যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবেই তুমি বাংলাদেশ

লীনা পারভীন
অসাধারণ এ স্লোগানটি কার তৈরি আমি জানি না তবে আমার শরীরে কাঁপুনি নিয়ে এসেছে। চোখে পানি নিয়ে এসেছে আবেগে। ঘুমন্ত বিবেককে ঝাঁকুনি দিয়ে সরব করে দিয়েছে। ছাত্ররা আজ প্রশ্ন রেখেছে, ‘বিবেক তবে কবে ফিরবে?’ সড়কে হত্যা ও পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে স্কুল ও কলেজের ছাত্রদের যে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন চলছে সেখানের একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা আছে এ স্লোগানটি। আন্দোলন চলছে। চলবে যতক্ষণ না পর্যন্ত এ নৈরাজ্যর বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নেবে। এ শপথ নিয়ে হাজার হাজার মায়ের সন্তানরা রাস্তায় নেমেছে। এ যেন গল্পের সেই বাংলাদেশ। এ যেন ইতিহাসের সেই চিরচেনা বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশের স্কুল ও কলেজের ছাত্ররা জীবন দিয়েছিল ভাষার জন্য, দেশের মুক্তির জন্য।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রেরণা রফিক, সালাম, জব্বার। তাদের প্রেরণা লাখো মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের শক্তি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। দেখো হে পিতা, তোমার রেখে যাওয়া বাংলাদেশ পথ হারায়নি। যে প্রজন্ম নিয়ে আমরা চিন্তিত থাকি, যে প্রজন্মকে আমরা ইতিহাস জানে না বলে ধিক্কার দিয়ে থাকি, যে প্রজন্মকে আমরা ডি-জুস বা ফেসবুক প্রজন্ম বলে কষ্ট পাই, সেই প্রজন্ম আজকে স্লোগান তুলেছে, ‘৯ জিবি ইন্টারনেট প্যাক ফ্রি চাই না, জীবনের নিরাপত্তা চাই।’ আশায় বুক বাধি। আমার সন্তানরা বাংলাদেশকে হারতে দেবে না। কোনো ষড়যন্ত্রই তাদের রুখে দিতে পারছে না আজকে। শক্তিধর মন্ত্রী-এমপিদের মসনদ কাঁপিয়ে দিচ্ছে আমাদের বাচ্চারা। আহা। একজন নাগরিক হিসেবে, একজন আন্দোলনের কর্মী হিসেবে, একজন মা হিসেবে আমি আজ গর্বিত। আমার দুটি ছেলেও আজ নিজেদের একাত্ম করতে চাইছে এ ন্যায্যতার লড়াইয়ে। তারাও রাস্তায় নামতে চাইছে সহপাঠীর মৃত্যুর বিচার চাইতে। রাস্তায় যানবাহন নাই, মানুষ পায়ে হেঁটে অফিসে যাচ্ছে কিন্তু মুখে কোনো রাগের চিহ্ন নাই। ক্ষোভ দেখাচ্ছে না কেউ। চলাচলের সমস্যায় বাংলাদেশের মানুষ, এ ঢাকা শহরের মানুষ এর আগেও জর্জরিত ছিল কিন্তু সেসব ছিল রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য। গালাগালে ভরে যায় দেয়াল। অথচ এ এক অন্যরকম বাংলাদেশ দেখছি আমরা।
আমিও ছাত্র ছিলাম। ছিলাম রাজনৈতিক আন্দোলনে রাজপথের কর্মী। বুঝে না বুঝে আমরা কেবল আবেগকে পুঁজি করে ন্যায্য আন্দোলনে রাস্তায় নেমে যেতাম। বিবেচনার সময় থাকত না হাতে। প্রশ্ন যখন অস্তিত্বের তখন আবার বিবেচনা কী? একটাই চাওয়া, অন্যায়ের বিচার চাই। ১৯৭১ সালে আমার জন্ম হয়নি, ১৯৯০ এ ছিলাম মফস্বলের স্কুলে পড়ুয়া এক ছাত্র। গণআন্দোলন কাকে বলে তা কেবল শুনেছিলাম। প্রথম দেখেছিলাম ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে উঠা শাহবাগের চত্বরে। জানতাম দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তখন এ দেশের মানুষ তার জীবনের মায়া করে না। আজ এত বছর পর এসে আবারও দেখছি। না, সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের কেউ নয়, নেতৃত্ব দিচ্ছে আমার সন্তানরা। দিনের পর দিন পরিবহন খাতে চলা সন্ত্রাসের রাজত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে রাজনীতি না বুঝা আমাদের ছেলেমেয়েরা। রাজনীতি বুঝে না সেটাও বা বলি কেমন করে? তাদের মুখে আজ স্লোগান উঠে, ‘আমার বুকে গুলি করো না, মাথায় করো কারণ আমার বুকে বঙ্গবন্ধু বাস করে।’ দেশের চলমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার। তারা একটি বিবেকবান রাষ্ট্রের দাবিতে মাঠে নেমেছে। এ লেখার সময় বাইরে প্রচণ্ড অন্ধকার করে বৃষ্টি নেমেছে। আমি ঘরের ভেতরে এসিতে বসে লেখাটি লিখছি কিন্তু হৃদয়ে আমার ক্রন্দনের ঢেউ। বাচ্চাগুলো আজ তিন দিন ধরে নাওয়া খাওয়া ভুলে, পরীক্ষা, পড়াশুনে ছেড়ে স্কুল ড্রেস আর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় বসে আছে অথচ আমাদের ক্ষমতার মসনদে যারা আছেন তারা নির্বিকার। হায় দেশ। তোমার সন্তানরা তাদের বন্ধু হত্যার বিচারের দাবিতে মাঠে নেমেছে আর তোমরা তাদের লাঠির আঘাতে রক্তাক্ত করছ। এ অন্যায্যতার বিচার তোমরা এক দিন পাবেই। ইতিহাস তোমাদের ক্ষমা করবে না। ক্ষমতালোভী ব্যক্তিদের বিনিময়ে আজ আমরা একটি সুস্থ সুন্দর দেশ চাই। সামনে নির্বাচন। সরকার ব্যস্ত তার নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে। এমন সময়ে যদি তারা ন্যায়-অন্যায়ের মাঝে তফাত করতে না পারে তবে আখেরের চড়া মূল্য দিতে হবে বৈকি।
দেশের নাগরিক হিসেবে সুস্থভাবে বাঁচতে চাওয়া কোনো অন্যায় নয়। একদল দুর্বৃত্তের হাতে জিম্মি হতে চাই না আমরা। আমার স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দেওয়ার দায়িত্ব এই রাষ্ট্র, এই সরকারের। এর জন্য কেন আমাদের কোমলমতি ছেলেপেলেদের রাস্তায় নামতে হবে? তাদের কেন আমরা সুস্থ পরিবেশে পড়াশুনা করার সুযোগ করে দিতে পারছি না? এ লজ্জা কার? আমি একজন অভিভাবক হয়ে নিজেকে আজ এদের সঙ্গে দেখতে চাই। আমিও চাই আমার প্রিয় বাংলাদেশ এ তরুণদের হাত ধরে আবার সঠিক রাস্তায় ফিরে আসুক। আমি চাই যত অন্যায় করে পাপের বোঝা আমাদের কাঁধে চাপানোর পাঁয়তারা হচ্ছে সব থেমে যাক আজ এ মুহূর্ত থেকে। রাস্তায় রাস্তায় ছাত্ররা ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করছে। আপনি বলবেন এরা চেক করার কে? আমি বলি এরাই আজকের এবং আগামীর বাংলাদেশ। লাইসেন্সহীন গাড়ি চালিয়ে যখন আপনি আমার সন্তানের জীবন নিয়ে নেন তখন আমি কারও কাছে গিয়ে বিচার পাই না। তাই এদেশকে ময়লামুক্ত করার দায়িত্ব আমাদের নিজেকেই তুলে নিতে হয়। ছাত্ররা দাবি তুলেছে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন জনপ্রতিনিধিদের গণপরিবহনে চলাচল করতে হবে। কতটা পরিকল্পিত মাথায় তারা বাংলাদেশকে দেখছে ও চাইছে। চোখের পানিতে ভেসে আসা সবটুকু ভালোবাসা তোমাদের জন্য। দলে দলে সাধারণ মানুষরা যোগ দিচ্ছে সেই মিছিলে। শুনতে পাচ্ছেন কী আপনারা? সময়ের ঘড়ি আজ বেজে উঠছে ধীরে ধীরে। আর থেমে থাকা নয়। দাবি আদায়ের লড়াইয়ে আমরাই শক্তিশালী। প্রশাসনের লাঠি দিয়ে এ মিছিল ঠেকানো যাবে না।
ইতিহাস তা বলে না। ইতিহাস থেকে যারা শিক্ষা নেয় না তাদের পরিণতি ভুলে গেলে আবার জেনে নিন। তাও কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেবেন না আপনারা। প্রধানমন্ত্রী, আপনি তো ন্যায়ের পথে চলতে আহ্বান জানান আমাদের। আপনাকে আমরা বিশ্বাস করি। বিশ্বাস করি আপনি আপনার সন্তানদের মরদেহের ওপর ক্ষমতায় থাকতে চান না। তবে কেন আজ সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছেন? আর কত লাশের ওপর দিয়ে দাঁড়াবে এই বাংলাদেশ? স্যালুট হে তরুণ সমাজ।
লীনা পারভীন : কলাম লেখক ও সাবেক ছাত্রনেতা।
priompritom@gmail.com

ভাগ