রক্তের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন স্বজনরা

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছোট ভাই। দুদিন ধরে দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত ঝরছে। খুব খারাপ অবস্থা। চিকিৎসক বলেছেন, জরুরি রক্ত প্রয়োজন। গত রাত থেকে রক্তের জন্য ঘুরছি। অনেক জায়গায় খুঁজেছি এখনও রক্ত সংগ্রহ করতে পারেনি। সকালে একজন ডোনার নিয়ে এসেছি রক্ত নেয়ার জন্য। আরও ডোনার লাগবে। শনিবার দুপুরে রাজধানীর শান্তিনগর কোয়ান্টাম ব্লাড ব্যাংকে রফিক নামে এক রোগীর স্বজন কথাগুলো বলছিলেন।
তিনি জানান, চাচাতো ভাই ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি। বয়স মাত্র ১৮ মাস। এ পজেটিভ রক্ত দরকার। রাতে অনেক খুঁজেও পায়নি। এখন এখানে (কোয়ান্টাম) এসেছি একজন ডোনার নিয়ে বাকিগুলো এখান থেকে সংগ্রহ করব। তারা বলল, ব্যবস্থা করছেন। কোয়ান্টাম ব্লাড ব্যাংকে রক্তের জন্য এসেছেন আরেক স্বজন মালিবাগের বাসিন্দা আরিফ। তার আমেরিকান প্রবাসী খালা তিনদিন ধরে মোহাম্মদপুর কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি। জাগো নিউজকে আরিফ বলেন, গত ১৪ জুলাই খালা আমেরিকা থেকে আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে দেশে আসেন। ২৫ জুলাই আমেরিকা ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৪ জুলাই কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি। চিকিৎসক জানিয়েছেন, তার প্লাটিলেট অনেক কমে গেছে। রক্ত দিতে হবে। এক ব্যাগ প্লাটিলেট রক্তের জন্য চার ব্যাগ রক্ত লাগে। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুজি করে চারজন ডোনার নিয়ে এসেছি। এখন রক্তের ক্রস মেচিং করতে দিয়েছি। রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের রক্তের কেমন চাহিদা জানতে চাইলে স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টাম ব্লাড ব্যাংকের দায়িত্বরত কর্মকর্তা তারেকুল ইসলাম জানান, ডেঙ্গু আক্রান্তদের রক্তের অনেক চাহিদা। গত কয়েকদিন ধরে এ চাহিদা আরও বেড়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তদের স্বজনরা রক্তের জন্য ভিড় করছেন। খুব ভয়াবহ অবস্থা, চাহিদা এতো বাড়ছে যে সময় মতো আমরা রক্ত দিতে হিমশিম খাচ্ছি।
রক্তের চাহিদার এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে আরেক কর্মকর্তা হাসান খান জানান, চলতি বছরের জুনে আমরা ৫০০-৭০০ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করেছি। কিন্তু জুলাইয়ের ২৬ তারিখ পর্যন্ত এই সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। ২০১৮ সালের জুলাইতেও হঠাৎ রক্তের চাহিদা বেড়েছিল। ওই সময় কোয়ান্টাম থেকে আড়াই হাজার ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করা হয়েছিল। জানা গেছে, সিটি কর্পোরেশনের অবহেলা ও অসচেতনতার কারণে নগরে এবার আগেভাগেই ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়েছে। আগের তুলনায় আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৮ সালে ১০ হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার নতুন রেকর্ড হয়েছিল। চলতি বছরের ২৫ জুলাই (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ২৫৬ জন। তাদের মধ্যে চলতি মাসেই সর্বোচ্চ সংখ্যক ৭ হাজার ১১২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। যাদের বেশির ভাগের রক্তের প্রয়োজন হচ্ছে। কারণ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর রক্তে প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকার দ্রুত কমে যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রক্তে প্লাটিলেট স্বাভাবিক মাত্রা দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ। ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমা স্বাভাবিক। প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীর প্লাটিলেট কমে। এর মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১০-২০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করে। ৫ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীর মারাত্মক রক্তক্ষরণ হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম ঢাকার ১২টি সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতাল এবং ১৭টি বেসরকারি হাসপাতালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন হাসপাতালে দুই হাজার ৩২২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল। এর মধ্যে শুধু ২৫ জুলাই ভর্তি ছিল ৫৪৭ জন, আগের দিন যা ছিল ৫৬০ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ডেঙ্গুতে আটজন মারা গেছে। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার মতে এ সংখ্যা প্রায় ৩৩ জন।

ভাগ