রাজগঞ্জে পাট জাগ দিতে পারছেন না কৃষক

0

ওসমান গণি, রাজগঞ্জ (যশোর) ॥ যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ অঞ্চলে চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে অনাবৃষ্টি আর পানির তীব্র সংকটে পাট জাগ দিতে না পারায় কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এখন চলছে ভাদ্রমাস। তীব্র তাপদহে খাল-বিল ও জলাশয়ের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। পানির অভাবে ক্ষেতের পাটসহ কেটে রাখা পাট শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে করে মারাত্মক ক্ষতির আশংকা করছেন বৃত্তর এ উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়নের প্রায় ১৯ হাজার কৃষক।
সরজমিনে দেখা যায়, উপজেলার রোহিতা, খেদাপাড়া, হরিহরনগর, ঝাঁপা, মশ্মিমনগর ও চালুয়াহাটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা বৃষ্টির পানির জন্য অপেক্ষা করে একটু দেরিতে ক্ষেতের পাট কাটছেন। অনেকে আবার রোপা আমন চাষের জন্য ক্ষেতে কেটে রাখা পাট জাগ দিতে না পেরে ক্ষেত থেকে উঠিয়ে রাস্তার পাশে স্তুুপ করে রেখেছেন। এতে করে কেটে রাখা ওই পাট শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই কেটে রাখা পাট অতিরিক্ত টাকা খরচ করে ভ্যানে করে দূরে কোন জলাশয়ে নিয়ে যাচ্ছেন জাগ দেয়ার আশায়।
বর্তমানে এ উপজেলায় পুকুর রয়েছে ১০ হাজার ৬৪৪টি। ঘের রয়েছে ৪ হাজার ৮১০টি। এরপাশাপশি বাওড় রয়েছে ৬টি ও বিল রয়েছে ৬টি। বৃষ্টির তীব্র অভাব আর চলমান তাপদহের কারণে অধিকাংশ ঘের, বিল বা পুকুরের পানি শুকিয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে কৃষক তার কেটে রাখা পাট নিয়ে ছুটছেন বাওড় জলাশয়ের দিকে। কিন্তুু বাওড়ে পানি থাকলেও সেখানে কেটে রাখা জাগ দিতে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কারণ বাওড়ে পাট জাগ দেওয়ায় বাওড়ের পানি নষ্ট হচ্ছে। নষ্ট পানির কারণে মারা যাচ্ছে রুই,কাতলসহ বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য মাছ। আর এ জন্য বাওড়ের পানিতে পাট জাগ দিতে দিচ্ছেন না বলে কৃষকদের অভিযোগ।
অবশ্য বাওড় কর্তৃপক্ষ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, কৃষকের কথা চিন্তা করে চলতি মৌসুমে ঝাঁপা বাওড়সহ বিভিন্ন বাওড়ে পাট জাগ দেওয়ায় অনুমতি দেয়া হয়। তবে পাট পঁচানোর অনুমতি দিয়ে তাদের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। বাওড়ে পাট পচানোর কারণে পানি নষ্ট হয়ে এ পর্যন্ত রুই, কাতল ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ২০লাখ টাকার মাছ মারা গেছে। এ কারণেই তারা বাওড়ে পাট জাগ দেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।
উপজেলার ঝাঁপা ইউনিয়নের হানুয়ার বাগের আলী গ্রামের কৃষক ওসমান গণি বলেন, চলতি মৌসুমে ৩বিঘা জমিতে উচ্চ ফলনশীল জাতের পাট চাষ করেছিলেন। অনাবৃষ্টির কারণে বীজ বপনের পরপরই তার পাটের ক্ষেতে সেচ দিতে হয়েছে। গত বারের মত এবারও তার পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। এখন ক্ষেতের পাট কেটে রাস্তার ওপর রেখে জমি প্রস্তুুত করে রোপা আমন চাষ করা হয়েছে। অথচ এখনও কেটে রাখা ওই পাট পানির অভাবে জাগ দেয়া হয়নি। তবে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে পুকুরে পানি তুলে কেটে রাখা পাট জাগের ব্যবস্থ করা হবে বলে জানান এ কষৃক।
চালুয়াহাটি ইউনিয়নের রামনাথপুর গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন ও আব্দুল ওয়াদুদ জানান, খাল-বিলে ও পুকুরে তো পর্যাপ্ত নেই। তাই পাট জাগ দিতে তাদের বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। কেটে রাখা পাট ভ্যানে করে নিয়ে ৪কিলোমিটার দূরের একটি পুকুরে স্যালো মেশিন দিয়ে পানি তুলে তারপর জাগ দিতে হয়েছে। পাট জাতে বাড়তি টাকা খরচ হলে উৎপাদন ব্যয় তোলা মুশকিল হবে বলে জানান এ কৃষকেরা।
ঝাঁপা বাওড়ের লিজ গ্রহিতা সাধন কুমার বলেন, বৃহত্তর এ অঞ্চলের পাট চাষিদের কথা চিন্তা করে তারা বাওড়ে পাট জাগ দেয়ার অনুমতি দেন। অনুমোতি পাওয়ার পর ঝাঁপা বাওড়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাট জাগ দেয়া হয়। এতে করে বাওড়ের পানি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এই নষ্ট পানিতে বাওড়ে অবমুক্ত করা চারা মাছ ও রুই মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য মাছ মারা যায়। এতে করে বাওড় কর্তৃপক্ষ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন। আর এ কারণেই আপাতত ঝাঁপা বাওড়ে পাট জাগ দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মনিরামপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি কর্মকর্তা অঞ্জলী রানী জানান, চলতি মৌসুমে বৃহত্তর এ উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়নে জিআরও-৫২৪ জাতের পাট চাষ হয়েছে ২হাজার ৭২৪ হেক্টর এবং তোশা-৮ জাতের পাট চাষ হয়েছে ১হাজার ৫২৬ হেক্টর জমিতে। সর্বমোট ১৮ হাজার ৭০৬জন চাষি চলতি মৌসুমে এ দুই জাতের পাট চাষ করে বাম্পার ফলনও পেয়েছে। এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছিল ১৬হাজার ৪৪০ মেট্রিকটন। তবে অনাবৃষ্টি আর তীব্র তাপদহের কারণে পাট জাগ নিয়ে চাষিদের মধ্যে বেশ হতাশা দেখা দিয়েছে বলে জানান এ কৃষি কর্মকর্তা।

Lab Scan