শুধু শোক নয়, বিচারও চাই

রাশেদা রওনক খান
যখন লেখাটি শুরু করেছি ঠিক তখনই জানতে পারলাম নুসরাত মেয়েটি মারা গেছে। যৌন নিপীড়ক সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে বীরের মতো লড়াই করেছে মেয়েটি। ভাবতেই কষ্ট হয় একটা মেয়ে একাই লড়াইটা করে গেলো। আমরা কিছুই করতে পারলাম না। স্যালুট জানাই মেয়েটিকে। আমরা কি লজ্জিত, কুণ্ঠিত, অপমানিতবোধ করছি? নিজেকে একবারও অপরাধী ভাবছি? তোমার মৃত্যুর সংবাদ কি আমাদের কাঁদাচ্ছে? একবার হলেও কি ধিক্কার দিচ্ছে না? জানান দিচ্ছে কতটা নিচে নেমে গেছি আমরা। কতটা বোধশক্তিহীন জাতিতে পরিণত হয়েছি।
কয়েক সপ্তাহ ধরে পত্রিকার পাতা কিংবা ফেসবুক খুললেই স্কুল, কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্ষণ, বলাৎকার কিংবা যৌন নিপীড়নের যে চিত্র দেখতে পাচ্ছি তা কেবল হতাশাজনকই নয়, আতঙ্কেরও জন্ম দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের মনে যতটা আতঙ্ক তৈরি হওয়ার কথা, ততটা হয়নি বলেই মনে হচ্ছে। আমরা হয় উদাসীন হয়ে গেছি, নয়তো প্রচণ্ড স্বার্থপর হয়ে উঠেছি। কোনও ঘটনাতেই আমাদের মনে কোনও দাগ কাটে না। বোধহীন এক সমাজ ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে ধর্ষকের অভয়ারণ্য।
গত কিছুদিনের মধ্যে অনেক যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অনেকক্ষেত্রেই অভিযোগ আসছে মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে। এই ক’দিন আগে জামিয়া রহমানিয়া মাদ্রাসার সুপার আবদুল জব্বার মাহমুদ জিহাদিকে ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অন্য আরেকটি ঘটনায় প্রিন্সিপাল ও তার দুই সহযোগী মিলে তারই মাদ্রাসাছাত্র মনিরকে অপহরণ করে পাশের মসজিদে নিয়ে যায় এবং নির্যাতন করে মেরে ফেলার পর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী মনিরের বাবা সাইদুল হকের কাছে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। ওই অধ্যক্ষ নাকি মসজিদের ইমামতিও করেন। একইসঙ্গে সহযোগী আকরাম তারাবি’র নামাজের ইমামতি করেন। এখন কথা হচ্ছে, এই দুই খুনির পেছনে দাঁড়িয়েই মুসল্লিরা নামাজ পড়ছেন বা পড়বেন। হুজুর তো– খুনি হোক আর নিপীড়ক হোক কিংবা ধর্ষক– আমরা অনেকেই তো তাদের পথপ্রদর্শক মনে করি।
যাই হোক, আজকের লেখাটি মূলত মাদ্রাসাছাত্রী রাফির মৃত্যুকে ঘিরে। আগুনের সঙ্গে লড়াই করতে প্রস্তুত ছিল মেয়েটি, করেছেও। শরীরের আগুন ও সমাজের আগুন উভয়ের সঙ্গে লড়াই। এই ঘুণে ধরা সমাজের বিরুদ্ধে বীরের মতো লড়াই করে মারা গেলো, কিন্তু হারিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের। লড়াকু মেয়েটি যখন হাসপাতালের বিছানায় লড়াই করছে মৃত্যুর সঙ্গে, তখন তার নিপীড়ককে বাঁচাতে একটি মিছিল বের হলো। নিপীড়কের পক্ষে মিছিলের ছবি দেখে আমরা যেন বিস্মিত হলাম। ফেসবুকে ঘুরছে হিজাব পরা নারীদের সেই মিছিলের ছবি। এই ছবি আমাদের জানান দেয় অনেক কিছু…
মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নুসরাত রাফিকে পুড়িয়ে দিলো তারই শিক্ষক ‘হুজুর’, অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। যাকে মেয়েটির সম্মান করার কথা বাবার মতো, শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা প্রতি মুহূর্তে, তার প্রতিটি আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার কথা, সেই ছাত্রী কি না তার বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে কথা বলেছে? মামলা করেছে? কত বড় আস্পর্ধা? মনে পড়ছে লালশালুর মজিদের কথা, কীভাবে ধর্মের টুপি পরে মানুষের ধর্মবিশ্বাস, ঐশীশক্তির প্রতি ভক্তি ও আনুগত্য, ভয় ও শ্রদ্ধা, ইচ্ছা ও বাসনা-সবই নিয়ন্ত্রণ করতে চাইত। আর এসবের বিপরীতে এত বড় আস্পর্ধা রাফি কেন দেখালো? আগুন লাগানোর আগেও তার ওপর চলেছে নির্যাতন, হুমকি-ধামকি। এমনকি আগুন লাগানোর আগেই দূরে সরে গেছে তার বন্ধুরা, সরে গেছে তার ক্লাসের সহপাঠীরা, সরে গেছে তার প্রাণপ্রিয় বান্ধবীরা। তাইতো ওর আবেগঘন চিঠিতে আমরা দেখতে পাই বান্ধবীদের প্রতি সত্যের পাশে দাঁড়ানোর আহবান। কিন্তু আমাদের মতোই তার বান্ধবীরা দূরে সরে যায় পাছে ‘বড় হুজুরে’র মনে কষ্ট লাগে, বদদোয়া দেয়, কম নম্বর দেয় কিংবা বড় কোনও বিপদে পড়ে যায় যদি! আমাদের সমাজে তো এমনও ধারণা আছে, শিক্ষক বা হুজুর গায়ে হাত দিলে সেই অংশ বেহেশতে যাবে-এরকম ভাবনার মানুষও কম নেই আমাদের সমাজে। সেই ভাবনাকে পুঁজি করেই সমাজে ধর্ম ব্যবসা করে চলে লালশালুর মজিদ কিংবা সোনাগাজীর অধ্যক্ষ সিরাজেরা। কিন্তু ধর্মও ব্যবসা করেই তো তারা ক্ষান্ত হয় না, প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেকের ভেতরে যৌন আকাঙ্ক্ষাও বাড়তে থাকে, পেতে চায় জমিলারূপী রাফিদের।
আমাদের মনোজগতে মজিদেরা কিংবা সিরাজরা মহামানব, তারা কোনও অশুভ কাজ করতেই পারে না। নুসরাত রাফি মরে গিয়েও প্রমাণ করতে পারবে না– এরা খারাপ, ভণ্ড, চরিত্রহীন। এই সিরাজ-উদ-দৌলার জন্য নারীরা হিজাব পরে মিছিল করতে রাজপথে নেমে আসে, যে রাজপথ হয়তো তাদের জন্য অনেকটাই অপরিচিত। এই মিছিলটি কে বা কারা এতটা সংঘটিতভাবে রাজপথে নামিয়েছে? কে বা কারা ব্যানার তৈরি করেছে? কারা উদ্যোগ নিয়েছে? কে বা কারা প্রতিটি নারীর কাছে গিয়ে মিছিলের ডাক দিয়েছে? হয়তো তাদের কাছে গিয়ে গিয়ে বলেছে, যেভাবেই হোক, অধ্যক্ষকে মুক্ত করতে হবে। তা না হলে আমাদের ধর্ম বাঁচবে না,আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে। এসব অসৎ লোক এবং তার সহচরদের ধর্মকে কখন কীভাবে কোথায় বিক্রি করতে হয়, তা খুব ভালো জানা। তারা হয়তো বলেছে, ‘এই মেয়ে বেয়াদব, হুজুরের বিরুদ্ধে কথা বলেছে’, ‘সে জাহান্নামের আগুনে পুড়ছে এখন’ । ‘বড়হুজুরের বদদোয়া লেগে গেছে। এখন হুজুরকে আমাদের বাঁচাতে হবে। তাই আমাদের নামতে হবে রাজপথে, বড়হুজুর যেভাবেই হোক পবিত্র বানাতে হবে’। সেই হিজাব পরা নারীরা ‘হুজুরের’
পক্ষে নেমেছে। হুজুর মুক্ত হয়ে তাদের জন্য দোয়া করবেন। সেটাই স্বাভাবিক ভাবনা তাদের জন্য। শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষা পাঠ্যক্রম, সমাজ-সংসার-পরিবার তাদের এই শিক্ষা দিয়েই বড় করেছে, এর বাইরের পৃথিবী দেখার তাদের সাহস কিংবা শক্তি কোথায়? ধর্মের রাজনীতি হতে মুক্ত হতে হলে যে শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষা পরিবেশ, সামাজিক-পারিবারিক পরিবেশ দরকার তা তাদের মেলেনি। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা! আমাদের কথা! আমরা কি করছি? আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা কী করছে? হিজাব পরিহিত নারীদের মিছিলের ছবি দেখে আমরা প্রগতিশীল মানুষেরা যেন থমকে গেছি, প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে ফেসবুকে বাকযুদ্ধ করছি। কিন্তু কেন? এতটা অবাক হওয়ার কী আছে? আমরা কি খুব বেশি দূরে দাঁড়িয়ে আছি সেই মিছিল থেকে? হয়তো মিছিলে অংশ নেইনি, কিন্তু এর বেশি নুসরাতের জন্য কী করেছি? আমরা নুসরাতের পুড়ে যাওয়া শ্বাসকষ্টের কথা অনুভব করছি, আমরা নিজেরাও কষ্টে পুড়ে যাচ্ছি,মেয়েটাকে বাঁচানো গেলো না বলে আর্তনাদ করছি, কিন্তু আমাদের এই আর্তনাদ কি ‘বড় হুজুর’কে কঠিন সাজা দেওয়ার জন্য উচ্চারিত কণ্ঠস্বর হয়েছে বা উঠবে কোনোদিন?
আমরা হয়তো মিছিলে যাইনি, কিন্তু এসব অমানবিক পাষণ্ড ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানোর উদ্যোগও তো নেয়নি তেমন জোরালোভাবে। একজন যৌন নিপীড়কের প্রতি তার পরিবারের সদস্য কিংবা সহযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালোবাসার কোনও কমতি হয় না। তাই নিপীড়কের পক্ষেই কেবল দাঁড়ায় না, তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করে পরিবারের সদস্যরা। আপন জুয়েলার্সের মালিক তার ছেলের কুকীর্তির পরও তাকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে চলে, তেমনি প্রতিটি যৌন নিপীড়ক বা ধর্ষকের পরিবারের সদস্য আইনি লড়াই হতে শুরু করে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা পর্যন্ত মানসিক ও শারীরিকভাবে তার সঙ্গে থাকে, তাকে জোর সমর্থন দিয়ে যায়। আমরাও কম কিসের? হয়তো ধর্ষক বা যৌন নিপীড়কের প্রতি আমাদের তেমন শ্রদ্ধা কাজ করে না পরিবারের সদস্যদের মতো কিন্তু ঘৃণা কি জন্মায়? শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করি? আমাদের রাষ্ট্রের অবস্থা আমাদের মেতোই। যদি রাষ্ট্র ধর্ষকের শাস্তি কঠোর করতো, যদি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান করতো, যদি আইন শক্তিশালী হতো, তবে কি এই ধরনের সিরাজরা এতটা সাহস পেতো? চলন্ত বাসে রুপা গণধর্ষণের শিকার হতো? তনু হত্যার বিচার কি আমরা পেয়েছি? খিলগাঁওয়ের স্কুল ঘরে গ্যাং রেপড করেছিল যে ধর্ষকরা, তারা হয়তো মুক্ত আকাশের নিচে আবার মত্ত হবে অন্য কোনও মেয়েকে নিয়ে। রুপা-রিসা-আফসানা-পূজা-তানহার ওপর নির্যাতনের পর ধর্ষকদের কি শাস্তি দিয়েছিলো রাষ্ট্র, যে শাস্তি দেখে এক বখাটে তরুণ কিংবা এক লম্পট মাদ্রাসা শিক্ষক ধর্ষণের আগে ভেবে নেবে তার কি শাস্তি হতে পারে?
ধর্ষণের পর ধর্ষকের পরিণাম ভয়াবহ হবে না, কিন্তু আমরা চাইবো একটি ধর্ষণমুক্ত নারীর জন্য নিরাপদ সমাজ, তাতো হতেই পারে না। আজ যখন আমরা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে পৃথিবীতে রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, তখন নুসরাত, তনু, পূজা-আফসানারা পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে অধিকারহীন নারীর বেদনাবহ প্রতিনিধি। তাই জমিলার থুতু নিক্ষেপের মতো নুসরাতের শেষ আর্জি হয়তো সাময়িকভাবে আমাদের মনে শোক তৈরি করে, আমাদের পুরুষতান্ত্রিক ধর্মীয় ঔপনিবেশিকতাপুষ্ট মন নুসরাতদের শেষ আর্তিতে কষ্ট পায়, শোকাবহ হয়ে ওঠে দেশ, কিন্তু কিছুমাত্র যেন টলে না। মিশে যাই সেই মিছিলেই। নুসরাতরা আগুনে ঝলসে গিয়েও আমাদের ঝলসে উঠতে দেয় না যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে। এমনকি মরে গিয়েও না। আমরা সহানুভূতিশীল, ধর্ষকের পক্ষে মিছিলে যাচ্ছি না, কিন্তু দিনে দিনে যে যৌন নিপীড়নের অভয়রাণ্য তৈরি হচ্ছে তার বিরুদ্ধেও কঠিন কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি না।
আমরা, আমাদের পরিবার, আমাদের সমাজ, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা- সবাই তো এই মিছিলের খুব বেশি দূরে দাঁড়িয়ে নেই, তবে কেন আমাদের এত আহাজারি? কারণ আমরা দিনকে দিন বধির, বোবা ও অন্ধ হয়ে যাচ্ছি। আমাদের নিজেদের তৈরি করা এই অন্ধকারে একদিন নিভু নিভু যে প্রদীপ আছে, সেটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনও দিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন অন্ধকারের মাঝে আমরাও ‘অধ্যক্ষ সিরাজের মুক্তি চাই’ ব্যানার হাতে মিছিলে মিশে যাবো, যাচ্ছিও সম্ভবত!
লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভাগ