেখছে। কেউ সমবেদনা জানাতে চাইলে তাদের উচিত ফিলিস্তিনিদের অস্ত্র সরবরাহ করা। মিসাইল মারা নিয়ে অনেকে খুশিতে লাফালাফি করছে। হাজার হাজার মিসাইল নিক্ষেপ করে চার ইসরাইলি নিহত হয়েছে। অন্য দিকে এই ক’দিনে ১০ হাজার ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি ছাড়া। নিহত হয়েছে তিন শতাধিক। হামাস কী করবে বিশ্বের সেরা ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যানের সামনে? আধুনিক বিমানবাহিনী ও সমুদ্রে নৌবাহিনী মোতায়েনের বিরুদ্ধে? মুসলিম দেশগুলো সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলে এ যাত্রায় গাজা ইসরাইলের অংশ হয়ে যেতে পারে। সত্যিই কিছু করতে হলে তাদের অস্ত্র সহায়তা দেয়া উচিত।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার

Lab Scan