শিকারিদের প্রাণীনিধনের হুমকিতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য

0

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা॥ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলজুড়ে ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত সুন্দরবন। রূপ-বৈচিত্র্যে ঘেরা, নানা প্রজাতির বনজ বৃক্ষের সমারোহে সাজানো নয়নাভিরাম এই বনভূমি উপকূলবাসীর প্রাকৃতিক রক্ষাকবজ। গত কয়েক বছরে একের পর এক সুপার সাইক্লোনের আঘাত সয়ে উপকূলের মানুষকে রক্ষা করছে সুন্দরবন। কিন্তু সেই মানুষই এখন এই বন ধ্বংস করছে নিজেদের স্বার্থে। সুন্দরবনের নদী ও খালে অবাধে বিষ দিয়ে মাছ শিকার, নেট জাল দিয়ে মাছের রেণু আহরণের মাধ্যমে ধ্বংস করা হচ্ছে নদীর প্রাণী। চোরা শিকারিদের টার্গেট থেকে বাদ যাচ্ছে না বনের হরিণ ও বাঘও। দিন দিন অস্থিত্ব সঙ্কটের দিকে যাচ্ছে সুন্দরবন। ফারাক্কা বাঁধের কারণে নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ না থাকায় গত দুই দশকে এই বন থেকে হারিয়ে গেছে নানা প্রজাতির পাখি, অগণিত বাহারি পতঙ্গসহ নানা প্রজাতির মাছ ও বন মুরগি।
লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও বনখেকোদের অব্যাহত গাছ কাটার ফলে পশ্চিম সুন্দরবনে এখন আর সুন্দরী গাছের অস্তিত্ব নেই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুন্দরবনে ১৯৮৯ সালে সুন্দরী গাছ ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার হেক্টরে। ২০১৪ সালে তা এসে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৩ হাজার হেক্টর। এছাড়া নদীভাঙনে কমেছে ১৪ হাজার হেক্টর বনভূমি। শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা আলম সরদার বলেন, সুন্দরবনের নদী দিয়ে গেলে দেখা যায়, নদীর পাশে অনেক গাছ। আসলে ভেতরে সব ফাঁকা! বনে এখন আর আগের মতো বড় কোনো গাছ নেই, নদীতে মাছ-কাঁকড়া নেই। বনে হরিণ ও বাঘ কমে গেছে। সম্প্রতি খাবারের অভাবে বাঘের আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। এক কথায় সুন্দরবন ভালো নেই। ভালো নেই সুন্দরবনের পশু ও পাখি। বুড়িগোয়ালীনি এলাকার বাসিন্দা শরীফ বলেন, সুন্দরবনের নদীগুলোতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে সুন্দরীসহ কয়েক প্রজাতির গাছ ও মাছ বিলুপ্ত হয়েছে। বনে খাবার পানির সঙ্কটে হরিণ ও বাঘ। তাছাড়া সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় ঘন জনবসতি। তারা সবাই বননির্ভর। বনে নদীর পাশে কিছু বড় কেওড়া গাছ ছাড়া বড় কোনো গাছ নেই। এদিকে এখন আর সুন্দরী গাছ হয় না। গরান, গোলপাতা খুঁজে পাওয়া যায় গহীন জঙ্গলে। গরান কাটা নিষিদ্ধ তারপরও যারা গোলপাতা কাটতে যায় তারা চুরি করে গাছ কেটে আনে। পশ্চিম সুন্দরবনের কদমতলা এলাকার জেলে মো. গাজী বলেন, সুন্দরবনের নদী ও খালগুলোতে অনেকে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করছে। ফলে সম্প্রতি মাছ কম পাওয়া যাচ্ছে। বিষ দেয়ায় মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীও মারা পড়ছে। বিষ দিয়ে মাছ ধরার পরে ওই খালে আর মাছ আসে না। যে কারণে আমরা এখন মাছ কম পাচ্ছি। নওয়াবেকি এলাকার মাদরাসা শিক্ষক মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানির লবণাক্ততা বেড়েছে। তাপমাত্রাও বেড়েছে। আমাদের এলাকায় আগে প্রচুর মেদ মাছ, কাইন মাছ পাওয়া যেত, এখন এগুলো কম পাওয়া যায়। অনেক প্রজাতির মাছ এখন আর দেখায় যায় না। সুন্দরবনের নদীতে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করায় এসব মাছের প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে। উপকূলীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিডিওর সহ-সভাপতি ওসমান গনি সোহাগ বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় প্রায়ই বাঘের চামড়া, হরিণের মাংস উদ্ধার হয়। চোরা শিকারিরা নিয়মিত এসব প্রাণী শিকার করছে। এমনকি বিরল প্রজাতির পাখি, মাছ, ডলফিনও বাদ যাচ্ছে না। বন বিভাগের হিসাবে, ২০০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৫৪টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে ১৫টি। লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় মানুষ পিটিয়ে হত্যা করেছে ১৪টি, ২০০৭ সালের সিডরে মারা গেছে একটি, বাকি ২৫টি বাঘ হত্যা করেছে চোরাশিকারিরা। চলতি বছর উদ্ধার হয়েছে একটি বাঘের মরদেহ। সম্প্রতি বেড়েছে হরিণ শিকারও। গত ছয় মাসে সুন্দরবনের দুটি রেঞ্জে অভিযান চালিয়ে শতাধিক হরিণের চামড়া, মাংস উদ্ধার করেছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বেসরকারি সংস্থা বারসিকের গবেষক পার্থ সারথি পাল বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। এখানে উদ্ভিদ ও প্রাণী দুটোই সঙ্কটে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা বেড়েছে। নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ নেই। সুন্দরবন থেকে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার, ছোট কাঁকড়া আহরণ করে রীতিমতো জলজ প্রাণী নিধন করা হচ্ছে। আগামী কয়েক বছর পরে নদীতে আর মাছ, কাঁকড়াও পাওয়া যাবে না। বিলুপ্ত হবে নানা প্রাণী। বাঘ হত্যা করা হচ্ছে। হরিণ শিকার করে মাংস বিক্রি করছে চোরাশিকারিরা। পশ্চিম সুন্দরবনে বাঘের পাশাপাশি আশঙ্কাজনকহারে হরিণের সংখ্যা কমেছে।
পশ্চিম সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালীনি ফরেস্ট ক্যাম্পের ইনচার্জ সুলতান আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, বনের মাছ রক্ষায় বেশকিছু নদী ও খাল অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে প্রজননের কারণে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষেধ। ওই এলাকায় সম্প্রতি বিষ দিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে মামলা করা হয়েছে। কিছুদিন আগে অভিযান চালিয়ে হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় শিকারিরা পালিয়ে যায়। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মুহাসিন হাসেন জাগো নিউজকে বলেন, বিষ দিয়ে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমাদের প্রতিটি ক্যাম্প ও স্টেশনের বনরক্ষীদের কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। চোরা শিকারিদের ধরতে বন বিভাগ থেকে আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। বনদস্যু না থাকায় এখন বাঘ শিকারের ঘটনা কমেছে। বনের ভেতরে স্মার্ট টিম নিয়মিত টহল দিচ্ছে। আগের চেয়ে টহল ফাঁড়ির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। জলজ ও বনের প্রাণী রক্ষায় বন বিভাগের নিজস্ব গবেষণা টিম কাজ করছে।

Lab Scan