লবণের দাম বৃদ্ধির প্রভাব যশোরের চামড়া ব্যবসায়ে

0

শিকদার খালিদ ।। একদিকে দরপতন অপরদিকে লবণের দাম বৃদ্ধি নিয়ে সংকটে পড়েছেন যশোরের চামড়া ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থায় আসন্ন কোরবানির ঈদের চামড়া কিনে বিক্রি করতে গিয়ে লাভ করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। অপরদিকে লবণ ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির জন্য দুষছেন কক্সবাজারের সিন্ডিকেটকে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাট। এখানে ছোট-বড় মিলে ৩ শতাধিক চামড়ার আড়ৎ রয়েছে। সারা বছরই এ হাটে চামড়া বেচাকেনা হলেও কোরবানির ঈদের মৌসুমি বাজার ধরতে অপেক্ষায় থাকেন ব্যবসায়ীরা। তবে এবার ঈদের আগেই ব্যবসায়ীদের মাঝে হতাশা নেমেছে। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে চামড়া সংরক্ষণের প্রধান অনুষঙ্গ লবণের দাম।
গত শনিবার রাজারহাটে চামড়া নিয়ে আসা মন্টু বিশ^াস বলেন, ‘আমি ৫০ থেকে ৭০ পিস করে প্রতি হাটে চামড়া নিয়ে আসি। আজ ১০ পিস মাল নিয়ে এসেছি, আমার ¯্রফে দুই হাজার টাকা লস। যে মাল ৫শ টাকা, আজ তার দাম ৩শ টাকা। যে মালের দাম ৮শ টাকা আজকে বেচা কেনা হচ্ছে ৬শ থেকে সাড়ে ৫শ টাকা। আবার লবণের মূল্য এখন সব থেকে বেশি। ১৩শ থেকে ১৪শ টাকা বস্তা লবণ। আমাদের এক একটা চামড়ার পেছনে আমাদের দেড় শ-দুই শ টাকা খরচ হয়। এখন চামড়ার থেকে লবণের দাম বেশি’।
অপর ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ বলেন, ‘চামড়া ভালো রাখতে গেলে লবণ দরকার। চামড়ার অরিজিনাল জীবনই হচ্ছে লবণ। এই লবণ নিয়েই আমরা সংকটে আছি। গত বছর আমরা লবণ কিনেছি ৬ থেকে ৭শ টাকা বস্তা। আর এ বছর ১৪ থেকে ১৫শ টাকা বস্তা। চামড়া নিয়ে আমরা ৭-৮ বছর ধরে সংকটে আছি। এই চামড়া আর লবণের দিকে যদি সরকার একটু তাকায়, তাহলে ব্যবসা কিছুটা ভালো হবে’।
হাটে ছাগলের চামড়া নিয়ে এসে হতাশ নির্মল দাস বললেন, ‘আজকে এই কানে মুড়া দিয়ে যাচ্ছি এই হাটে আর আসবো না। ১৩০ টাকা ৪০ টাকায় যা বেচি, আজকে বেচেছি তা ৭৫টাকায়। ১৩-১৪ (২০১৩-১৪) সালের থেকে কুমতি কুমতি আজকে এই পর্যন্ত এসেছে।’
রাজারহাটের চামড়ার আড়ৎদার হাসানুজ্জামান হাসু বলেন, ৭০ কেজির এক বস্তা লবণ যদি ১৪শ টাকা দিয়ে কিনতে হয় তাহলে এই ব্যবসায় আমাদের খুব সমস্যায় পড়তে হবে। চামড়ার বাজার দিন দিন কমে যাচ্ছে।
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, দিন মজুরদের মূল্য বৃদ্ধি এবং লবণের দাম- সব মিলিয়ে একটা খারাপ অবস্থার মধ্যে আমরা পার করছি। এবারে যে পরিমাণ গরম তার মধ্যে যদি কাচা চামড়া সংরক্ষণ করতে হয়, সেক্ষেত্রে সময় মতো কাচা চামড়ায় লবণ দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের চামড়া কেনার ক্ষমতা নেই। তাই সরকারের কাছে অনুরোধ তাদের জন্য লোনের ব্যবস্থা করা।
তবে যশোরের ব্যবসায়ীরা বলছেন লবণের দাম বৃদ্ধিতে তাদের কোন ভূমিকা নেই। রাজারহাট এলাকার পাইকারি লবণ বিক্রেতা ইমরান হোসেন পাপ্পু বলেন, আমরা লবণ কক্সবাজার থেকে আনি। প্রতি বছরই আনি। লবণের দাম বস্তা প্রতি ৭শ টাকা থাকলে কোরবানির সময় ১২শ-১৩শ টাকা হয়ে যায়। কক্সবাজারে যারা লবণের সিন্ডিকেট আছে তারা লবণের দাম বাড়িয়ে দেয়। লবণের মহাজনের সাথে যোগাযোগ করলে বলছে লবণ নেই, লবণ সংকট। আমি যেটা মনে করি কোরবানির আগে লবণের দাম আর কমবে না।
তিনি জানান, সাধারণত প্রতি হাটে ৫০ বস্তা করে তার লবণ বিক্রি হয়। কিন্তু কোরবানি ঈদের পরের প্রথম হাট থেকে শুরু করে কয়েকটি ২/৩টি হাটে প্রায় এক হাজার বস্তা করে লবণ বিক্রি হয়।
যশোরের জেলা প্রশাসক মো. তমিজুল ইসলাম খান বলেন, আমরা বাজার মনিটর করবো। বিসিকের তরফ থেকে আমরা যেটা জানি এই মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় লবণের উৎপাদন বেশি আছে। বাজারে কোন ক্রাইসিস হবে না। লবণের সরবরাহ পর্যাপ্ত আছে। বিসিকের কর্মকর্তা, ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটবৃন্দ, উপজেলায় নির্বাহী অফিসার ও পুলিশ সবাই মিলে এটা মনিটর করবো। আশা করি সমস্যা হবে না।
তিনি জানান, পশুর হাটে যাতে লবণ কেনা-বেচার ব্যবস্থা থাকে সেটি আমরা চেষ্টা করবো। আমাদের ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী অফিসার) এবং হাটের ইজারাদার যারা আছেন তাদের মাধ্যমে আমরা এটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবো। সবাইকে অনুরোধ করবো যারা পশু কিনবেন সাথে তারা লবণও ক্রয় করেন।

Lab Scan