যশোর মহিলা আ.লীগের সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেত্রীর লুকোচুরি, অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ কেন্দ্রীয় দুই নেত্রীর লুকোচুরি ও নানান নাটকীয়তার কারণে চরম অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা ও নেতাকর্মীদের ভোগান্তির মধ্যে নামেমাত্র অনুষ্ঠিত হয়েছে যশোর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন। দুই যুগ পর অনুষ্ঠিত এ সমে§লনকে ঘিরে জেলার নেতাকর্মীদের ভিতরে যে উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল তাতে পানি ঢেলে দেন কেন্দ্রের দুই নেত্রী। সম্মেলনের কমিটি গঠনে কাউন্সিল মুলতবি রেখে দলের নেতাকর্মীদের না জানিয়ে যশোর ত্যাগ করেন ওই দুই নেত্রী। এতে ুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন জেলা শাখার সভাপতি নিজেই। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আমাদের সাথে আজ (শনিবার) সারাদিন নাটক করেছেন।
গতকাল সকাল ১০টায় যশোর জেলা পরিষদ মিলনায়তনে জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন জাতীয় ও দলীয় পতাকা এবং বেলুন উড়িয়ে উদ্বোধন করার কথা ছিলো বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য সাফিয়া খাতুন ও প্রধান অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্যসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের। এজন্য সকাল থেকে জেলার বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে দলটির বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী নানা রঙের ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে মিছিল সহকারে জেলা পরিষদ মিলনায়তনে জড়ো হতে থাকেন। বেলা ১০ টার আগেই পুরো মিলনায়তন মহিলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর ও ডেলিগেটদের উপস্থিতিতে ভরে যায়। চলে দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের শোডাউন। এসময় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশের বাড়তি সতর্ককতা লক্ষ্য করা যায়। সম্মেলনকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মাঝে উৎসব আমেজ দেখা গেলেও বিপত্তি ঘটে অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় অতিথিদের যোগদান নিয়ে।
বেলা ১১ টার দিকে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পিযুষকান্তি ভট্রাচার্য্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন সম্মেলনের মঞ্চে উপস্থিত হলেও ঢাকা থেকে আগত মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ছিলেন না। অনুষ্ঠানের অতিথিবৃন্দ মঞ্চে দীর্ঘক্ষন কেন্দ্রীয় দুই নেত্রীর অপেক্ষায় বসে থাকেন। এসময় কেন্দ্রীয় মহিলা লীগের নেতৃবৃন্দ সম্মেলনে উপস্থিত না হয়ে যশোর শেখ হাসিনা সফটওয়ার টেকনোলজি পার্কের গেস্টরুমে অবস্থান করছিলেন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
দুপুর দেড়টার দিকে সম্মেলন স্থলে খবর আসে মহিলাদলের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে না এসে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের গেস্ট রুমে বসে যশোর জেলা মহিলা লীগের কমিটি গঠণ করছেন। যেকারণে তাদের আসতে দেরি হচ্ছে। এসময় উপস্থিত কাউন্সিলররা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা কোনো সিলেকশনের কমিটি মানবে না বলে স্লোগান দিতে থাকেন। এসময় মঞ্চ থেকে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি নেতাকর্মীদের শান্ত হওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
এ অবস্থায় দীর্ঘ চার ঘণ্টা পর বেলা আড়াইটার দিকে মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য সাফিয়া খাতুনসহ আরও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সম্মেলনস্থলে প্রবেশ করেন। তবে নেতৃবৃন্দ পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেলুন ও পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে সম্মেলনের উদ্বোধন না করেই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এ নিয়ে নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই হৈ-চৈ করতে থাকেন।
এভাবে বেলা আড়াইটার সময় সম্মেলনের প্রথম পর্ব শুরু হয়। বক্তৃতা পর্বে যশোর- ৬ কেশবপুর আসনের সংসদ সদস্য ইসমত আরা সাদেক তার বক্তব্যে তার উপজেলার কাউন্সিলরদের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। এসময় তিনি অভিযোগ করেন আমার উপজেলায় যাদের কাউন্সিলর করা হয়েছে তাদের অনেকেই সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। এসব কাউন্সিলরদের ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করলে সঠিক নেতৃত্ব আসবে না। এজন্য তিনি বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের কাছে। এক পর্যায়ে মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাফিয়া খাতুন বক্তব্য দেয়ার সময় যশোর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা দিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেন। এরপর অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পিযুষকান্তি ভট্রাচার্য্যরে বক্তব্যের পর বিকেল পাঁচটার দিকে সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলে নেতৃবৃন্দ মধ্যাহ্ন ভোজের কথা বলে মঞ্চ ত্যাগ করেন।
এদিকে বিকেল ৫ টার পর সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরুর কথা থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আর ফিরে আসেননি। কাউন্সিলর ও ডেলিগেটরা কেন্দ্রীয় নেতাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। এসময় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে করতে অনেক মহিলা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে সন্ধ্যা সাড়ে সাড়ে সাতটার দিকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার উপস্থিত হন জেলা পরিষদ মিলনায়তনে। এসময় তিনি বলেন, যশোরের একটি আসনের সংসদ সদস্য তার এলাকার কাউন্সিলরদের বিষয়ে নেতৃবৃন্দের কাছে অভিযোগ দেওয়ায় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করে দেখার জন্য সময় নিয়েছেন। এজন্য আজকের সম্মেলনের দ্বিতীয় সেশন মুলতবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্তের পর খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে নেতৃবৃন্দ সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনের আয়োজন করে আপনাদের উপস্থিতিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন বলে তিনি জানান। শাহীন চাকলাদারের বক্তব্যের সময় উপস্থিত কাউন্সিলররা এ সিদ্ধান্ত মানিনা, মানিনা বলে স্লোগান দিতে থাকেন। পরে শাহীন চাকলাদারের অনুরোধে তারা শান্ত হন।
এ বিষয়ে সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি নূর জাহান আলী নীরা সাংবাদিকদের কাছে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আমাদের সাথে আজ সারাদিন নাটক করেছেন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির ভাষণের আগে জেলা কমিটি বিলুপ্ত করার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এটি হতেই পারেনা। এভাবে কমিটি বিলুপ্ত করা অসাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। সুতরাং এখনো যশোর মহিলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটি বহাল রয়েছে। তিনি বলেন, নেতৃবৃন্দ দ্বিতীয় সেশনের জন্য কাউন্সিলরদের অপেক্ষায় থাকতে বলে আমাদের কাছে না এসে চলে যাওয়া খুবই দুঃখজনক। আমরা এ বিষয়ে খুবই মর্মাহত হয়েছি। এ বিষয়ে সভাপতি পদ প্রত্যাশী লাইজু জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বিজ্ঞ। তারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সে সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই। তিনি বলেন, যশোর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার পর আজ থেকে এ কমিটির আর কোনো অস্তিত্ব থাকলোনা। কেন্দ্রীয় কমিটিই এখন সিদ্ধান্ত নেবেন পরবর্তী নেতৃত্বের বিষয়ে।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন বলেন, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন আপাতত মুলতবি করা হয়েছে। কাউন্সিলর নিয়ে প্রশ্ন উঠায় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ পরবর্তীতে সম্মেলনের সময় দেবে বলে আমাদের জানিয়েছেন। আশা রাখি খুব দ্রত সময়ের মধ্যে সম্মেলনের পরবর্তী তারিখ ঘোষণা হবে এবং এর সুষ্ঠু সমাধান হবে। ১৯৯৭ সালের ২৭ অক্টোবর সম্মেলনের মাধ্যমে যশোর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগে কমিটি গঠন করা হয়। ৭১ সদস্যের এই কমিটি দীর্ঘদিন ধরে চললেও দীর্ঘদিন আর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোকে তৃনমূল পর্যায় থেকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় কমিটি। বিশেষ করে মেয়াদ উত্তীর্ন সকল কমিটি ভেঙে দিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে যশোর জেলা মহিলা লীগের গতকালের এ সম্মেলণের আয়োজন করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি সফল না হয়ে ঝুলে গেলো বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ভাগ